
বিগত ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা ১১০০ কোটি ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছে।
সরকারি হিসাবে এ অর্থ মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ, আর বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৪ শতাংশ।
এই রেমিট্যান্স গত অর্থবছরে পাওয়া বৈদেশিক সাহায্যের প্রায় সাড়ে ছয় গুণ এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে অন্তত ১৩ গুণ বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা এই রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন, সেই প্রবাসীদের জন্য কি করছে রাষ্ট্র? প্রয়োজনে তারা কি যথাযথ সহায়তা পান সরকারের কাছ থেকে?
আজ (মঙ্গলবার) আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস উদযাপনের সময় নতুন করে এ প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ছয় লাখের বেশি শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যায়, যাদের বেশিরভাগই স্বল্প দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক।
"ওখানে (মালদ্বীপ) গিয়ে দেখি আমাদের ভিসার কোন অরিজিনাল কাগজপত্র নেই। ওখানে যাওয়ার যেখানে কাজ করতাম তারা বেতন দিত না, বেতন চাইলে মালিক মারধর করত"
তাহাজ আলী, মালদ্বীপ ফেরত শ্রমিক
প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করেন বিদেশে যাওয়ার আগে পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে, রিক্রুটিং এজেন্সির দালাল, প্রতারক এজেন্সি, অতিরিক্ত খরচ, সরকারি ছাড়পত্র—ইত্যাদি ক্ষেত্রে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের।
অনেকেই দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে বৈধ ভিসা ও কাজের অনুমতি ছাড়াই যাত্রা করেন বিদেশে। এরকমই একজন গাজীপুরের তাহাজ আলী গিয়েছিলেন মালদ্বীপে।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, ওখানে (মালদ্বীপ) গিয়ে দেখি আমাদের ভিসার কোন অরিজিনাল কাগজপত্র নেই। ওখানে যাওয়ার যেখানে কাজ করতাম তারা বেতন দিত না, বেতন চাইলে মালিক মারধর করত।
অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার মনে করেন, বিদেশ যাত্রা, কাজের সুযোগ ও যাতায়াত ব্যয় ইত্যাদি সংক্রান্ত যথাযথ তথ্যের অভাবেই মূলত প্রতারিত হন বিদেশ যাওয়া এইসব মানুষেরা।
তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত সেবা দেবার ক্ষেত্রে অনেক সময় মন্ত্রণালয় ও বিদেশী মিশনগুলোয় যারা কাজ করেন তারা ব্যর্থ হন। কারণ, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই।
অভিবাসী সংক্রান্ত একটি আলাদা ক্যাডার সার্ভিস এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মি. আবরার মত দেন।
বিদেশ যাওয়ার পর বিরূপ প্রকৃতি, অমানুষিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন এসব সহ্য করে এই শ্রমিকেরা আয় করে দেশে টাকা পাঠান।
"এ সংক্রান্ত সেবা দেবার ক্ষেত্রে অনেক সময় মন্ত্রণালয় ও বিদেশী মিশনগুলোয় যারা কাজ করেন তারা ব্যর্থ হন। কারণ, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই"
সি আর আবরার, গবেষক
কিন্তু দূতাবাসগুলোতে গেলে তাঁদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয় না -- এ অভিযোগ অধিকাংশ প্রবাসীদেরই।
বিদেশ ফেরত অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, সরকার মুখেই কেবল প্রবাসীদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে বিদেশে যেতে-আসতে যে ভোগান্তি হয়, তা দূর করার কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান জানান, সরকার আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আইনি সহায়তা বিভিন্ন বাংলাদেশী মিশনে লেবার এ্যাটাশের পদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসগুলোতে কেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা সরাসরি জবাব দেয়া খুব কঠিন। কারণ, একটা দূতাবাসে শুধু লেবার এ্যাটাশের লোকই থাকে না, তার বাইরেও অনেক উইং থাকে।
তবে তিনি দাবি করেন এ অভিযোগ এখন অনেক কমে এসেছে, কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকজন এসব বিষয়ে ‘আগের চেয়ে সেনসেটিভ’ হয়েছে।
প্রবাসী শ্রমিকেরা বলছেন যথাযথ সহযোগিতা পেলে রেমিট্যান্সের হার যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি।


























