কেরালায় বাসে 'হেনস্তার' ভিডিও ভাইরাল, অভিযুক্তের আত্মহত্যা ও পোস্টকারী নারী গ্রেফতার

ছবির উৎস, Asgar Ali
- Author, ইমরান কুরেশি
- Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, বেঙ্গালুরু
সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওর কারণে দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য কেরালায় এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন বলে ওই ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ দায়ের করেছে। যে নারী ওই ভিডিওটি পোস্ট করেছিলেন, তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে বুধবার রাতে গ্রেফতার করে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি পোস্ট করে ওই নারী অভিযোগ করেছিলেন যে ওই ব্যক্তি বাসে করে যাওয়ার পথে তাকে অবাঞ্ছিতভাবে স্পর্শ করেছেন। সেজন্যই তিনি মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন বলে দাবি ওই নারীর।
শিমজিথা মুস্তাফা নামের ওই নারী সামাজিক মাধ্যমে কন্টেন্ট বানিয়ে থাকেন।
ঘটনাটি নিয়ে কেরালায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আত্মহত্যা
মৃত দীপক ইউ গত সপ্তাহে কন্নুড় জেলায় একটি বাসে চেপে কোঝিকোডে নিজের বাড়িতে ফিরছিলেন।
শিমজিথা মুস্তাফা অভিযোগ করেন যে ওই বাসেই 'শ্লীলতার গণ্ডি' পার করেন মি. দীপক এবং অবাঞ্ছিতভাবে স্পর্শ করেন তাকে। এরপরেই তিনি মোবাইলে নিজের ভিডিও রেকর্ড করেন, যাতে তার সামনে মি. দীপককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ওই বাসটিতে যে ভিড় ছিল, সেটা বোঝা যাচ্ছে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে।
কেরালার ইংরেজি পত্রিকা 'দ্য উইক' লিখেছে যে ওই ভিডিওটি দেখে মনে হচ্ছে যেন মি. দীপকের কনুই ওই নারীর বুকে লেগেছিল। অভিযুক্ত মিজ. মুস্তাফা দাবি করেছেন যে সেটা হঠাৎ করে ঘটেনি।
ওই ঘটনা গত শুক্রবারের। পরের দিন, ১৮ই জানুয়ারি মি. দীপকের ৪২তম জন্মদিন ছিল।
মি. দীপকের ২২ বছরের পুরনো বন্ধু আসগার আলি বিবিসিকে বলছিলেন, "গত শনিবার আমার কাছে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি আসে, আমি সেটাই দীপককে পাঠিয়েছিলাম। ও এতটাই ভদ্র সভ্য মানুষ যে কোনো মানুষের, বিশেষ করে কোো নারীর আঘাত লাগতে পারে, এমন কাজ করতেই পারে না।
"দীপক আমাকে বলেছিল যে বাসে ভীষণ ভিড় ছিল, তাই ওর পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা দেখতেই পায়নি ও," জানাচ্ছিলেন মি. আলি।
সংবাদ সংস্থা এএনআই মৃত দীপক ইউ-এর পরিবারকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ওই ভিডিওটি দেখেছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে তাকে দোষী বানিয়ে যেভাবে ট্রল করা হচ্ছিল, তাতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মি. দীপক।
রোববার ১৮ই জানুয়ারি কোনো এক উকিলের সঙ্গে দেখা করে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ওই নারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন দুই বন্ধু।
কিন্তু সেদিনই সকাল সাতটা নাগাদ তাকে ডাকতে গিয়ে মি. দীপকের বাবা-মা কোনো সাড়া পাননি। প্রতিবেশীদের সাহায্যে দরজা ভেঙে ছেলেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
কী বলেছিলেন ওই নারী?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মি. দীপক আত্মহত্যা করার পরেই নিজের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেন শিমজিথা মুস্তাফা। পরে অন্য একটি সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে তিনি জানিয়েছিলেন যে ওই ভিডিওটি পোস্ট করে তিনি ভুল কিছু করেননি।
তিনি লিখেছিলেন যে 'ভিউ' বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়, একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক বিষয় প্রকাশ করতেই তিনি ভিডিওটি করেছিলেন।
ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লীগের হয়ে কোঝিকোড জেলা পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সদস্য মিজ. মুস্তাফা লিখেছিলেন, "আমি গতকাল বাসযাত্রার সময়ে এক ব্যক্তির ভিডিও পোস্ট করেছিলাম, যিনি ইচ্ছা করে আমার শরীর স্পর্শ করছিলেন। এটা হঠাৎ করে হওয়া কোনো ঘটনা যেমন ছিল না তেমনই কোনো ভুল বোঝাবুঝিও ছিল না। এটা গুরুতর মনোবৈজ্ঞানিক এবং শ্লীলতার গণ্ডি ছাড়ানোর বিষয়। বিনা অনুমতিতে কারো শরীর স্পর্শ করার অধিকার কি কারও আছে?"
