টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: ভারতের ক্রিকেট দলটির 'কাগুজে শক্তি' বড় টুর্নামেন্টে কেন কাজে লাগে না

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

ব্যাটিং লাইন আপের শক্তিমত্তা, বৈচিত্র্যময় স্পিন বোলিং এবং অভিজ্ঞতার দিক থেকে ভারত এবারের বিশ্বকাপে ফেভারিট দলগুলোর একটি।

টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়েও ভারত এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের এক নম্বর দল।

তবে পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকা স্বত্ত্বেও গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়েছিল ভারত।

এক বছরের মাথায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেই দুস্মৃতি কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ পেয়েছে 'টিম ইন্ডিয়া'।

ভারতের শক্তির জায়গা - ব্যাটিং

ভারত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপ নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে।

গত এক বছরে আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে যে দশজন ব্যাটসম্যান সর্বোচ্চ রান করেছেন, তাদের মধ্যে তিনজনই ভারতের- সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ, রোহিত শর্মা ও লোকেশ রাহুল।

ভারতের টপ অর্ডারে খেলবেন রোহিত-রাহুল এবং তিন নম্বরে ভিরাট কোহলি।

নিজেদের দিনে যেকোনও ম্যাচের হালচাল বদলে দিতে সক্ষম এই তিন ব্যাটসম্যান।

গত এক বছরে ভারতের টপ অর্ডারের স্ট্রাইক রেট

  • রোহিত শর্মা- ১৪৭ স্ট্রাইক
  • লোকেশ রাহুল- ১৩৮
  • ভিরাট কোহলি -১৩৯

এই তিনজন ভারতের ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু এনে দেয়ার চেষ্টায় থাকবেন।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এসব পরিসংখ্যান কাগুজে মনে হয়, যেমন ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারত সেমিফাইনালে হেরে গিয়েছিল, ২০২১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হারের পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ভারত, এরপর ২০২২ সালের এশিয়া কাপে ভারতের ক্রিকেট শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের কাছে হেরে ফাইনালেই উঠতে পারেনি।

চলতি বিশ্বকাপে যেসব ক্রিকেটারদের ওপর নজর রাখতে পারেন

'ভারত হারতে ভয় পায়' - নাসের হুসেইন, ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের অধীনে ২০১৩ সালের পর কোনও টুর্নামেন্টেই ভারত জেতেনি।

এতো এতো নামকরা ক্রিকেটার, এতো ভালো ব্যাটসম্যান, র‍্যাংকিংয়ের সেরা সব ক্রিকেটার থাকা স্বত্ত্বেও ভারতের এই ব্যর্থতার কারণ কী?

আইসিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'ভারত আসলে হারতে ভয় পায়'।

শক্তিমত্তা, দলটাকে ঘিরে নানা প্রশংসাবাক্য ভারতের ক্রিকেটারদের মনে গেঁথে যায় বলে মনে করেন তিনি।

কিন্তু তারা ভয়ডরহীন ক্রিকেটটা শেষ পর্যন্ত মাঠে খেলতে পারেন না।

ভারত 'অনেক বেশি' ক্রিকেট খেলে

ভারতের সাবেক কোচ রাভি শাস্ত্রি এটা বলেছিলেন ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পরে।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে এতো মাতামাতি হয় যে ধরেই নেয়া হয় ভারত ভালো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইপিএল ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ক্রিকেটাররা ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

গত বিশ্বকাপে ক্রিকেটারদের শারীরিক ভাষায় ও খেলায় ক্লান্তির ছাপ ছিল বলে মনে করেন রাভি শাস্ত্রি।

এখন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে দল বেড়েছে আরও দুটি, এতে করে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে।

রাভি শাস্ত্রি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "একটা স্পার্কের প্রয়োজন ছিল। যেটা দলে ছিল না।"

তবে নিজেদের খেলার ধরনেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন এই তিনজন।

রাহুল দ্রাবিড় কোচ হওয়ার আগে এই টপ থ্রি শুরুতে উইকেটে থিতু হওয়ার চেষ্টা করতেন, এখন তিনজনই মেরে খেলার অ্যাপ্রোচ নিয়ে ব্যাট করতে নামেন।

সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ ভারতের 'এক্স ফ্যাক্টর'

ক্রিকেট উপস্থাপক হারশা ভোগলে টুইটে লিখেছেন, সুরিয়া যখন ব্যাট করেন একটা বলও তিনি চোখ ফেরাতে পারেন না।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে দেয়া সাক্ষাৎকারে রিকি পন্টিং বলেছেন, সুরিয়া অনেকটাই এবি ডি ভিলিয়ার্স ঘরানার ব্যাটসম্যান, উইকেটের চারপাশেই হিট করতে পারেন তিনি।

