আপনি হয়তো চিন্তাও করেননি—গান গাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য এতটা উপকারী

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ডেভিড কক্স
গুনগুন করে গাইতে থাকা গানে যেমন মানুষের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আনন্দ বা বিষাদ ফুটে ওঠে, আবার গানের মধ্য দিয়েই ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ বা বিজয়োল্লাস।
যিনি গান গাইছেন তিনি যেমন এক রকম ভালোলাগা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, আবার তার নিজের অজান্তেই তার স্বাস্থ্যকেও তিনি চাঙ্গা করে তুলছেন।
মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্র পর্যন্ত—গান গাওয়া নানামুখী উপকার বয়ে আনে বলে প্রমাণ মিলেছে, বিশেষ করে যখন তা দলবদ্ধভাবে গাওয়া হয়।
এটি মানুষকে কাছাকাছি আনে, রোগ প্রতিরোধে শরীরকে প্রস্তুত করে এবং এমনকি ব্যথাও কমাতে পারে।
তাহলে কি নিজের কণ্ঠে আনন্দঘন সুর তোলা উচিত?
মস্তিষ্কের আঘাত থেকে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সেরে উঠতে সংগীত কীভাবে সহায়তা করতে পারে সে বিষয়ে গবেষণা করেছেন অ্যালেক্স স্ট্রিট। কেমব্রিজ ইনস্টিটিউট ফর মিউজিক থেরাপি রিসার্চের এই গবেষক বলেন, "গান গাওয়া একটি জ্ঞানগত, আবেগীয়, শারীরিক ও সামাজিক কাজ"।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বিস্মিত হয়ে দেখছেন, আরো কয়েকজনের সঙ্গে একসাথে গান গাওয়া কীভাবে মানুষদের মধ্যে শক্তিশালী সামাজিক সংহতির অনুভূতি তৈরি করে। এমনকি সবচেয়ে অনিচ্ছুক কণ্ঠশিল্পীরাও গানের মাধ্যমে একাত্ম হয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এক ঘণ্টা একসাথে গান গাওয়ার পর সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদের মধ্যেও অস্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
আশ্চর্যের কিছু নেই, গান গাওয়া ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য স্পষ্ট শারীরিক উপকার বয়ে আনে।
উদাহরণস্বরূপ, কিছু গবেষক ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্যের জন্য গান গাওয়ার কৌশল ব্যবহার করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ভালোলাগার স্পন্দন
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তবে গান গাওয়া আরও কিছু পরিমাপযোগ্য শারীরিক প্রভাবও তৈরি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপের উন্নতি ঘটায়। এমনকি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। তবে এটা মূলত দলীয় বা কোরাসে গান গাওয়ার মাধ্যমে সম্ভব, শুধু গান শুনে সেটা সম্ভব নয়।
এর পেছনে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। জীববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয়, গান গাওয়া মস্তিষ্ক, হার্ট ও পরিপাক তন্ত্রের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী নার্ভকে সক্রিয় করে, যা সরাসরি স্বরযন্ত্র ও গলার পেছনের পেশির সঙ্গে যুক্ত।
গান গাওয়ার সময় দীর্ঘ ও নিয়ন্ত্রিত নিঃশ্বাস এন্ডরফিন নিঃসরণ করে, যা আনন্দ, সুস্থতা ও ব্যথা হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গান গাওয়া মস্তিষ্কের উভয় পাশে বিস্তৃত নিউরনের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে। ভাষা, নড়াচড়া ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সেই সাথে গান গাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসের মনোযোগ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে মানসিক চাপ কমানোর কার্যকর উপায়।
স্ট্রিট বলেন, "এই 'ভালো লাগা'র প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে কণ্ঠের প্রাণচঞ্চলতায়, মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরি ভঙ্গিতে"।
এই উপকারগুলোর পেছনে আরও গভীরে নিহিত কারণ থাকতে পারে।
কিছু নৃতত্ত্ববিদের মতে, আমাদের মানব-সদৃশ পূর্বপুরুষরা কথা বলা শেখার আগেই গান গাইত, তারা প্রকৃতির শব্দ অনুকরণ করতে বা অনুভূতি প্রকাশ করতে কণ্ঠস্বর ব্যবহার করত।
এটি জটিল সামাজিক সম্পর্ক, আবেগের প্রকাশ ও আচার-অনুষ্ঠানের বিকাশে সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।
