খলিফা হারুন আল-রশিদের জীবন কাহিনী, কতটা সত্য- কতটা গল্প

ছবির উৎস, Getty Images
(বিবিসি রেডিও থ্রি এর বিশেষ ধারাবাহিক 'দ্য গোল্ডেন এইজ অব ইসলাম' এর একটি পর্বে অধ্যাপক জুলিয়া ব্রে খলিফা হারুন আল-রশিদ এবং সেই সময়ের বাগদাদের চিত্র বর্ণনা করেছেন। খলিফা হারুনকে মুসলিম বিশ্বের একজন মহান শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হলেও তার দুর্বল কৌশলের কারণে অনেক রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলাও তৈরি হয়েছিল। এই প্রতিবেদনে সেটাই তুলে ধরা হলো।)
খলিফা হারুন আল-রশিদ সম্পর্কে সবাই জানে। বিখ্যাত আরব্য রজনীর কল্পকাহিনী আলিফ লায়লার একটি চরিত্র খলিফা হারুন আল-রশিদ। লেখক টেনিসনের মহান হৃদয়ের অধিকারী হারুন আল-রশিদ। কিন্তু আমরা আসলে তার সম্পর্কে কতটা জানি?
আমরা জানি যে তার ক্ষমতায় থাকার সময়কাল ছিল খিলাফত শাসনামলের স্বর্ণযুগ।
হারুন আল-রশিদের সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। টেনিসন তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, এটা ছিল আদর্শ কাল ও আদর্শ স্থান, কারণ এটা ছিল মহান শাসক হারুন আল-রশিদের শাসনামল।
কিন্তু ওই সময়টা আসলেই কতটা আদর্শ ছিল? এই সময়টাকে ‘স্বর্ণযুগ’ বলা শুরু হয় আরও অনেক পরে এসে।
খিলাফতের বিক্ষিপ্ত মোট ৬০০ বছরের শাসনের ইসিহাসকে একক ভাবে এক বিন্দুতে প্রকাশ করার চেষ্টা থেকেই মূলত এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
খিলাফতের এই ৬০০ বছরের মধ্যে খলিফা হারুন আল-রশিদের শাসনকাল ছিল মাত্র ২০ বছরের কিছু বেশি। যা ছিল ৭৮৬ সাল থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত।
অনেক মানুষই বিশ্বাস করেন যে, শিল্প, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের অনেক সেরা কাজ হারুন আল-রশিদের শাসনামলেই এসেছে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তাদের মতে, হারুন আল-রশিদ এবং বাগদাদ- এই নাম দুটো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
বাগদাদ ছিল একটি শক্তিশালী রাজ্য, ঠিক যেমনটা আলিফ লায়লায় বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু হারুন আল-রশিদ কেমন ছিলেন? আমরা তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারি না, কারণ হারুন আল-রশিদ যে বাগদাদকে শাসন করতেন তার কিছুই আর এখন অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু আমরা জানি যে, তার শাসনামলের শেষ দশ বছরে তার প্রিয় শহর ছিল সিরিয়ার শহর রাক্কা। এটি বাগদাদ থেকে উত্তর দিকে এবং খিলাফত সাম্রাজ্য ও বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের সীমান্তের কাছে অবস্থিত ছিল।
প্রত্নতত্ত্ববিদরা রাক্কায় শুধু প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষই খুঁজে পাননি, বরং সেখানে তারা কারখানারও সন্ধান পেয়েছেন। অষ্টম শতকে কারখানা থাকার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আগ্রহ উদ্দীপক। কিন্তু এই অঞ্চলে শিল্প গড়ে উঠার পেছনে হারুন আল-রশিদের কতটা হাত ছিল তা জানা যায় না।
বাস্তবতা হচ্ছে, গল্প থেকে আমরা হারুন আল-রশিদ সম্পর্কে যা জেনেছি এবং মধ্যযুগীয় ইতিহাসগ্রন্থ ও আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা যা আবিষ্কার করেছেন তার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বরং এসব থেকে তার সম্পর্কে নতুন কিছু জানা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, NATIONAL LIBRARY OF FRANCE
আপনি যদি মধ্যযুগীয় বিভিন্ন নথি পড়েন তাহলে দেখতে পাবেন যে, হারুন আল-রশিদ তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বেশিরভাগ সময়েই ছিলেন একজন দুর্বল ব্যক্তি, যিনি প্রায় খিলাফত হারাতে বসেছিলেন। তার উপর তার মায়ের এবং স্ত্রী জুবাইদাহর অসম্ভব প্রভাব ছিল।
