আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জামায়াতকে ঘিরেই অসন্তোষ ১১ দলীয় জোটে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে দ্বন্দ্ব জটিল আকার ধারণ করেছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
গত বছরের শেষ দিকে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছিল, এমন সময় জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তুলেছিল তারা।
পরে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বিষয়টি একরকম চূড়ান্ত হয়ে গেলে এই দলগুলো আসন সমঝোতার পথে হাঁটে। তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ আরো কয়েকটি দল তাদের সঙ্গে যোগ দিলে ১১ দলীয় জোটের বিষয়টি সামনে আসে।
তবে নির্বাচনের আগে এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকলেও এখনো এই ১১ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং, জোট ভেঙে একটি দলের বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়েছে।
বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় একটি সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বেলা তিনটায় সেই সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার কথা জানানো হয়।
১১ দলীয় জোটের পক্ষে সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পরিষদের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এক খুদে বার্তায় জানান, অনিবার্য কারণবশত পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।
ফলে এই জোটের ভেতরে যে অস্থিরতা চলছে তার আঁচ পাওয়া যায়।
"আসন সমঝোতা নিয়ে দুই-একটা সমস্যা হয়েছে। সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হবে," বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে বলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
তবে, এরই মধ্যে আসন সমঝোতায় অসন্তুষ্ট চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন ওই সংবাদ সম্মেলনে থাকবে না বলে সকালে খবর পাওয়া গিয়েছিলো। বিকেলে পৃথক আরেকটি সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার খবরও শোনা গিয়েছিলো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ তা নিশ্চিত করেন।
"ইসলামী আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি। কিন্তু বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে না থাকার কথা ফোনে জানিয়েছিলো," বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ'র মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান দলটির দুপুরের জরুরি বৈঠক শেষ হওয়ার পর এক বিবৃতিতে বলা হয়, "ইসলামপন্থির একবক্স নীতি বহাল রাখতে আলোচনা চলমান"।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
জোটের কোন দলের কত আসন?
বাংলাদেশে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সারা দেশে ৩০০ আসনে তিন হাজার ৪০৬টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।
এসব মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০শে জানুয়ারি। সেই হিসেবে এই জোটের হাতে সময় অল্প, আছে মাত্র আর ছয়দিন।
সমঝোতার আলোচনা চলার সময়েই জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৭২টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা তিনটি, খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ছয়টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা বিডিপি দুইটি আসনে নিজেদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।
সমঝোতা হয়ে গেলে এসব আসনে জোটের একজন প্রার্থী রেখে অন্য সবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও নেন জোট নেতারা।
একপর্যায়ে জোট নেতারা যৌক্তিকভাবে কিছু ছাড় দেওয়ার ক্রাইটেরিয়াও নির্ধারণ করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান এ বিষয়ে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন।
সে সময় তিনি বলেছিলেন, "ক্রাইটেরিয়া হলো দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সবাই ছাড় দেবে এটা একটা বিষয়। আর যেখানে যার অবস্থা ভালো সেখানে তাকে ছাড় দেওয়া যাবে এটা আরেকটা বিষয়। তবে সংখ্যাটা এখনো বলার মতো না, বলা যাবে না এটা।"
আসন সংখ্যা নিয়ে প্রথম থেকেই জোটের সবচেয়ে বড় দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে ইসলামী আন্দোলনের মনোমালিন্য শুরু হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের কয়েকজন নেতা জানান, ৩০০ আসনের মধ্যে নিজেদের জন্য জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ২১০ আসন রাখার সিদ্ধান্তে জোট শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায়।
এছাড়া বাকি আসনগুলো জোটের অন্য শরীক দলগুলোর মধ্যে বন্টনের আলোচনা এগোয়।
এরই মধ্যে জানুয়ারির এই দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষেও দফায় দফায় বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনকে তাদের দাবি অনুযায়ী আসন দিতে রাজি হয়নি জামায়াতে ইসলামী।
প্রথম পর্যায়ে ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫টি আসন দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও পরে আরো পাঁচটি আসন বাড়িয়ে দেওয়ার কথা শোনা যায়। এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৩টি আসনে ছাড় দেওয়ার আলোচনা হয় বলেও শোনা যাচ্ছিলো।
এছাড়া খেলাফত মজলিসকে পাঁচটি, এলডিপিকে পাঁচটি, এবি পার্টিকে তিনটি আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে বলেও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান কী?
চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর কয়েকটি সূত্র বলছে, দাবি অনুযায়ী কমপক্ষে একশো আসন না পাওয়ায় অসন্তুষ্টি, ক্ষোভ দলটির তৃণমূল পর্যায়েও ছড়িয়েছে। জোটের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাত্র ৪০ আসনে নির্বাচন করতে নাখোশ দলটির নেতা-কর্মীরা।
যদিও একপর্যায়ে দলটি অন্তত ৫০টি আসন চেয়েছিলো, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তাতে সম্মত হয়নি।
মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার রামপুরায় একটি মাদ্রাসায় এক বৈঠকে দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের বৈঠকে নেতা-কর্মীরা অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরেছেন বলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া জোটের অন্যান্য দলের ক্ষেত্রেও জামায়াতে ইসলামী এককভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে ইসলামী আন্দোলন নাখোশ। ফলে দলটি আসন সমঝোতা করবে নাকি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ২৭২টি আসনেই লড়বে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়।
ইসলামী আন্দোলনের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম মজলিসে আমেলার বৈঠকে সাধারণত এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দলটির আমির চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়।
১১ দলীয় এই জোটের শরিক দুইটি দলের নেতারা জানান, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে গত কয়েক দিনে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক বৈঠক হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকেই এই ১১ দলীয় জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়া এবং সংবাদ সম্মেলনসহ নানা খবর শোনা যাচ্ছিলো। সকাল থেকে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।
দুপুরে নিজেদের মধ্যে জরুরি একটি বৈঠকও করে দলটি। এ বিষয়ে জানতে ফোন করলে দুপুরেও ফোন রিসিভ করেননি মি. রহমান। তবে, পরে বিকেলে একটি সংবাদ বিবৃতি দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামপন্থার একবক্স নীতি বহাল রাখতে আলোচনা চলমান রয়েছে।
দুপুরের জরুরি বৈঠকের কথাও এই বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে দলটি।
এতে বলা হয়েছে, "জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে পীর সাহেব চরমোনাই ইসলামপন্থীদের একবক্স নীতির ঘোষণা করেন। সেই নীতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখনো অটল থেকে কাজ করে যাচ্ছে"।
আলোচনা চলছে এবং দ্রুতই একবক্স নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার হবে বলেও এতে বলা হয়।
যে প্রেক্ষাপটে ১১ দলীয় জোট
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে গত বছরের এপ্রিলে একটি মোর্চা গঠন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মতো ইসলামভিত্তিক দলগুলো।
মূলত ইসলামভিত্তিক দলগুলোর ভোট এক ছাতার নিচে আনার প্রয়াসেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে জামায়াতে ইসলামীও এতে যোগ দেয়।
এরপরে জাগপা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি যোগ দিলে আট দলীয় জোট হিসেবে বিভিন্ন সময় যুগপৎ কর্মসূচিতে এসব দলকে রাজনীতির মাঠে সরব হতে দেখা গেছে।
এরই মধ্যে অভ্যুত্থানের পরে তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি, এলডিপিসহ আরো একটি দলের এই জোটে অংশ নেওয়ার পর ভোটের রাজনীতি নিয়ে আবারো আলোচনা - সমালোচনা দেখা দেয়।
গত ২৮ শে ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির জোটে যোগদানের খবর জানায়।
জামায়াতে ইসলামী যাদের কি না একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে, তাদের সাথে গণঅভ্যুত্থানের তরুণ ও ছাত্রদের এই দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ায় দলটির মাঝেই ক্ষোভ দেখা দেয়। দলের কয়েকজন আলোচিত নারী নেত্রী পদত্যাগ করার মধ্য দিয়ে সবার কাছে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়।
দল ছাড়ার পর এরই মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা - ৯ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন তাসনিম জারা।
আকাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় আসন না পাওয়ায় ১১ দলীয় এই জোটের পুরাতন সঙ্গী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলের অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি জোটের প্রার্থীদের আসন দিতে গিয়ে বিভিন্ন আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরও মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নেতারা অসন্তোষের বিষয়টি গত পাঁচই জানুয়ারি বিবিসি বাংলার কাছে স্বীকারও করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সেদিন বলেছিলেন, সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। তবে সম্মানজনক মর্যাদায় সবাই একসাথে কাজ করছেন।
সেসময় আট দলের পূর্ব প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে মি. জুবায়ের বলেছিলেন, "গত মাসের নয় তারিখ থেকে আমরা আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করলাম। শেষদিকে এসে আরো তিনটি দল আমাদের সাথে এখানে জয়েন করলেন। এই অবস্থায় এসে প্রথম দিকের যে আলোচনা ছিল গত মাসের ২৪ - ২৫ তারিখের সেটাকে আবার নতুন করে সাজাতে হলো।"
পরে সকলে একমত হয়ে জোটের সিদ্ধান্তেই ২৯শে ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেয় বলে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে জানিয়েছিলেন তিনি।