"ওই ব্যক্তির হাবভাব এমন ছিল যেন কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না। আমি একথা এজন্য লিখছি যে আমার সামনে দাঁড়ানো আরেক নারীকেও উত্ত্যক্ত করছিল ওই ব্যক্তি। তখনই আমি ক্যামেরা অন করে তার গতিবিধি রেকর্ড করতে শুরু করি। সে দেখেছিল যে আমি ভিডিও বানাচ্ছি, কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল। কিন্তু আমি তাকে আবারও একই কাজ করতে দেখি," লিখেছিলেন মিজ. মুস্তাফা।

ছবির উৎস, ARUN SANKAR/AFP via Getty Images
আত্মহত্যার পরে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে
পোশাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক সংস্থায় কাজ করতেন মি. দীপক। ওই সংস্থার মালিক প্রসাদ বি. বিবিসিকে বলছিলেন, "ওর আচরণে বিন্দুমাত্রও অসঙ্গতি ছিল না। আমাদের সব ক্রেতারাই শক পেয়ে বলছেন যে ওর সঙ্গে এই ঘটনা কীভাবে ঘটল!"
"ও আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে ওই পোস্টের ব্যাপারে আমি কী ভাবছি। ওকে বলেছিলাম চিন্তা করো না। সামাজিক মাধ্যমে ওর পক্ষ নিয়ে কত কমেন্ট হয়েছে, সেগুলোও দেখিয়েছিলাম ওকে," বলছিলেন মি. প্রসাদ।
চিকিৎসক জেসন ফিলিপ এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, "কনুই দিয়ে বুক স্পর্শ করা দীর্ঘদিন ধরেই বিকৃতকাম পুরুষদের কৌশল। আমি যখন কিশোর ছিলাম, তখন আমার সহপাঠীরা আমাকে দেখাত যে গণপরিবহণে বা রাস্তায় হাঁটার সময়ে যে কোনো নারীর সঙ্গে এটা করা যায়। পুরুষ অধিকারকর্মীরা ওই নারীকে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা করছে। তবে ওই নারী যখন মনে করেছেন যে এটা যৌন হেনস্থা, তখন তার অধিকার আছে ভিডিও রেকর্ড করার। খারাপ লাগছে যে ওই ব্যক্তি মারা গেছেন, কিন্তু তা থেকে প্রমাণ হয় না যে তিনি দোষ করেননি।"
এই পোস্টের জবাবে অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখিকা কস্তুরী তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন যে স্কুলে পড়ার সময় থেকে ভিড় বাসে প্রায় প্রতিদিনই তাকে এভাবে স্পর্শ করা হত।
"এক মাইল দূর থেকেও আমি যৌন হেনস্থা টের পাই। এটা কিন্তু তা নয়। ওই ব্যক্তি কি আগে কখনো এরকম করেছেন? জানি না। তবে এই ভিডিওতে কি তিনি সেরকম কিছু করেছেন? না।"
সোনাম মুর্থি নামে আরেকজন এক্স হ্যান্ডেলে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখে লিখেছেন, "একজন পুরুষের অত কাছে দাঁড়ালে বাসের দোলায় শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ায় ছোঁয়া লাগতে পারে। আপনি হাসতে হাসতে ভিডিও করে গেলেন। আমি এমন কখনো দেখিনি যে এরকম ক্ষেত্রে কোনো নারী স্বাভাবিকভাবে সরে দাঁড়ায় না।"
ইলাকিয়ান করুণানিধি নামে আরেকজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, "ওই ব্যক্তির ভুল, হ্যাঁ। ভিডিও করাও ঠিক আছে, কিন্তু সেটা নিয়ে থানায় গিয়ে ওই বিকৃতকাম ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা উচিত ছিল – সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা কেন? ওই নারী কি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন? যদি তা করা হতো আর ভিডিওটা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হতো তাহলে ওই ব্যক্তি এখন জেলে থাকতেন … মারা যেতেন না।"
(আত্মহত্যা এক গুরুতর মনোবৈজ্ঞানিক আর সামাজিক সমস্যা। আপনি যদি মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, বন্ধু আর আত্মীয়দের সঙ্গেও কথা বলা উচিত। ভারত সরকারের জীবনসাথী হেল্পলাইন – 18002333330 নম্বরে ফোন করেও সহায়তা নিতে পারেন।)