তার রাজ্য বেশিরভাগ সময়েই পরিচালিত হতো আমলাদের মাধ্যমে। আর এই আমলাতন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল বার্মাকিদ পরিবারের (প্রভাবশালী ইরানি পরিবার)।
তবে শাসনামলের পরের দিকে তিনি শাসন ক্ষমতায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বার্মাকিদ পরিবারকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তার প্রিয়পাত্র জাফরকে হত্যা করেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনা করতে পারেননি।
উত্তরাধিকার নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোন প্রক্রিয়া না থাকায়, স্ত্রী জুবাইদার ঘরে জন্ম নেয়া তার সন্তান আমিনের কাছে খিলাফত হস্তান্তরের প্রতিজ্ঞা করেন। আর সাম্রাজ্যের অর্ধেক তার আরেক পুত্র মামুনকে দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মামুন হারুন আল-রশিদের উপপত্নীর ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন।
তার মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের মধ্যে সাম্রাজ্যের দখল নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাগদাদের মানচিত্রে বিভক্তি তৈরি হয়।
মামুন আমিনকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করে।
এ সমস্ত ঘটনার আলোকে ঐতিহাসিক চরিত্র হারুন আল-রশিদের রাজনৈতিক লিগ্যাসিকে কোনভাবেই মহিমান্বিত করা যায় না এবং যদি ‘স্বর্ণযুগের’ অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তাহলেও তার মেয়াদ খুব বেশিদিন ছিল না। কারণ তিনি মাত্র ৪০ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন।
কিন্তু ‘আলিফ লায়লা’ গল্পের অমর হারুন আল-রশিদ চরিত্রটি খলিফা হারুন আল-রশিদের মৃত্যুর পরই আবির্ভূত হয়েছে। আর এই চরিত্রটিই আমাদের স্মৃতিতে এখনো বেঁচে আছে।
এগুলো এমন স্মৃতি যেগুলো হয়তো কখনোই ছিল না, কিন্তু হয়তো থাকতে পারতো।
তবে তিনি বুদ্ধিজীবী এবং কবিদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন রোম্যান্টিক নায়ক, একজন কোমল হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি এবং সৌন্দর্য প্রেমী। বিশেষ করে তার সুন্দরী উপপত্নীদের তিনি পছন্দ করতেন যারা ছিলেন বুদ্ধিমতী এবং উচ্চ শিক্ষিত। গান এবং কবিতা চর্চার সুযোগ ছিল তাদের।

ছবির উৎস, TO ANGELO HORN
তিনি তার স্ত্রীর প্রতিও প্রেমময় ছিলেন এবং তার স্ত্রীও তাকে ভালবাসতেন। তার স্ত্রী জুবাইদাহ ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী, মহৎ এবং গুণী নারী। স্বামীর ভাল ও খারাপ সময়ে তিনি সঙ্গে থেকেছেন।
তিনি জনহিতকর অনেক কাজও করেছেন। বিশেষ করে মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার রাস্তা তৈরি করেছেন এবং এর জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।
হারুন আল-রশিদ আজো শুধু গল্পেই জীবিত রয়েছেন তা নয় বরং আরবের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে তাকে নিয়ে দীর্ঘ নাটক প্রদর্শিত হয় যেগুলো ইউটিউবেও সহজলভ্য।
টেলিভিশনের এই নাটকগুলোতে হারুন আল-রশিদ, তার পরিবার, দরবার এবং প্রজাদেরকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। যেখানে তারা তাদের জীবনের ট্রাজেডি বা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় এবং তাদের আনুগত্যকে পরীক্ষা করা হয়। তারা সহিংসতায় পরিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে।
টেলিভিশনে হারুন আল-রশিদ এবং তার সমসাময়িক কালের যে চিত্র তুলে ধরা হয় তা অনেকটা আজকের আরবদের কাছে একটি আয়না চিত্র তুলে ধরার মতো। মধ্যযুগীয় কাহিনী এবং টেলিভিশনের হারুনের সাথে শেক্সপিয়ারের ঐতিহাসিক নাটকের চরিত্রের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। এগুলোর কেন্দ্রে থাকে গল্প বা ড্রামা, সম্ভাবনা ও জীবনাদর্শ- যার সাথে আমরা মোটামুটি সবাই পরিচিত।
কিন্তু ঐতিহাসিক হারুন আল-রশিদ আর গল্পের হারুন আল-রশিদ কী আসলে একই ব্যক্তি?
