ভোটের আগেই বিতর্কে পোস্টাল ব্যালট, ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে যা বলছে নির্বাচন কমিশন

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

একটি ঘরে কয়েকজন মিলে অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুণছেন; একটি খামে ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ আছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনের নাম। এই ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে একটি ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, "আপনারা এখান থেকে যেগুলা আছে, সব লইয়া যানগা। আমরার দরকার নাই। ভিডিও কইরেন না। ফেসবুকে ছাড়িয়েন না"।

এছাড়া "একাধিকজন ভিডিও করলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে যাবে। তখন ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে। বাহরাইনে প্রবাসীদের দেওয়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট বন্ধ হয়ে যেতে পারে," এমন বক্তব্যও শোনা যায় আরেকজনের কণ্ঠে।

অভিযোগ উঠেছে, বাহরাইনে জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার বাসা থেকেই পোস্টাল ব্যালটগুলো পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনের আগে প্রবাসী ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং কারসাজির চেষ্টা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ।

বাহরাইনের একাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোস্টাল ব্যালট পেতে কেবল বাহরাইন নয়, গোটা গাল্ফ বা উপসাগরীয় এলাকার প্রবাসী ভোটারদের সহায়তা করছে বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপ।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ভিডিওর যে ক্লিপগুলো সামাজিক মাধ্যমে এসেছে সেগুলো মূলত বাইরাইনের হিদ এলাকার।

ভিডিওটি জামায়াত নেতার বাড়িতে করা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে এমন দাবি করা হলেও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ।

এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলছেন, "প্রবাসী ভোটাররা একটা ব্যালট পেয়েছেন এই আনন্দটুকু ধরে রাখার জন্য কেউ ভিডিওটা করে এটাকে পোস্ট করেছেন। তবে এটি করা উচিত হয়নি," বলেও মন্তব্য তার।

এই ঘটনাকে 'ভয়াবহ' বলে উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ। তিনি বলছেন, এমন ঘটনা নির্বাচনের ওপর মানুষের আস্থা আরও কমাবে।

"যেই এই ঘটনার সাথে যুক্ত থাকুক না কেন কমিশনের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা," বলেন তিনি।

এদিকে, পোস্টাল ব্যালটে নিজেদের প্রতীকের অবস্থান নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। বাহরাইনের ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে দলটি।

তবে নির্বাচন কমিশন একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, "এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্তৃক কোনো খামই খোলা হয়নি এবং তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়নি"।

ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা জানা যাচ্ছে

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া প্রায় আট মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি পোস্টাল ব্যালট গুনছেন এবং পাশ থেকে কেউ এর ভিডিও ধারণ করছেন।

এসময় ভিডিও করতে নিষেধ করতেও শোনা যায় একজনকে। বাধা দিয়ে বলছেন, "এই দাঁড়ান, আপনি ভিডিও করছেন কিসের জন্য? এখানে উনারা মেইন ভিডিও করছেন। কেন আপনারা আরও ভিডিও করছেন?"

এই ঘটনার ২৭ সেকেন্ডের আরও একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনতে দেখা যায়।

নিজেকে জামায়াতের বাহরাইন শাখার নেতা পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন নামে একজন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, কেবল বাহরাইন নয়, গাল্ফভুক্ত সব দেশেই ভোটারদের সহায়তা করছেন তারা।

তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের বেশিরভাগই শ্রমিক হওয়ায় তাদের নির্দিষ্ট ঠিকানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে, যারা শ্রমিক ক্যাম্পগুলোতে থাকেন, তাদের বেশিরভাগেরই নিজস্ব কোনো পোস্টাল ঠিকানা নেই।

"পোস্টাল ভোটের জন্য রেজিস্ট্রেশনের সময় অনেকেই নিকটস্থ দোকান অথবা ভবন যেখানে মানুষজন সব সময় থাকে এমন একটা অ্যাড্রেস দিয়েছেন। এতে করে এক একটি ঠিকানায় কয়েকশ করে ব্যালট এসেছে," বলেন মি.আবেদিন।

এখানে ভোট জালিয়াতি কিংবা ভোটারদের প্রভাবিত করার কোনো উদ্দেশ্য নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।

মি. আবেদিন বলছেন, বাইরাইনের ওই এলাকায় থাকা বিএনপির কিছু সমর্থক উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই ভিডিও করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও দাবি তার।

এছাড়া বাহরাইনের পোস্টাল বিভাগের ওপরও দায় দিয়েছেন এই জামায়াত নেতা।

তিনি বলছেন, "বাহরাইনের পোস্টাল বিভাগের কর্মী যখন দেখেছেন একই ঠিকানায় বাল্ক অ্যামাউন্টে (বড় সংখ্যক) আছে এবং সবাই বাংলাদেশি, মোস্ট প্রবাবলি (খুব সম্ভবত) তার কাজ কমানোর জন্য একই জায়গায় ডাম্পিং করছে।"

যদিও বাহরাইনে জামায়াতের কোনো কমিটি নেই বলে দাবি করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ।

তিনি বলছেন, "পোস্টাল ব্যালটের ওই ভিডিওর সাথে জামায়াতের কোনো সংযোগ নেই, এটি অপপ্রচার।"

উল্লেখ্য বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশের আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক সংগঠন করার সুযোগ নেই। এ কারণে সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা নেতা হলেও তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রাকাশ্যে আনেন না।

ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে

নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানায় ব্যালট পাঠানো হয়।

এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, ইউনিভার্সেল পোস্টাল ইউনিয়নে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটগুলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে পাঠাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে অনলাইন নিবন্ধনের পর প্রবাসী ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠানো শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন 'পোস্টাল ভোট বিডি' অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন। যার মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় আট লাখ।

এখন পর্যন্ত ৭৫টি দেশে অবস্থানরত পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ৬৮৯ জন প্রবাসী ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

এক্ষেত্রে একই ঠিকানায় কয়েকশ ব্যালট কিংবা ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম বলছেন, প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন প্রবাসী ভোটাররা। শুরুতেই এমন ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

"এর মাধ্যমে মানুষ ভোট দিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, অনেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট নাও দিতে পারে," বলেন তিনি।

এক্ষেত্রে ভুল কোথায় হচ্ছে সেটি খুঁজে তার বিরুদ্ধে কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন এই নির্বাচন বিশ্লেষক।

"ব্যালট যেহেতু চলে গেছে, এখন ফেরত আসার সময় এরকম সমস্যা যেন না হয়" সেটি নিশ্চিত করার কথাও বলছেন তিনি।

পোস্টাল ব্যালটে জাল ভোট দেওয়া সম্ভব কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. আলিম বলছেন, "জালায়াতি ঠেকাতে এখানে কিছু ম্যাকানিজম আছে, তবে এখন যেহেতু জালিয়াতির যুগ হয়তো এটাকেও ম্যানিপুলেট করে কেউ কেউ করে ফেলতে পারলো।"

এই ঘটনাকে 'ভয়াবহ' বলেই উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ। নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

মি. আহমেদ বলছেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা কমিশনের জন্য ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা খুবই জরুরি। এই ধরনের ঘটনা ভোটের প্রতি মানুষের সন্দেহ তৈরি করতে পারে।"

নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলছে, পোস্টাল সিস্টেমে জটিলতার কারণেই বাহরাইনের ঘটনাটি ঘটেছে।

ঘটনাটি নিয়ে কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলছেন, "বাহরাইনের ক্ষেত্রে ১৬০টি ব্যালট একটি ডেলিভারি পয়েন্টে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে প্রবাসী ভাইয়েরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। আমার পাশে থাকে আমি ওরটা পৌঁছে দিচ্ছি ব্যাপারটা এরকম।"

এছাড়া বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং বাহরাইন পোস্ট বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলেও জানান তিনি।

পরে নির্বাচন কমিশন বা ইসি থেকে এ বিষয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাহরাইনে পোস্টাল ব্যালট-সম্পর্কিত একটি ভিডিও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে।

এ বিষয়ে বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রের বরাত নিয়ে ইসি জানায়, "১১ই জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ বাহরাইন প্রবাসী কয়েকজন ভোটার কর্মস্থলে থাকাকালীন বাহরাইন পোস্ট কর্তৃক ব্যালট খাম বিতরণের জন্য যোগাযোগ করা হলে তারা একই এলাকায় বসবাসকারী সহকর্মীর কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করেন। পরে পোস্টম্যান ওই ব্যক্তির কাছে একই এলাকায় বসবাসরত ১৬০টি ব্যালট খাম বিতরণের জন্য হস্তান্তর করেন"।

"পরবর্তী সময় ভোটারদের নিকট হস্তান্তরের জন্য বাছাইকালে উক্ত ভিডিওটি ধারণ করা হয়"।

পরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ১২৯টি খামসহ দূতাবাসে হাজির হন এবং বিতরণের জন্য সহযোগিতা চান বলেও জানায় ইসি।

নির্বাচন কমিশন দাবি করছে, এ ঘটনায় তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়নি। পাশাপাশি একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সব দূতাবাসকে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিএনপির আপত্তি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পোস্টাল ব্যালটে নিজেদের প্রতীক ধানের শীষের অবস্থান নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিএনপি।

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে এ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের বিষয়টি জানিয়েছে দলটি।

বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে কিছু রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক প্রথম লাইনে রাখা হলেও বিএনপির প্রতীক মাঝামাঝি রাখা হয়েছে।

মি. খান বলেন, "কাগজ ভাঁজ করলে মাঝখানের প্রতীকে চোখ নাও পড়তে পারে। এটা ঘটনাক্রম নয়, উদ্দেশ্যমূলক বলেই মনে হয়েছে"।

এখনো যেসব দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়নি, সেগুলো যেন সংশোধন করে পাঠানো হয়, সেই দাবিও ইসিকে জানিয়েছে বিএনপি।

পাশাপাশি বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে ভিডিও ছড়িয়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে দলটি।

মি. ইসলাম বলেন, 'আমরা বলেছি, যারা ব্যালট নিয়ে কারচুপির চেষ্টা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ইসি আগেই বলেছিল, এ ধরনের কাজে জড়িত ব্যক্তিদের এনআইডি পর্যন্ত ব্লক করে দেবে"।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন নিবন্ধন করেছেন।

এছাড়া মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজার ২৯২ জন, কাতারে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন, ওমানে ৫৬ হাজার ২০৭ জন এবং বাহরাইনে নিবন্ধিত হয়েছেন ১৯ হাজার ৭১৯ জন ভোটার।