ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতি নিয়ে সমালোচনা কেন?

ছবির উৎস, ISNA/WANA/Reuters
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এছাড়াও এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শুধুমাত্র গত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুধুমাত্র তেহরানেই মারা গেছেন অন্তত ৫৭জন নাগরিক।
এই ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শোক ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোকও প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে শনিবার ইরান পাল্টা হামলা চালায় ইরান। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা চালায় ইরান।
এমন অবস্থার মধ্যে রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। যেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের 'কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে দাবি করে এর নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই বিবৃতিতে কোথাও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নামও উল্লেখ করা হয়নি। সেই সাথে ইরানে হামলার ঘটনায়ও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।
রোববার সন্ধ্যায় ওই বিবৃতিটি প্রকাশের পর সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা দেখা যায়।
এ নিয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিবিসি বাংলা। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন অবস্থানকে 'একপেশে' মনে করছেন কূটনীতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা।
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ন্যায় সঙ্গত হওয়া উচিত ছিল। আমরা জানি না এই বিবৃতি কী কারো চাপে পড়ে দিয়েছে, নাকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজে থেকেই দিয়েছে"।
এদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে এই বিবৃতিতে এ-ও বলেছে, চলমান শত্রুতা কেবল আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বেসামরিক জনগণের কল্যাণকেও বিপন্ন করবে।

ছবির উৎস, MINISTRY OF FOREIGN AFFAIRS
যা আছে বাংলাদেশের বিবৃতিতে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরই এর জবাব দিতে শুরু করে ইরান। প্রথম ইসরায়েল ও পরে মধ্যপ্রাচ্যের যে সব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সে সব ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান পাল্টা হামলা চালায়।
এমন পরিস্থিতিতে শনিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকও করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঐ অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিও দেয়।
সেখানে বাংলাদেশ সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, উত্তেজনা পরিহার এবং অবিলম্বে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানায়।
রোববার ভোরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলে উত্তেজনা আরো বাড়তে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার তীব্র প্রতিবাদও জানানো হয়।
রোববার বিকেলে ঢাকায় বিক্ষোভ করে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও।
এই অবস্থার মধ্যে রোববার বিকেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনায় একটি বিবৃতি দেয়। এতে ইরানে হামলার পর সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সতর্ক করে এই বিবৃতিতে বলেছে, চলমান শত্রুতা কেবল আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বেসামরিক জনগণের কল্যাণকে বিপন্ন করবে।
দেশটি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং মতপার্থক্য নিরসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এই অঞ্চলের কিছু দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দাও জানায় বাংলাদেশ।

ছবির উৎস, Reuters
কূটনীতিক বিশ্লেষকেরা কী বলছেন?
মূলত এই বিবৃতির পরই এ নিয়ে আলোচনা -সমালোচনা তৈরি হয় বাংলাদেশে। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কূটনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানেই বলা আছে দেশের অবস্থান হবে যে কোনো ধরনের আগ্রাসন বিরোধী। কিন্তু এই ইস্যুতে বাংলাদেশ বেশ সতর্ক অবস্থানে থেকেছে বলেও মনে করছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।
সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিকে একপেশে বলে বর্ণনা করেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সংবিধান বলছে আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে থাকতে হবে। একই সাথে কেউ যদি অবৈধভাবে বলপ্রয়োগ করে তার বিরুদ্ধেও অবস্থান থাকা উচিত"।
তিনি মনে করেন, এই ইস্যুতে বর্তমান সরকারের উচিত ছিল বিবৃতিতে সব পক্ষের নাম উল্লেখ করা। একই সাথে দুই পক্ষের হামলার নিন্দা জানানো। কিন্তু সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেনি।
চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে ইরান আগে আক্রান্ত হয়েছে। ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যখন ইরান আক্রান্ত হয়েছে, তখন জবাব দিয়েছে তারা।
তিনি বলছিলেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে ইরানে হামলা হয়ে থাকে, ইরান যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তখন অবশ্যই তার অধিকার আছে তা প্রতিহত করার।
'বাংলাদেশের এই বিবৃতি কারো চাপে পড়ে দিয়েছে কী-না,' এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আগ্রাসন তো আগে চালিয়েছে ইসরায়েল- যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন এমন অবস্থান নিচ্ছে সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে যে ধরনের বক্তব্য আশা করেছিলাম সে ধরনের বক্তব্য পাই নি"।

ছবির উৎস, Reuters
একজন বাংলাদেশিসহ নিহত তিনজন
ইরানের পাল্টা হামলায় দুবাই এয়ারপোর্ট, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোববারও ইরান ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা চালাতে দেখা গেছে।
ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন বাংলাদেশিসহ তিনজন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
আরব আমিরাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এই হামলায় একজন বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও নেপালি নাগরিক নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন অন্তত ৫৮ জন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ১৬৫ টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে এবং এগুলোর মধ্যে ১৫২ টি ধ্বংস করেছে। এছাড়াও দু্ইটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।








