আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: নাসিম শাহকে বলা হচ্ছে 'ব্র্যান্ড অফ পাকিস্তান'
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাসিম শাহ প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে নেমেই চমকে দিয়েছিলেন ভারতের ভিরাট কোহলিকে।
বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান নাসিম শাহ'র সুইং দেখে অবাক হয়েছেন, ক্রিজেই মাথা নাড়িয়ে ঈশারায় নাসিমকে বাহবা দিয়েছেন।
মাস দুয়েক আগে প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা নাসিম এখন চমকে দিচ্ছেন পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে।
জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোর লেখক শশাঙ্ক কিশোর লিখেছেন, 'সামনের দিনগুলোতে ক্রিকেটকে শাসন করার মত একজন ক্রিকেটার।'
এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচে মাঠে নেমে যেন তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি একজন বোলার।
নাসিম শাহ'র তুলনা হচ্ছিল তখন পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন জাভেদ মিয়াদাঁদের সাথে।
পাকিস্তানের সাবেক তারকা ক্রিকেটার শোয়েব আখতার নিজের বিশ্লেষণে বলেছেন, "নাসিম শাহ - ফিট থাকলে তুমি হবে ব্র্যান্ড অফ পাকিস্তান।"
পাকিস্তানের বর্তমান অধিনায়ক বাবর আজম ম্যাচের পর প্রেজেন্টেশনে নিজেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, শারজাহতে ভারতের বিপক্ষে ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানের মিয়াদাঁদ শেষ বলে ছক্কা মেরে জিতিয়েছিলেন, পাকিস্তান সেবার এক উইকেটে জয় তুলেছিল। তখন বাবর আজমেরই জন্ম হয়নি। উনিশ বছর বয়সী নাসিম শাহ তো দূরের কথা।
এবারও এশিয়া কাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান এক উইকেটের জয় তুলে নিয়েছিল। এবারের নায়ক নাসিম শাহ।
বাবর আজম যখন ১৯৮৬ সালের ম্যাচটির কথা বলছিলেন, রাভি শাস্ত্রী ছিলেন উপস্থাপক, তিনি যোগ করেন, "মনে করিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আমিও ছিলাম সেই ম্যাচে।"
শাদাব খানও টুইটে লিখেছেন, "জাভেদ ভাই ও শাহীদ ভাইয়ের ছক্কার কথা মনে পড়ছে নাসিমের ছক্কা দেখে।"
শহীদ আফ্রিদি ভারতের বিপক্ষে ২০১৪ সালে এশিয়া কাপেই দুই ছক্কা মেরে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন।
এমনই কালজয়ী এক ম্যাচের স্মৃতি শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফিরিয়ে এনেছিলেন নাসিম শাহ।
নাসিম শাহ ম্যাচের পরে টেলিভিশন ক্যামেরায় বলেছিলেন, আমার বিশ্বাস ছিল আমি ছক্কা মারতে পারি। আমি এগুলো অনুশীলন করি। আমি জানতাম তারা ইয়র্কার মারবে, আমি কেবল চেষ্টা করেছি আর হয়ে গেছে। আমার মনে হচ্ছিল আমার ব্যাটে সমস্যা আছে, আমি সেটা বদলে নেই।"
নাসিম শাহ ছিলেন দলের শেষ ব্যাটসম্যান। তিনি বলেন, "সবাই ভুলেই গেছেন আমি বোলার"।
মজার কথা হচ্ছে নাসিমের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এই ম্যাচের আগে রানের খাতায় ছিল ০ (শূন্য)।
এই চার বলে ১৪ রানের ইনিংসটি তার আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের একমাত্র পুঁজি।
ম্যাচের পরে পাকিস্তানের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ ইউসুফ নিজের ফেরিফাইড টুইটার পাতায় নাসিম শাহ'র ছক্কা মারার অনুশীলনের ভিডিও পোস্ট করেন।
নাসিম শাহ মূলত শুরু করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, মাত্র ১৬ বছর বয়সী নাসিম তখন তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন গতি দিয়ে।
এবার আবারও পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, নাসিম শাহ এবারে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন।