ইতিহাসবিদেরা একমত জানিয়ে বলেছেন, হারুন আল-রশিদ ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে’ ছিলেন।
তার মা খিজরান ছিলেন একজন কৃতদাসী। তার বাবা খলিফা আল-মাহদি ছিলেন ক্ষমতাবান ব্যক্তি এবং তিনি খিজরানকে মুক্ত করে তাকে বিয়ে করেছিলেন।
সূচনা এতো রোম্যান্টিক হলেও পরে তা বেশিদিন টেকেনি। আল-মাহদি খুব অল্প বয়সে মারা যান। খিজরানের সাথে তার দুই ছেলে হয়। এরা দুজনই পালাক্রমে খলিফা হন।

ছবির উৎস, Getty Images
সে সময় তাদের বয়স কত ছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, সেই সময় তাদের বয়স ২০ বছরের আশেপাশে ছিল। তাদের নাম দুজন নবীর নামে রাখা হয়েছিল (হযরত মুসা এবং হযরত হারুন) এবং একে শুভ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এই দুই ভাইয়ের মধ্যে মিল ছিল না।
মুসার একটি ছেলে ছিল এবং সে চাইতো হারুনের পরিবর্তে খিলাফত তার ছেলে পাবে। আর এর জন্য সে হারুনকে নানা ভাবে হয়রানি করতে শুরু করে।
হারুনের জীবন শঙ্কার মুখে পড়ে। এই সময় খিজরান এগিয়ে আসেন এবং তিনি পুরো বিষয়টি নিজে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করেন। তার একটি কর্তৃত্ব থাকলেও মুসা তাকেও অপমান করে এবং রাষ্ট্রীয় কাজে নাক না গলিয়ে মেয়েদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার নির্দেশ দেয়।
এটা মোটেও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছিল না বরং এটা ছিল স্বার্থের দ্বন্দ্ব যা আল-মাহদির শাসনামলেই দানা বেধেছিল।। মুসাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে হারুনকে খলিফা বানাতে বার্মাকিদ পরিবারের সাথে ষড়যন্ত্র করেন খিজরান।
এর কিছুদিন পরই মুসার মৃত্যু হয়। অনেক নথিতে অভিযোগ করা হয় যে, খিজরান তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন।
একটি নথিতে বলা হয়, খিজরান এক দাসীর মাধ্যমে মুসাকে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু অন্য অনেক জায়গায় উল্লেখ করা হয় যে, মুসা পাকস্থলীর আলসারের কারণে মারা যান।

ছবির উৎস, YAHYÁ AL-WASITI
মুসার মৃত্যুর পর হারুনের পরিবর্তে বরং বার্মাকিদ পরিবারের শাসনকাল শুরু হয়।
বার্মাকিদরা তখন অভিজাত পরিবার ছিল এবং তাদের পূর্বপুরুষেরা ছিল ইরানি। এই পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে মধ্য এশিয়ায় একটি বৌদ্ধ মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল।
কিন্তু এই শাসনামলে তারা আরবি ভাষী মুসলিমে রূপান্তরিত হয় এবং খিলাফতের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে তারা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং তারা তা ধরে রাখতে চেয়েছিল।
বার্মাকিদ পরিবারের একজন নারী হারুনকে বুকের দুধ পান করিয়েছিলেন। এদিক থেকে দেখতে গেলে তার সাথে বার্মাকিদ পরিবারের একটি সম্পর্ক ছিল এবং সেই সময়ে দুধের সম্পর্ককে রক্তের সম্পর্কের মতোই দৃঢ় হিসেবে দেখা হতো।
এছাড়াও ইয়াহিয়া নামে বার্মাকিদ পরিবারের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ হারুনের শিক্ষক ছিলেন। হারুন তাকে বাবা বলে ডাকতেন। ইয়াহিয়া তার মন্ত্রী হন এবং ইয়াহিয়ার দুই পুত্র বাকি দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।
হারুনের পালিত ভাই ফজল ছিলেন নির্ভরযোগ্য এবং যোগ্য। অন্যদিকে জাফর ছিল বুদ্ধিমান এবং মুগ্ধতায় ভরা। ফলে সে খুব তাড়াতাড়ি হারুনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠে।
এ ধরনের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক ও মানসিক বন্ধন থাকার কারণেই হারুন আল-রশিদের কাহিনীকে পারিবারিক নাটক বা ফ্যামিলি ড্রামা ঘরানার করে লেখাটিই স্বাভাবিক। এই গল্পের প্রতিটি ঘটনাই এতো বেশি ভিন্ন উপায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, এর থেকে শক্ত কোন প্রমাণ খুঁজে বের করাটা কঠিন।
কিন্তু এই সব গল্পেই পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব, তাদের অনুভূতি, আবেগ, হিংসা, ভয় এবং ভালবাসা কীভাবে ঘৃণায় পরিণত হয় তা উঠে এসেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মুসার মৃত্যুকে ঘিরে বিভীষিকাময় ঐতিহ্যের ঘটনা। এছাড়া আরেকটি উদাহরণ হতে পারে, ফজল এবং ইয়াহিয়া কেন যৌথভাবে জাফরকে হত্যা করিয়েছিল এবং হারুন কেন তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন?