সুরিয়া সময়ের সফলতম টি টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের একজন। নিজের সক্ষমতাকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তিনি, গত এক বছরে ৫৫টি ছক্কা মেরেছেন।

এই সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সুরিয়া। এক নম্বরে থাকা মোহাম্মদ রিজওয়ান ছক্কা মেরেছেন ৩৩ টি।

পার্থক্যটা এখানেই স্পষ্ট।

ছক্কা হাঁকাতে পছন্দ করেন সুরিয়াকুমার। তিনি প্রতি সাড়ে তিন বলে একটা বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টিতে।

এখন সুরিয়ার আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি রান ১০৪৫। মাত্র ৫৯১ বল খেলেই এই রান তুলেছেন তিনি।

ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামতে বেশ সময় লেগেছে মহারাষ্ট্রের এই ক্রিকেটারের, ৩১ বছর বয়সে প্রথম খেলতে নামেন তিনি ভারতের জার্সি গায়ে।

গত এক বছরে ৩২ ইনিংস ব্যাট করতে নেমে ৯টি ফিফটি ও ১টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন তিনি।

ভারতের ক্রিকেট নিয়ে আরও পড়ুন

অস্ট্রেলিয়ায় হার্দিক পান্ডিয়া বড় ভূমিকা রাখতে পারেন

পেস বোলিং অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া সময়ের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার।

২০১৮ সালে বেশ বড় একটা চোট পাওয়ার পর ক্যারিয়ার গ্রাফ নিম্নমুখী হয়েছিল এই ক্রিকেটারের।

কিন্তু তিনি ফিরে এসেছেন দাপট নিয়ে। এবারের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে অধিনায়ক ছিলেন গুজরাট লায়ন্সের, দলকে ব্যাট ও বল হাতে পারফর্ম করে টুর্নামেন্ট জিতিয়েছেন হার্দিক পান্ডিয়া।

তিনি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হবেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, বড় মাঠে বড় ছক্কা হাঁকাতে পারদর্শী তিনি, প্রমাণ দিয়েছেন এর আগেও।

চিন্তার জায়গা লোয়ার অর্ডার

ভারতের টিম ম্যানেজমেন্টের হাতে ভালো কিছু রিসোর্সফুল ক্রিকেটার আছেন বটে। কিন্তু কিছু প্রশ্নও রয়েছে।

যেমন ডিনেশ কার্তিক নাকি ঋষভ পান্ত?

এই দুজন ভারতের উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান কিন্তু টি টোয়েন্টিতে একাদশে জায়গা দেয়া এবং প্রতিপক্ষ ও উইকেট অনুযায়ী দলের সমন্বয় ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য।

রাভিন্দ্রা জাদেজার না থাকা আরও একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

রাভিন্দ্রা জাদেজা ভারতের সবচেয়ে ভালো অলরাউন্ডারদের একজন, যিনি অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে চোট পেয়েছেন এবং এশিয়া কাপ এরপর বিশ্বকাপের দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন।

একাধারে জাদেজা বুদ্ধিদীপ্ত বোলার, ব্যাট হাতে কার্যকরী এবং দারুণ ফিল্ডার।

তবে ভারতের সাবেক কোচ রাভি শাস্ত্রী মনে করেন, যারা নেই তাদের নিয়ে ভারতের বেশি না ভাবাই উচিত। তিনি বিশ্বাস করেন, আরও নতুন ম্যাচ উইনার বেড়িয়ে আসবে বড় আসরে খেলতে পারলে।

এখানে আকশার প্যাটেল ভালো অবদান রাখতে পারলে, অধিনায়ক রোহিত শর্মা খানিকটা নির্ভার হতে পারেন।

ডেথ ওভার বোলিং নিয়ে দুশ্চিন্তা

জাদেজার পর জসপ্রিত বুমরার চোট ভারতের বিশ্বকাপ শুরুর আগে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছিল।

ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ওয়াসিম জাফর মনে করেন, বুমরাহ এমন একজন বোলার যার কোনও রিপ্লেসমেন্ট নেই। এখন কেবলই ক্ষতি পোষানোর চেষ্টা করতে হবে।

বুমরা না থাকায় ভারত রিজার্ভ বোলার হিসেবে, মোহাম্মদ শামি, মোহাম্মদ সিরাজ ও শারদুল ঠাকুরকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে গিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ শামি চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন।

ভালো দল, অনেক অভিজ্ঞতা থাকা স্বত্ত্বেও- গত কয়েকটি আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতকে ঠিক সফল বলা যায় না, শুরুতেই বলছিলাম গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়েছিল ভারত।

সব মিলিয়ে মাঠে - অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যানের প্রতিফলন রাখতে চাইবে টিম ইন্ডিয়া।