সংলাপে গুম-খুন নিয়ে বিতর্ক

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন, বর্তমান সরকারের আমলে খুন ও গুমের ঘটনা নজিরবিহীন ভাবে বেড়ে গেছে এবং রাজনৈতিক কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, রাজনীতির চেয়ে সামাজিক অন্যান্য কারণগুলোই গুম-খুনের জন্য বেশি দায়ী ।
শনিবার বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নাটোর শহরের রাজবাড়ী চত্বরে অনুষ্ঠিত সংলাপের এই পর্বে আরও নানা বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে ছিল বেকার জনগোষ্ঠীর চাকরি, পোশাক কারখানা ও শ্রমিক এবং কৃষিপণ্যের দাম সহ বিভিন্ন প্রশ্ন।
সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন নাটোর-১ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য মোজাম্মেল হক, নাটোর সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিষদ- নাটোর লাঠি বাঁশি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুস সালাম এবং নাটোর ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা আলো’র নির্বাহী পরিচালক শামীমা লাইজু নীলা।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন রনেন রায়। তিনি জানতে চান মামলার আসামী সহ অনেকে এখন গুম ও খুনের শিকার হচ্ছে এবং প্রায় ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। এসব হত্যাকাণ্ড বন্ধে আদৌ কি কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে ?
জবাবে আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন রাজনীতির চেয়ে সামাজিক অন্যান্য কারণেই গুম-খুনের ঘটনা বেশি ঘটছে। তবে এসব বিষয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও বেশি তৎপর হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপি নেতা মোজাম্মেল হক বলেন বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণেই গুম খুন বেশি হচ্ছে এবং তিনি মনে করেন এগুলো রাজনৈতিক কারণেই হচ্ছে।
তার দাবি সরকার এ সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেনা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আব্দুস সালাম বলেন, "রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতির চর্চার কারণেই গুম খুনের মতো ঘটনাগুলো ঘটেই চলেছে"।
অপর আলোচক শামীমা লাইজু নীলা বলেন কেউ অপরাধ করলে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি হওয়া উচিত। সরকার আন্তরিক হলে এসব ঘটনা হতোনা বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
একজন দর্শক বলেন, “যারা খুন বা গুম হচ্ছে তারা সন্ত্রাসী। তার কোন রাজনীতিক নন”।
আরেকজন দর্শক বলেন, “সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেনা বলেই গুম খুন হচ্ছে”।
প্রসঙ্গ বেকারত্ব
মো: হাসিবুল হোসাইন জানতে চান সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেকার। তাহলে কি সরকারের ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি?
আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নানা ধরনের ঋণ ও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। অনেককে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সেটির বাস্তবায়ন হচ্ছে। ১৬টি জেলায় বিশেষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে”।
মোজাম্মেল হক বলেন, “ঘরে ঘরে চাকুরী একটি রাজনৈতিক শ্লোগান। সরকার ওয়াদা দিয়েছিলো কিন্তু এটি পূরণের সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয়না”। তিনি বলেন, “সরকারের দায়বদ্ধতা বেশি। তবে বেসরকারি খাতের অবদান কম নয়”।
আব্দুস সালাম বলেন, “বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কর্মসংস্থানের জন্য আদৌ কোন কর্মপরিকল্পনা আছে কি ? ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের নীতি কি? সেটি না থাকলে সেখানে পৌঁছাবে কি করে”?
শামীমা লাইজু নীলা বলেন, “ ভোট চাওয়ার আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। যদিও আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। সেটি বিবেচনা না করেই এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়”। তিনি বলেন, “চাকুরী দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া পূরণ হয়নি এটি সত্য। তবে সরকার আয় বর্ধক কাজে শিক্ষিতদের এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়েছে”।
একজন দর্শক বলেন, “এটা সরকারের একটা পলিসি। কিন্তু জনকল্যাণমূলক রাজনীতি হলে এদেশে সবকিছুই সম্ভব”।
পোশাক কারখানা প্রসঙ্গ
শ্যামলী খাতুন জানতে চান শ্রমিকদের বিকল্প কাজের ব্যবস্থা না করে নিরাপত্তার কথা বলে পোশাক কারখানা বন্ধ করে দেয়া কতটা যৌক্তিক ?
আলোচনায় অংশ নিয়ে মিস্টার আজাদ বলেন, “অপরিকল্পিতভাবে এ শিল্পখাতটি গড়ে উঠায় নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার শ্রমিক, মালিকদের সাথে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। সবকিছু গোছানোর চেষ্টা হচ্ছে”।
তিনি বলেন সরকারের চাপের কারণে মালিকরা বেতন বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
মোজাম্মেল হক বলেন, “শ্রমিকরা তাদের আয় দিয়ে পুরো পরিবার চালান। কোন বিকল্প ব্যবস্থা না করে কারখানা বন্ধ করা যৌক্তিক। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত”। সরকারের যে তত্ত্বাবধান থাকা দরকার সেটি নেই বললেই চলে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আব্দুস সালাম বলেন, “কারখানা বন্ধের সাথে সাথেই কি ৩/৪ হাজার শ্রমিকের বিকল্প ব্যবস্থা সম্ভব ? তবে সরকারের একটি দায়িত্ব রয়েছে। তাদের উচিত একটি ব্যবস্থা করা”। তিনি বলেন, “মালিকদের মধ্যে আন্তরিকতা থাকলে শুরু থেকেই ব্যবস্থা নেয়া হতো যাতে কারখানায় কোন অঘটন না ঘটে”।
একজন দর্শক বলেন, “কারখানায় নিরাপত্তা না থাকলে বন্ধ করে দেয়াই উত্তম। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে দেয়া যাবেনা”।
শামীমা লাইজু নীলা বলেন, “ঝুঁকি মোকাবেলার পলিসি শক্তিশালী হওয়া দরকার। কারখানা মনিটরিং করতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা নেই বলেই এতো দুর্যোগ হচ্ছে”।
কৃষিপণ্যের দাম প্রসঙ্গ
মোসাম্মৎ রাবেয়া নাসরিন জানতে চান সার ও কীটনাশকের দামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করা কি সম্ভব ?
জবাবে আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সার, কীটনাশকের মূল্যের সাথে দামে সমন্বয় হয়। আখ চাষিরা সরাসরি ভর্তুকি পাচ্ছে। কৃষকরা ডিজেলের দাম পাচ্ছে সরাসরি। তাই কৃষকরা সব ক্ষেত্রে লোকসান দিচ্ছে সেটি ঠিক নয়।
শামীমা লাইজু নীলা বলেন, “কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকি দিয়ে এ সমস্যা মোকাবেলা সম্ভব। এ জন্য সরকারের একটি শক্তিশালী নীতি থাকা দরকার। কারণ বেশি আয় কৃষিখাত থেকেই আসে”।
একজন দর্শক বলেন, “কৃষকরা ধান ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। এর দাম সঠিকভাবে দিতে হলে সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার”।
আব্দুস সালাম বলেন, “সরকার সব ধরণের সারে ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু সেটা কৃষকরা ঠিক মতো পাচ্ছে কিনা। না পেলে এটি সরাসরি কৃষককে দেয়া উচিত। তবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া মনে হয় সম্ভব হবেনা”।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, “দাম নির্ধারণে একটি সমন্বয় থাকা উচিত। আমার এলাকায় রসুন উৎপাদিত হচ্ছে। সার ও কীটনাশকের দাম সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত”।








