ইসরায়েলের সাথে প্রথম যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয়েছিল যে কারণে

আরব সৈন্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইসারায়েলের রিরু্ধে যুদ্ধরত আরব সৈন্যরা।

১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বসবাসরত ইহুদিরা রেডিও সেটের সামনে বসে আছেন। ফিলিস্তিন ভূখন্ড নিয়ে জাতিসংঘে তখন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব উঠেছে ভোটাভুটির জন্য। ফিলিস্তিনকে ভাগ করে ইহুদিদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব নিয়ে এই ভোটাভুটি। সে জন্যই রেডিওতে প্রচারিত খবরের দিকে ইহুদিদের ব্যাপক মনোযোগ।

ইহুদিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জাতিসংঘ থেকে কী খবর আসে সেটা শোনার জন্য ।

যখন তারা শুনলেন যে জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে এই প্রস্তাব পাস হয়েছে, তখন ইহুদি এলাকাগুলোতে চলছিল প্রবল উচ্ছ্বাস। এতদিনে তারা একটি আলাদা ভূখণ্ড পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেটির স্বীকৃতি দিয়েছে।

'আ হিস্ট্রি অব ফার্স্ট আরব-ইসরায়েল ওয়ার’ বইতে ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ বেনি মরিস এই চিত্র তুলে ধরেছেন।

ইহুদিরা যেখানে আনন্দ-উল্লাস করছিল তার ঠিক কিছুটা দূরে আরবদের গ্রামগুলো বিষাদ ও হতাশায় ছেয়ে গিয়েছিল। তারা এটা আশংকা করছিল অনেক দিন থেকেই।

নতুন ইতিহাস তৈরি

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জায়নিস্ট বা ইহুদি রাষ্ট্রপন্থী সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত শহর ও গ্রামে হামলা চালায়।

এসময় ৫০০শ’রও বেশি গ্রাম ধ্বংস করে ইহুদিরা এবং ১৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে কিছু ছিল গণহত্যার মতো।

সবচেয়ে বড় আকারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় দেইর ইয়াসিন এলাকায় ১৯৪৮ সালের ৯ই এপ্রিল। জায়নিস্ট মিলিশিয়ারা সে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

সেখানে অন্তত ১০৭জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়। বতর্মান পশ্চিম জেরুসালেমের একটি এলাকা ছিল দেইর ইয়াসিন।

আরব লীগ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আরব লীগ বাহিনীর সৈন্যরা ১৯৪৮ সালে যুদ্ধরত।

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাব এবং ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েলের সাথে সিরিয়ার অস্ত্ররিবতি পর্যন্ত সর্বমোট ২০ মাসের মতো স্থায়িত্ব ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের।

এই সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক চিত্র চিরতরে বদলে গিয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে আরব ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব বিলোপ হয়ে নতুন রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্ম হয়েছে। মিশর, সিরিয়া ও লেবানন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে।

ইরাক কোনও মতে তাদের সীমান্ত ধরে রেখেছিল। অন্যদিকে জর্ডান জয় পেলেও তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে জর্ডান পশ্চিম তীর পেয়েছিল।

জাতিসংঘের প্রস্তাব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমানদের হটিয়ে দেবার পর ফিলিস্তিন ছিল ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। এরপর থেকে আরব এবং ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত লেগেই থাকে।

সে জন্য ফিলিস্তিনকে ভাগ করে দুটো অংশ করে দুটো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে জাতিসংঘ।

১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনি এলাকাকে দুটো ভাগ করে দেবার প্রস্তাব গৃহীত হয় জাতিসংঘে।

সেখানে জেরুসালেমকে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক এলাকা হিসেবে রাখার প্রস্তাব করা হয়।

এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ৩৩টি দেশ। ১৩টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ১০টি দেশ ভোটদানে পুরোপুরি বিরত ছিল।

এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আরব দেশগুলো অধিবেশন থেকে বের হয়ে গেলেও প্রস্তাবটি পাশ হয়েছিল।