স্ট্রিট উল্লেখ করেন, এ কারণেই এটা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় যে গান মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ— কেউ সংগীতে পারদর্শী হোক বা না হোক।
তিনি আরও বলেন, জন্ম থেকেই আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীর এমনভাবে গঠিত যে গান শুনলে বা গাইলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক সাড়া দিই।
"শিশুদের ঘুম পাড়াতে যেমন গান গাওয়া হয়, আবার মৃত্যুর সময়ও গাওয়া হয় গান,"তিনি বলেন, "আমরা ছড়া কেটে গুনে নামতা শিখি, আর তাল ও সুরের মাধ্যমে শিখি আমাদের এবিসি"।
দলবেঁধে গাওয়া
তবে সব ধরনের গান গাওয়া সমানভাবে উপকারী নয়।
উদাহরণস্বরূপ, দলগতভাবে বা কোরাসে গান গাওয়া একা গান গাওয়ার তুলনায় মানসিক সুস্থতার অনেক বেশি উন্নতি ঘটায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
এই কারণেই শিক্ষাবিষয়ক গবেষকেরা শিশুদের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলা, ভাষার বিকাশ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়াতে গান গাওয়াকে একটি কার্যকর উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
গান গাওয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর উপকারগুলোর একটি হলো—এটি মস্তিষ্ককে ক্ষতি থেকে সেরে উঠতে সহায়তা করতে পারে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরাও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবনমান উন্নত করতে গান গাওয়ার দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা ক্যান্সার ও স্ট্রোক থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ, পারকিনন্স ডিজিজ ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের সেবাদানকারীদের জন্য গঠিত কমিউনিটি কোরাসে অংশগ্রহণের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।
উদাহরণ হিসেবে, গান গাওয়া পারকিনন্স রোগীদের উচ্চারণের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে —যা রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত দুর্বল হয়ে পড়ে।
গান গাওয়া সাধারণ স্বাস্থ্য উন্নয়নেরও একটি উপায়, কারণ এটি দ্রুত হাঁটার মতোই একটি অবমূল্যায়িত ব্যায়াম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
"গান গাওয়া একটি শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যায়ামের মতো এরও কিছু উপকার থাকতে পারে," বলেন সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত ফিজিওথেরাপির সহযোগী অধ্যাপক অ্যাডাম লুইস।
একটি গবেষণায় এমনটাও বলা হয়েছে, গান গাওয়া এবং সুর ও তাল নিখুঁত করতে প্রশিক্ষিত গায়কদের ব্যবহৃত বিভিন্ন কণ্ঠচর্চা—হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জন্য মাঝারি গতিতে ট্রেডমিলে হাঁটার মতোই কার্যকর একটি ব্যায়ামের সমতুল্য হতে পারে।
তবে গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে ভোগা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দলগত গান গাওয়ার উপকারের কথাও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন, যেটা এখন পর্যন্ত অতটা স্বীকৃত নয়।
স্ট্রিট ব্যাখ্যা করেন, গান গাওয়া এই মানুষদের তাদের অক্ষমতার বদলে সক্ষমতার দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
"হঠাৎ করেই ঘরে এক ধরনের সমতা তৈরি হয়—যেখানে সেবাদানকারীরা আর শুধু সেবাদানকারী থাকেন না, স্বাস্থ্যকর্মীরাও একইভাবে গাইতে থাকেন একই গান," বলেন স্ট্রিট।
"এরকম প্রভাব তৈরির মতো আসলে তেমন কিছু নেই"।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
নিঃশ্বাসের কষ্টে উপশম
গান গাওয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্তরা। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের শ্বাসযন্ত্রবিষয়ক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্লিনিক্যাল লেকচারার কেইর ফিলিপের গবেষণার একটি বড় ক্ষেত্র এটি।
ফিলিপ সতর্ক করে বলেন, গান এই রোগগুলোর পুরোপুরি সারাতে পারবে না, তবে এটি একটি কার্যকর সমন্বিত পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে, যা প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে সম্পূরক হিসেবে কাজ করে।
"কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার ফলে শ্বাস নেওয়ার ধরন পরিবর্তিত হয়ে অনিয়মিত ও দুর্বল হয়ে যায়," বলেন ফিলিপ।
"গানভিত্তিক কিছু পদ্ধতিতে পেশীর ব্যবহার, ছন্দ ও শ্বাসের গভীরতার মাধ্যমে শ্বাসের ধরন ঠিক করতে সাহায্য করে, যা উপসর্গগুলো হ্রাসে সহায়ক হতে পারে"।
তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোর একটি ছিল—ইংলিশ ন্যাশনাল অপেরার পেশাদার গায়কদের সঙ্গে কাজ করে তৈরি একটি শ্বাসপ্রশ্বাস কর্মসূচি যেটি লং কোভিডের রোগীদের ওপর নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে ব্যবহার করা। ছয় সপ্তাহ পর দেখা যায়, এতে তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং শ্বাসকষ্টের কিছু উপসর্গ কমেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
একই সঙ্গে, যাদের আগে থেকেই স্বাস্থ্যগত জটিলতা আছে, তাদের জন্য গান গাওয়া পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে দলগত গান গাওয়ার সঙ্গে দ্রুত ভাইরাস ছড়ানো ঘটনার যোগসূত্র দেখা গিয়েছিল। এর কারণ, গান গাওয়ার সময় বাতাসে বিপুল পরিমাণ ভাইরাস ছড়াতে পারে।
ফিলিপ বলেন, "আপনার যদি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থাকে, তাহলে অন্যদের ঝুঁকিতে না ফেলতে সেই সপ্তাহে কোরাস অনুশীলনে না যাওয়াই ভালো"।
তবে গান গাওয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর উপকারটি হলো—মস্তিষ্কের ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধারে এর ভূমিকা।
বিষয়টি উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে–– ২০১১ সালের এক হত্যাচেষ্টায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেসওম্যান গ্যাব্রিয়েল গিফোর্ডসের কাহিনীর মাধ্যমে।
অনেক বছরের চেষ্টায় তিনি পুনরায় হাঁটা, কথা বলা, পড়া ও লেখা শিখেছেন। এই প্রক্রিয়ায় থেরাপিস্টরা তার শৈশবের গান ব্যবহার করেন, যাতে তিনি আবার কথা বলার সাবলীলতা ফিরে পান।
গবেষকেরা একই ধরনের পদ্ধতি স্ট্রোক থেকে বেঁচে ফেরা রোগীদের কথাবার্তা ফেরাতে ব্যবহার করেছেন।
কারণ গান গাওয়া মস্তিষ্কের দুই অর্ধের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘ সময়ের পুনরাবৃত্তি জোগায়— যা প্রায়শই তীব্র স্ট্রোকের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গান গাওয়া মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটিও বাড়ায় বলে মনে করা হয়, যা মস্তিষ্ককে নিজেকে পুনর্গঠন ও নতুন স্নায়বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম করে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
কিছু তত্ত্ব বলছে, গান গাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ে ভোগা মানুষদেরও সাহায্য করতে পারে, কারণ এতে মস্তিষ্কের ওপর তীব্র চাপ পড়ে—দীর্ঘ মনোযোগ প্রয়োজন হয় এবং শব্দ খোঁজার কাজ ও মৌখিক স্মৃতিকে উদ্দীপিত করে।
"বয়স্কদের ক্ষেত্রে গান গাওয়ার মানসিক উপকারিতা নিয়ে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা ধীরে ধীরে বাড়ছে," বলেন হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসাইকোলজি অধ্যাপক টেপ্পো সার্কামো।
"তবে আমরা এখনো খুব কম জানি গান আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়কে ধীর বা প্রতিরোধ করতে পারে কি না, কারণ এটি প্রমাণ করার জন্য বহু বছর ধরে বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন"।
স্ট্রিটের মতে, সব গবেষণা গান গাওয়ার শক্তিশালী প্রভাবের কথা বলে, হোক তা সামাজিক বা নিউরোকেমিক্যাল লেভেলে। এটি বুঝিয়ে দেয় গান কেন মানবজীবনের একটি সর্বজনীন অংশ হলো।
তবে তার একটি উদ্বেগ হলো—প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সংযোগের সময় বাড়ার কারণে গান গাওয়ার মতো পারস্পরিক কর্মকাণ্ডের সুবিধা তুলনামূলকভাবে খুব কম মানুষই পাচ্ছে।
তিনি বলেন, "বিশেষ করে মস্তিষ্কের আঘাত থেকে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আমরা অনেক কিছু আবিষ্কার করছি"।
"গবেষণাগুলো এখনই দেখাতে শুরু করেছে যে গুরুতর আঘাত থাকা মানুষদের ক্ষেত্রেও গান গাওয়া কার্যকর হতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ গান সবসময়ই সমাজকে একসূত্রে গাঁথতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে"।








