বিএনপি জোটে অবিশ্বাস, জামায়াতের জোটে 'বিভক্তি'

    • Author, তাফসীর বাবু
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে দুটি জোট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

একটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি। মূলত: অতীতে দলটির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলোসহ বিভিন্ন দলকে নিয়ে আসন সমঝোতার এই জোট হয়েছে।

অন্য নির্বাচনী জোটে আছে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং এনসিপিসহ এগারটি দল।

বলা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে মূল লড়াই হবে মূলত: এই দুটি জোটের মধ্যে। ইতোমধ্যেই বিএনপি এবং জামায়াত তাদের জোটে থাকা দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা করছে।

তবে এই আসন সমঝোতা করতে গিয়েই দেখা যাচ্ছে, দুটি জোটের ভেতরেই একধরনের বিভক্তি, সংশয়, অবিশ্বাস ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হয়েছে।

কোন দল কত আসন পাবে, কোন আসন কাকে দেয়া হবে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে তৃণমূল নেতাদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠা -এমন সংকট সামনে চলে এসেছে।

জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে আসন ভাগাভাগি নিয়ে।

আর বিএনপি জোটে বড় হয়ে উঠেছে, জোটের প্রার্থীকে ছেড়ে দেয়া আসনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাওয়া।

একই আসন নিয়ে টানাটানি ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের

বরিশাল সদরের চরমোনাই ইউনিয়ন। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র এখানে। চরমোনাই ইউনিয়নটি পড়েছে বরিশাল সদরের মধ্যে। এই আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।

আবার এই একই আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।

একই জোটে থাকা দুই দলের কেউই আসনটি ছাড়তে চাননা। ফলে দুই প্রার্থী নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে দল দুটির মধ্যে।

বিশেষকরে যেখানে চরমোনাই পীরের মূল কেন্দ্র সেখানে জামায়াতের প্রার্থী দেয়াকে ভালোভাবে নেয়নি ইসলামী আন্দোলন।

"আমরা তো জামায়াত আমীর ডা. শফিক সাহেবের আসনে প্রার্থী দেই নাই। সেখানে আমাদের এখানে তাদের প্রার্থী দেয়াটা অসুন্দর হয়েছে। এই এলাকায় আমাদের ভিত্তি। এখানে কি জোটের কেউ নির্বাচন করবে এটা সম্ভব? এটা কি হওয়া উচিত?"

বলেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর ও বরিশাল ৫ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।

আরো পড়তে পারেন

তবে আসনটিকে ঘিরে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের মধ্যে একধরনের দূরত্ব তৈরি হলেও জামায়াত আসনটি ছাড়তে রাজি নয়।

এর পেছনে জামায়াতের যুক্তি হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বরিশাল- ৫ আসনের সঙ্গে বরিশাল- ৬ আসনেও প্রার্থী হয়েছেন।

একই ব্যক্তিকে দুটি আসনে মনোনয়ন না দিয়ে যেকোনো একটি আসন বিশেষত: বরিশাল- ৬ আসনটি নিতে বলছে জামায়াত।

"তিনি (সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম) দুটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন। আমরা বলেছি আপনারা একটি নেন। সে হিসেবে বরিশাল- ৬ আসনটি নিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু তিনি দুটি আসনেই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এখন একজন ব্যক্তির দুটি আসনে নির্বাচন করা, এটা তো জামায়াতে ইসলামীর আমীর সাহেবও করছেন না। আমরা আশাকরি এটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে।"

বলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।

'বিএনপির নব্বই শতাংশ লোক বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে'

বরিশালে ইসলামী আন্দোলন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যখন টানাপোড়েন তখন স্বস্তি নেই রাজনীতিতে জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও। উদাহারণ হিসেবে বলা যায় বরিশালেরই পাশের জেলা পটুয়াখালির কথা।

জেলাটির গলাচিপা এবং দশমিনা নিয়ে গঠিত পুটয়াখালি-৩ আসনে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নেই। এখানে দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে শরীক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে।

কিন্তু জোটের মনোনয়ন পেলেও এলাকায় 'বিএনপির সমর্থন পাচ্ছেন না' নুরুল হক নুর।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, এলাকায় বিএনপির যে নেতা-কর্মী আছে, 'তাদের নব্বই শতাংশই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন'।

আসনটিতে বিএনপির সেই বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান মামুন। সম্প্রতি অবশ্য তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়।

মি. মামুন দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্রভাবেই নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। সরেজমিনে গলাচিপা এলাকায় হাসান মামুনের একটি ঘরোয়া বৈঠকে দেখা যায়, সেখানে মূলত: বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরাই উপস্থিত হয়েছেন।

উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের পদধারী নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এসব কমিটির অধিকাংশই হাসান মামুনের তত্ত্বাবধায়নে গঠিত হওয়ায় নেতা-কর্মীরা সরাসরি তার পক্ষেই কাজ করছেন।

জানতে চাইলে হাসান মামুন বলেন, তার ভাষায়, বিএনপিকে বাঁচাতেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।

"রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণে যখন ভুল হয়, তখন জনগণের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে। এই আসনটি যখন জোটকে দিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে সেন্টিমেন্ট জাগ্রত হয়েছে যে এখানে বিএনপির প্রার্থী থাকা উচিত। এখানে বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন, কারণ তারা জানে, এই সিট যদি আমরা গণঅধিকারকে ছেড়ে দেই তাহলে আগামী ত্রিশ বছরেও এই সিট আর বিএনপি পাবে না।"

হাসান মামুন বিএনপির না হয়েও যেন বিএনপিরই প্রার্থী। কারণ স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মূলত: তার পক্ষেই কাজ করছেন। ফলে জোটের প্রার্থী হলেও আসনটিতে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মধ্যে।

একইসঙ্গে শরিকদের অন্য আসনগুলোতেও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেটা পুরো জোটের মধ্যেই 'একধরনের অবিশ্বাস' তৈরি করেছে।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের প্রত্যাশা ছিলো একটা ভারসাম্যপূর্ণ সংসদের জন্য বিএনপি চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি আসন মিত্রদেরকে ছেড়ে দিতে পারে। যেহেতু খুব অল্প সংখ্যক আসন ছেড়েছে, ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যেও একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, এটা ছাইড়া লাভ কি! এটাও আমরা নিয়ে নেই। কারণ এটা শুধু আমার বেলায় নয়, অন্য মিত্রদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।"

সমাধানের আশায় বিএনপি, জামায়াত জোটে মিশ্র অবস্থা

বিএনপি এখনো পর্যন্ত শরীকদের জন্য আসন ছেড়েছে বারটি। এই বারটিসহ আরও যেসব আসন নিয়ে আলোচনা চলছে এর সবগুলোতেই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেটা জোটের শরীকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।

যদিও বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেককেই বিএনপি বহিস্কার করেছে। তবে এতেই সন্তুষ্ট নয় শরীক দলগুলো। কারণ রাজনীতিতে অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দল থেকে বহিস্কার হলেও পরে বহিস্কৃতদের আবার দলে ফেরতও নেয়া হয়। বিশেষকরে নির্বাচনে জিতে গেলে দলে ফিরতে সময় লাগে না।

আর এই কারণেই জোট শরীকদের সন্দেহ এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরানো না হলে ভোটের মাঠে জেতা কঠিন হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাশে পাওয়া যাবে না।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী যেন না থাকে, সে বিষয়ে চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, "যারা দাঁড়িয়ে গেছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কিন্তু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন এটাকে সন্দেহ করলে সেটা করাই যায়। শরীক দলগুলো কিন্তু ভালো করেই জানে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পর্যন্ত তাদের (বিদ্রোহীদের) সঙ্গে কথা বলেছেন। এখন শুনছে না। সময় তো এখনো শেষ হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে।"

বিএনপি তাদের ভাষায়, সমাধানের চেষ্টা করছে।

কিন্তু এর প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াতসহ এগার দলের যে জোট, সেখানে এখনো পর্যন্ত আসন সমঝোতাই শেষ হয়নি।

ফলে জামায়াতের এই জোটের মধ্যে তৈরি হয়েছে একধরনের অস্থিরতা।

যার মূল কেন্দ্রে আছে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত।

দল দুটো প্রায় পৌনে তিনশত আসনে প্রার্থী মনোনয়নও জমা দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জোটের ভবিষ্যত নিয়ে।

ইসলামী আন্দোলন অন্তত: একশত আসন বা এর কিছু কমবেশি হতে পারে, এমন সংখ্যক আসন ছাড়া জোটের আসন বণ্টনে যাওয়াকে 'সম্মানজনক' মনে করছে না।

"একশত আসন কিংবা এর উপরে বা এর আশেপাশে -এরকম হলে আমি মনে করি বণ্টনটা আমাদের জন্য সম্মানসূচক হয়।" বলেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।

কিন্তু চূড়ান্ত সমঝোতায় যদি একশত আসনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন কম দেয়া হয় তাহলে কি জোট থাকবে- এমন প্রশ্নে মি. করীম পাল্টা প্রশ্ন করেন, "সেটা (একশত আসন দেয়া) হবে না কেন? না হওয়ার যুক্তি কী? যদি কারো জন্য এটা না হয়, তাহলে সে দায়-দায়িত্ব তাকেই গ্রহন করতে হবে।"

এটা স্পষ্ট যে, জামায়াতসহ এগার দলীয় জোটের আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা না কাটলে সেটা জোট ভাঙার দিকেও গড়াতে পারে।

এর বিপরীত পক্ষে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভাঙন নিয়ে আশঙ্কা না থাকলেও শরীকদের মধ্যে বিএনপির তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

সবমিলিয়ে দুটি রাজনৈতিক জোট ভেতর থেকে যে সংশয় আর অবিশ্বাসের মুখোমুখি তার সমাধান কীভাবে হয়, তার উপরই নির্ভর করছে নির্বাচনের আগে জোট দুটির ভবিষ্যত।