সংঘাত শুরুর সময়

জাতিসংঘে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পরপরই শুরু হয় ফিলিস্তিনি ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত।

আরবরা এই ঘোষণা কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। পারার কথাও নয়। কারণ, তাদের ভূখণ্ড কেড়ে নিয়ে ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

এটিই ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ইসরায়েলিদের কাছে এটি ছিল স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং অন্য দিকে ফিলিস্তিনিদের কাছে এটি ছিল বিপর্যয়ের দিন।

প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের দুটি পর্যায় ছিল। প্রথম পর্যায়ে ইহুদি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘাত হয়। এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে আরব লীগের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো।

ইসরায়েল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলি সৈন্যরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ১৯৪৮ সালে।

জাতিসংঘে প্রস্তাব গৃহীত হবার ছয় মাসের মধ্যে, ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গৌরিয়ন।

এর মাধ্যমে ইহুদিরা একটি রাষ্ট্র পেল।

এই ঘোষণার আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি এবং ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত জোরালো আকার ধারণ করে। ফিলিস্তিনি এলাকায় উত্তেজনা তখন চরমে।

বিভিন্ন জায়গায় সশস্ত্র ইহুদি গোষ্ঠীগুলো ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ চালায়।

ফিলিস্তিনিদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় জায়নিস্ট সশস্ত্র গ্রুপগুলো।

তারা চেয়েছিল যে কোনও মূল্যে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ছাড়া করতে। সে জন্য এাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল সশস্ত্র চরমপন্থী ইহুদি সংগঠনগুলো।

এর ফলে প্রচুর ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে এসব এলাকায় ইহুদিরা আরো বেশি করে আসতে থাকে।

আরব দেশের অংশগ্রহণ

তবে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণার পর সেই সংঘাত পুরোপুরি সামরিক যুদ্ধে রূপ নেয়।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরদিন থেকে সামরিক মাত্রায় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়।

এই দিনকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ বা বিপর্যয়ের দিন হিসেবে পালন করে এখনও। পাঁচটি আরব দেশ একযোগে আক্রমণ করে ইসরায়েলকে বিতাড়নের জন্য।

যে এলাকায় ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী সেখান থেকে বেশির ভাগ আরবকে বহিষ্কার করে, কিংবা তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

১৯৪৮-১৯৪৯ এই দু'বছরের আরব- ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে।

ইসরায়েল যখন রাষ্ট্র ঘোষণা করে তখন মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাক থেকে আরব বাহিনী ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয়। আরব সৈন্যরা আক্রমণ শুরু করে।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীকে তারা ঘিরে ফেলে। ইসরায়েলি বাহিনী তখন সম্ভাব্য পরাজয়ের মুখে।

ঠিক তখনই চার সপ্তাহ যুদ্ধবিরতির জন্য হস্তক্ষেপ করে জাতিসংঘ। এই যুদ্ধবিরতি প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েলের পক্ষে গিয়েছিল।

আবদুল্লাহ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৪৮ সালে ট্রান্সজর্ডানের (বর্তমানে জর্ডান) বাদশাহ আবদুল্লাহ।

আরবদের মধ্যে সমন্বয় ছিল না

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কিন্তু যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইসরায়েল তৎকালীন চেকশ্লোভাকিয়া থেকে ভারি অস্ত্রশস্ত্র আনে।

এই চার সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েল নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে। এটি যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়।

যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়া মাত্রই ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং আরবদের নিয়ন্ত্রিত দুটো এলাকা দখল করে নেয়।

এসব এলাকা জাতিসংঘ ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ করেছিল। সে সব জায়গা থেকে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি চলে যেতে বাধ্য হয়।

অন্য দিকে ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ করা ভূমি একের পর এক দখল করে নেয় ইসরায়েল।