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, বার্মাকিদ পরিবারের উপর নির্ভরতার কারণে হারুন বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি নিজের ইচ্ছানুযায়ী কিছুই করতে পারছেন না। এ কারণে তার জন্য একটি দমবন্ধকর অবস্থার তৈরি হয়েছিল।
এ বিষয়ে রূপক হিসেবে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। আর তা হলো, হারুন বার্মাকিদ পরিবারের উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রথমে গোপনে জাফরের বোন আব্বাসাকে বিয়ে করেন এবং পরে তাদেরকে একসাথে থাকার নির্দেশ দেন।
স্বাভাবিকভাবেই তারা দুজনই এই আদেশ অমান্য করে এবং হারুন ক্ষমতাবলে জাফরকে হত্যা করে। ইতিহাসবিদরা কয়েক শতাব্দী ধরে এই গল্প মিথ্যা বলে উল্লেখ করে আসলেও তারা এখনো বার্মাকিদ পরিবারের পতনের বিষয়ে কোন রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হাজির করতে পারেনি।
এ বিষয়ে একটি প্রকৃত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা হচ্ছে তার ছেলে আমিনের পতনের কাহিনী।
মুসা যেমন হারুনের কাছে তার প্রতিজ্ঞা রাখেনি এবং নিজের ছেলেকে উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিল, তেমনি আমিনও তার নিজের ছেলের পরিবর্তে ভাই মামুনকে খেলাফত হস্তান্তরের প্রতিজ্ঞা রাখেনি।
বার্মাকিদ পরিবারের সাথে খলিফা হারুন আল-রশিদের দীর্ঘ অংশীদারিত্বের সময় সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল তার দুই ছেলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু এই লক্ষ্য কখনোই পূরণ হয়নি।
একটি গল্পে বলা হয়, যে রাতে জুবাইদাহ আমিনকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, সে রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তিন জন নারী তার কাছে এসে বসে এবং তারা তার পেটের উপর হাত রেখে বলে যে তার ছেলে কেমন হবে। ওই নারীরা বলেছিল, তার ছেলে হবে দাম্ভিক, প্রতারক এবং বোকা।
যে রাতে আমিন জন্ম গ্রহণ করেছিল, সেই একই রাতে ওই নারীরা আবারো তার স্বপ্নে আসে এবং তারা একই ভবিষ্যদ্বাণী করে। এরপরে আরও একদিন ওই তিন জন নারী শেষবারের মতো তার স্বপ্নে আসে এবং তারা বলে যে, আমিনের চরিত্রের ত্রুটিগুলোর কারণেই তার পতন এবং মৃত্যু হবে।
জ্যোর্তিবিদদের নানা শুভ ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও ওই তিন জন নারীর করা ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল।
আমিন তার ভাইয়ের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন- মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাকে এমন প্রতিজ্ঞা করানো হয়। পরে একই প্রতিজ্ঞা ১৫ বছর বয়সে আবার করানো হয়। ২০ বছরের কিছু সময় পরে যখন তিনি ক্ষমতায় বসেন, তখন এই প্রতিজ্ঞা ভেঙ্গে ফেলার জন্য পরিকল্পনা করার যথেষ্ট সময় তার হাতে ছিল।
সে সময় ক্ষমতায় বসানোর সময় কোন ধরনের শপথ পাঠ করানো হতো না। আইনি হস্তক্ষেপ ছিল আরও কম। খলিফারা মসনদে বসার পর নিজেদের মতো করে ক্ষমতা গড়ে নিতেন। তাই প্রশ্ন আসে যে, বার্মাকিদ পরিবারের উপস্থিতিতে হারুন আল-রশিদ কীভাবে তার ক্ষমতা গড়ে নিয়েছিলেন? তার কাছে কতটা ক্ষমতাই বা ছিল?
তিনি নীরব ভূমিকায় ছিলেন এবং বার্মাকিদ পরিবার রাষ্ট্রীয় নানা বিষয় পরিচালনা করেছে। তিনি তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে শক্তিশালী আমলাতন্ত্র পেয়েছিলেন, সেটিকে তিনি সেভাবেই পরিচালিত হতে দিয়েছেন।
কিন্তু তিনি কিছু নতুন ধারারও প্রচলন করেছেন। যেমন, খিলাফতকে তিনি একটি ধর্মীয় অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার ধারার প্রচলন করেন এবং এই ধারাকে জনপ্রিয় করে তুলতে তিনি কাজ করে গেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদের অংশ হিসেবে তিনি বহুবার সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন এবং অনেক বার তিনি নিজেই এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি অনেকবার ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় গেছেন এবং পবিত্র স্থানসমূহে মূল্যবান জিনিসপত্র দান করেছেন। অনেকটা একই ধরনের কাজ করেছেন জুবাইদাহ।
তিনি মক্কা ও মদিনায় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে খাল খনন প্রকল্পে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছিলেন। এই দুই শহরে যাওয়ার পথে পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করাও এই প্রকল্পের অধীনে ছিল।
জুবাইদাহ’র এই উদাহরণ সৃষ্টির পর ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে দাতব্য হিসেবে জনকল্যাণমূলক বহু বড় বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ক্ষমতাসীন একটি পরিবারের সদস্য হওয়ার পরও জুবাইদাহ সেসময় ভাল কাজের জন্য বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এটি এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করেছিল যে, পরবর্তী আরও অনেক নারী একই ধরনের কাজ অব্যাহত রেখেছেন।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের দিক থেকে দেখতে গেলে হারুনের অবদান ছিল প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। হারুন ও জুবাইদাহ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তা পরবর্তী মুসলিম শাসকদের জন্য বহু শতাব্দী ধরে উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে।
তাদের অবদান শুধু জনকল্যাণমূলক কাজ ও জিহাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ‘কাজী’র মতো পদ প্রতিষ্ঠাও তার শাসনের উল্লেখযোগ্য দিক।
শাসক হিসেবে হারুনের জীবনে ন্যায়বিচার, পরিবার এবং রাজনীতি অনেকটা সমান তালেই চলেছে। তাই তার শাসনের ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় দিক আলাদা করাটা কঠিন। তার বাবার মতোই তিনিও গান এবং কবিতা ভালবাসতেন। তার একজন সৎবোন ও একজন সৎভাই পেশাগত জীবনে সঙ্গীতজ্ঞ এবং কবি ছিলেন। তার কবিতা এখনো পড়া হয়।
শিল্পকর্ম ছিল নিতান্তই ব্যক্তিগত শখ। কিন্তু তার মতো ক্ষমতাবান কোন ব্যক্তির পক্ষে এর প্রচারে অবদান রাখা এবং এটি প্রদর্শন করাটা কঠিন ছিল। এমনকি তার দরবারের অভিজাতদের কাছেও।
হারুন সব ধরনের শিল্পকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। তিনি এটি টিকিয়ে রেখেছেন এবং এর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছেন। এই ঐতিহ্য পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছিল।
তাই সবশেষ বিশ্লেষণে বলা যায় যে, হারুনকে স্মরণ করে যে সামাজিক মর্যাদা দেয়া হয়, সেটি তার প্রাপ্য। কারণ তিনি সভ্যতার চিরন্তন ধারণাকে জীবিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
হারুন এবং জুবাইদাহ ভবিষ্যৎ শাসকদের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছিলেন যে, কীভাবে মহান কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতার সাথে জনগণের সংযোগ স্থাপন করা যায়।
সর্বোপরি হারুন, জুবাইদাহ, তাদের সন্তান এবং বার্মাকিদ পরিবারের কাহিনী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।