কিছুদিন আগেও পাকিস্তানের মূল পেস বোলার ছিলেন শাহীন শাহ আফ্রিদি, নাসিম তার জায়গা নিয়ে নিচ্ছেন ধীরে ধীরে।
নাসিম শাহ একজন বোলার, স্বভাবজাত পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার যিনি নিয়মিত ১৪০ এর ওপর গতিতে বল ছুঁড়তে পারেন।
নাসিম শাহ এর আগেও গতির ঝড় তুলেছেন, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কায়।
কিন্তু এবার তিনি জানান দিলেন, এখানে তিনি দীর্ঘসময় থাকতে এসেছেন এবং জিততে এসেছেন।
প্রথম ম্যাচেই নাসিম শাহ ভারতের তারকা ব্যাটসম্যান লোকেশ রাহুলকে বোল্ড করেন, সেটি ছিল এই টুর্নামেন্টে রাহুলের মুখোমুখি হওয়া প্রথম বল।
রোহিত শর্মা, ভিরাট কোহলিরা নাসিমের বল খেলতেই পারেননি ঠিকঠাক।
আঠারোতম ওভারে তিনি যখন আবারও বল করতে এসেছিলেন সেদিন, নাসিম খোঁড়াচ্ছিলেন। একেকটি বল করে তিনি রানিং মার্কে ফিরে যাচ্ছিলেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে, কিন্তু পরের বলটি আবারও একই ক্ষিপ্রতায় করে গেছেন।
এটা নাসিমের মানসিকতার প্রমাণ দেয়।
এই কদিনের মাথায় নাসিম শাহ'র জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অভিষেক, মাংসপেশিতে টান নিয়ে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিং, হংকংয়ের বিপক্ষে ৭ রান দিয়ে ২ উইকেট, এবারে দুই ছক্কা হাকিয়ে দলকে ফাইনালে তুলে জাভেদ মিয়ান্দাদের সাথে তুলনা।
এখন নাসিম শাহ বলতেই পারেন, তিনি জীবনে অনেককিছুই দেখে ফেলেছেন।
নাসিম শাহ'র বয়স এখন মাত্র ১৯।
এবারের এশিয়া কাপে ১৬ দশমিক ৩৩ গড়ে ছয়টি উইকেট নিয়েছেন তিনি।
এই মঞ্চে এসেছেন একটা কঠিন পথ পেরিয়ে
ষোল বছর বয়সী নাসিম ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়, মাঠে নামার আগের সপ্তাহে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল।
শোক কাটিয়ে মাঠে নেমেছিলেন বটে কিন্তু নাসিমের জীবনে একের পর এক ইনজুরির ধাক্কা আসতে লাগলো।
কাঁধের চোট, মাংসপেশির টান একের পর এক ইনজুরি। নাসিম মাঠের চেয়েও হাসপাতালে বেশি সময় কাটিয়েছেন এই সময়টায়।
পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার মুদাসসার নজর ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, "২০১৮ সালে প্রথম নাসিমের বোলিং দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।"
লাহোরের জাতীয় ক্রিকেট একাডেমিতে নাসিমের বোলিং দেখে তাকে দলে নেয়া হয়েছিল।
মুদাসসার নজর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ডিরেক্টর অফ একাডেমি ছিলেন তখন।
তিনি বলেন, "খেলার জন্য অনেকেই উদগ্রীব থাকে। নাসিম ছিল পাগল। লাহোরের একাডেমি মাঠ থেকে নাসিমের চাচার বাড়ির দূরত্ব অনেক। প্রতিদিন দুইবেলা সেখান থেকে সাইকেলে করে আসতো আর যেতো নাসিম"।
ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে মুদাসসার নজর আরও বলেন, "২০১৭ সালে একটা চোট পেয়েছিলেন নাসিম। তার ছয় থেকে সাত মাসের পুনর্বাসন ছিল। দীর্ঘ সময়, হতাশা কাজ করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাসিম ছিল শান্ত। সে মাঠে আসতো আর বলতো, 'স্যার আমি খেলতে চাই'। কোচরা তার সাথে কথা বলে বোঝাতো যে এখন নিজের খেয়াল রাখা প্রয়োজন।"
এই একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও খেলার প্রতি নিবেদন নাসিম শাহকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে।
ব্রিজবেনে টেস্ট অভিষেক, মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও থেকে যাওয়া, টেস্ট খেলা, বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট হ্যাটট্রিক করা, আর এবারে আরও বড় মঞ্চে আরও চাপের মুখে নিজেকে প্রমাণ করা - নাসিম প্রমাণ করছেন তিনি ক্রিকেট বিশ্বে ভালো একটা জায়গা করে নিতেই এসেছেন।