ইরাকি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লেইম মনে করেন, যুদ্ধের প্রথম দিকে আরব সেনাবাহিনী কার্যকরী ভূমিকা পালন করলেও ইসরায়েল যখন পাল্টা আক্রমণ শুরু করে তখন সেটির বিরুদ্ধে আরব সৈন্যদের তেমন কোন কার্যকরী ভূমিকা দেখা যায়নি।

আরব দেশগুলোর সেনাবাহিনীর মধ্যে খুব একটা সমন্বয় ছিল না এবং কোনও সহযোগিতাও ছিল না। যেসব আরব দেশ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাদের একটি প্রধান কার্যালয় ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন একজন ইরাকি জেনারেল।

কিন্তু অন্য দেশগুলোর সৈন্যদের উপর তার কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

এছাড়া আরব দেশগুলোর সামরিক অভিযান তাদের পরিকল্পনা মতো এগোয়নি।

ইহুদি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৪৮ সালে ইহুদি সশস্ত্র সংগঠন হাগানাহ বাহিনীর একজন সদস্য।

মিশরের নেতৃত্বে আরব দেশগুলো গাজায় একটি ফিলিস্তিনি সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল।

তবে মিশরের তৎকালীন বাদশাহ ফারুক-এর উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। বিষয়টিকে তিনি তার দেশের জন্য কৌশলগতভাবে বিবেচনা করেছিলেন।

অন্যদিকে জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ চেয়েছিলেন ফিলিস্তিনিদের যে অংশ আরবদের সাথে, সেটিকে জর্ডানের সাথে নিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ, জর্ডানের সীমান্ত আরো সম্প্রসারণ করা।

বাদশাহ ফারুক চেয়েছিলেন জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ যাতে ফিলিস্তিনকে তাদের অংশে নিতে না পারেন। সেটি বাধাগ্রস্ত করাই ছিল মিশরের তৎকালীন বাদশাহ ফারুকের মূল উদ্দেশ্য।

এদিকে ইসরায়েল আরব দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব পর্যবেক্ষণ করছিল এবং একই সাথে নিজেদের অবস্থান সংহত করছিল।

আরবদের উদাসীনতা

বিমান হামলার মাধ্যমে মিশরের বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে ইসরায়েল।

আভি শ্লাম বলছেন, তখন মিশর সাহায্যের জন্য আহবান জানালেও অন্য আরব দেশগুলো তাতে কর্ণপাত করেনি।

লেবানন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটি তারা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। মিত্রদের সমর্থনে ইরাকি বাহিনী ইসরায়েলের কয়েকটি গ্রামে বোমাবর্ষণ করছিল।

“কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া আরব দেশগুলো হস্তক্ষেপ করার বিষয়ে হয়তো ভীত ছিল, নয়তো তাদের কোনও আগ্রহ ছিল না, ” লিখেছেন আভি শ্লাম।

বছরের শেষ নাগাদ গাজায় মিশরীয়রা পরাজিত হয়। ফলে ফিলিস্তিনের অখণ্ডতা রক্ষার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।

নিজেদের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ব্রিটেনের দ্বারস্থ হয় মিশর। ফলে ১৯৪৯ সালে মিশর এবং আরো কয়েকটি আরব দেশের সাথে ইসরায়েলের একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এর ফলে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শেষ হয়। সে যুদ্ধে সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়।

ইসরায়েল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল ছয়দিন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি কমান্ডাররা পূর্ব জেরুসালেমে প্রবেশ করে।

প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আরবরা তাদের শাসকদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।

এই পরাজয়ের জন্য আরব জনগণ একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।

তার ওপর এতোটা শোচনীয় পরাজয় হবে সেটি তারা একেবারেই মেনে নিতে পারেনি।

সে যুদ্ধের তিন বছরের মধ্যে মিশর ও লেবাননের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং জর্ডানের তৎকালীন বাদশাহকে হত্যা করা হয়।

এছাড়া সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও মিশরের তৎকালীন বাদশাহকে সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে।