আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ক্রিকেট: লর্ডসে একটি রান আউটকে ঘিরে বিশ্বে কেন এত তর্কাতর্কি?
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
চার্লি ডিন রান আউট (দীপ্তি শর্মা) : ৪৭ (৮০)। স্কোরকার্ডে এরকম অতি সাধারণভাবেই লেখা আছে লাইনটা।
লর্ডসে শনিবার ইংল্যান্ড আর ভারতের নারী ক্রিকেট দলের মধ্যে সিরিজের তৃতীয় তথা শেষ ম্যাচে শেষ ডিসমিস্যাল ছিল ওটা - যার সুবাদে ভারত ম্যাচটা ১৬ রানে জিতে যায়। সঙ্গে প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াশও করে ইংল্যান্ডকে।
কিন্তু সেই আউটের ধরনটা সাধারণ ছিল না মোটেই, যা ক্রিকেটের 'স্পিরিট'কে লঙ্ঘন করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আবার অন্য একটা দলের পরিষ্কার মত হচ্ছে, দীপ্তি শর্মা কিচ্ছু অন্যায় করেননি - যা করেছেন পরিষ্কার খেলার আইনের মধ্যে থেকেই করেছেন।
ইংল্যান্ডকে সেদিন প্রায় জয়ের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া চার্লি ডিন যেভাবে আউট হয়েছিলেন সেটা কিন্তু সাধারণ রান আউট ছিল না - বরং নন-স্ট্রাইকার এন্ডে থাকা অবস্থায় বোলারের হাত থেকে বল ডেলিভারির আগেই ক্রিজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মাশুল দিতে হয়েছিল তাকে।
আরও পড়তে পারেন:
বোলার দীপ্তি শর্মা সেটা খেয়াল করেই থেমে গিয়ে তার এন্ডের বেল উড়িয়ে দেন - টিভি আম্পায়ার পুরো ঘটনাটা পর্দায় দেখে ডিনকে আউট ঘোষণা করেন। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ভরা ম্যাচটা ভারত জেতে ঠিকই - কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় তর্কবিতর্ক।
বস্তুত এই ইস্যুতে ক্রিকেট বিশ্বও কিন্তু পরিষ্কার দু'ভাগ হয়ে গেছে।
ইংল্যান্ড ও ভারতের সাবেক ও বর্তমান তারকা ক্রিকেটাররা টুইটারে এসে মতামত দিতে শুরু করেছেন, এভাবে আউট করাটা উচিত হয়েছে কি হয়নি। সেই সব মন্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই আক্রমণ বা তির্যক কটাক্ষ, বিদ্রূপেও রূপ নিচ্ছে।
দীপ্তি শর্মা নিজে এদিন কলকাতায় ফিরে দাবি করেছেন, ক্রিজ থেকে বারবার বেরোনোর জন্য তিনি চার্লি ডিনকে অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন।
যার জবাবে ইংল্যান্ড দলের ক্যাপ্টেন হেদার নাইট এদিন পাল্টা টুইট করেছেন - যার অর্থ দাঁড়ায় শর্মা সত্যি কথা বলছেন না। তর্কাতর্কিটা এখন এই পর্যায়েও নেমে এসেছে।
আইন বনাম স্পিরিট
চার্লি ডিন সেদিন লর্ডসে যেভাবে আউট হয়েছিলেন সেটাকে ক্রিকেট দুনিয়ায় বহুদিন ধরে 'মানকড ডিসমিস্যাল' নামে ডাকা হয়ে থাকে।
আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে সিডনি টেস্টে ভারতীয় অলরাউন্ডার ভিনু মানকড অস্ট্রেলিয়ার বিল ব্রাউনকে এভাবে আউট করেছিলেন বলেই এটার এধরনের নামকরণ।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই ডিসমিস্যাল এখনও বেশ বিরল একটি ঘটনা - গত শনিবারের আগে পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র চারবার ও একদিনের ক্রিকেটে আরও চারবার মানকড আউটের ঘটনা ঘটেছিল।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
কিন্তু মানকড আউট বরাবরই আইনসিদ্ধ ছিল, যদিও অনেক ক্রিকেটার মনে করে এসেছেন এভাবে প্রতিপক্ষ দলের কাউকে আউট করাটা ক্রিকেটের স্পিরিট বা চেতনার পরিপন্থী।
উনিশশো সাতাশি সালের বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোর্টনি ওয়ালশ লাহোরে পাকিস্তানের সেলিম জাফরকে 'মানকড' করার সুযোগ পেয়েও ইচ্ছে করে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
তার জেরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যায়, কিন্তু ওয়ালশ ক্রিকেট দুনিয়ায় 'জেন্টলম্যান' বা 'সজ্জন' বলে দারুণ সুখ্যাতি পেয়েছিলেন।
তবে ক্রিকেটের আইনের যারা 'কাস্টডিয়ান', সেই মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব বা এমসিসি কিন্তু বরাবরই এটিকে একটি ডিসমিস্যালের বৈধ পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে।
এ বছরের মার্চ মাসেও এমসিসি জানিয়েছিল, "৪১.১৬ নম্বর আইন - নন-স্ট্রাইকারের রান আউট - এটিকে ল ৪১ (আনফেয়ার প্লে) থেকে ল ৩৮ (রান আউট)-এ সরিয়ে আনা হচ্ছে। আইনের বাদবাকি সব শব্দ অপরিবর্তিত থাকবে।"
তথাকথিত মানকড আউট যে 'অশোভন খেলা'র ধারা থেকে অনেক বেশি সম্মানজনক সাধারণ 'রান আউটে'র মর্যাদা পাচ্ছে, গত সপ্তাহে একটি প্রেস বিবৃতিতে এ কথা ঘোষণা করে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আইসিসিও।
অন্য দিকে ক্রিকেটের স্পিরিট বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা নিয়েও যথারীতি রয়েছে বিতর্ক।
স্পিরিট কোনও বায়বীয় বস্তু নয় ঠিকই, তবে এ প্রসঙ্গে ক্রিকেটের আইনে বলা হয়েছে, "ক্রিকেটের স্পিরিটের মূল কথা হল রেসপেক্ট বা সম্মান। তোমার ক্যাপ্টেনকে, টিমমেটদের, প্রতিপক্ষকে ও আম্পায়ারের কর্তৃত্বকে রেসপেক্ট করো। প্লে হার্ড, প্লে ফেয়ার। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে মেনে নাও।"
ইংল্যান্ডের চার্লি ডিনকে আউট করার ক্ষেত্রে ভারতের দীপ্তি শর্মা খেলার আইন অবশ্যই মেনেছেন, কিন্তু খেলার স্পিরিটটা মেনেছেন কি না - এই নিয়েই এখনও তুমুল বিতর্ক চলছে সেই ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রায় ৪৮ ঘন্টা পরেও।
ক্রিকেট দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া
সেদিনের ম্যাচের পর ভারতের ক্যাপ্টেন হরমনপ্রীত কাউরকে যখন দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করা হয়, এরকম একটা আউটের মাধ্যমে ম্যাচ আর সিরিজ জিতে তিনি খুশি কিনা, একটু হেসে তিনি জবাব দেন, "আমি ভেবেছিলাম বাকি ন'টা উইকেট আমরা কীভাবে নিলাম সেটা নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করবেন - কারণ কাজটা মোটেই সহজ ছিল না।"
তবে সেই সঙ্গেই তিনি জানিয়ে দেন, দল যা করেছে তা নিয়মের মধ্যে থেকেই করেছে - এবং তার বোলার যে সম্পূর্ণ সতর্ক ছিলেন সেটা এভাবে আউট করা থেকেই পরিষ্কার।
এরপর সোশ্যাল মিডিয়াতেও ইংল্যান্ড আর ভারতীয় ক্রিকেটের সাবেক ও বর্তমান তারকারা এই বিতর্কে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন টুইটারে মন্তব্য করেন, "এভাবে কোনও ম্যাচ জিতলে তার থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়।"
ইংল্যান্ড দলের স্যাম বিলিংস, জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রডের মতো অনেক ক্রিকেটারই এই আউটের ধরনকে রীতিমতো কটাক্ষ করতে থাকেন।
ভারতের রবি অশ্বিন (যিনি নিজেও একবার আইপিএলে মানকড আউট করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন), আকাশ চোপড়ার মতো ক্রিকেটার কিংবা হর্ষ ভোগলের মতো ক্রিকেট ভাষ্যকার আবার খোলাখুলি দীপ্তি শর্মার পিঠ চাপড়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বলতে থাকেন - ও যা করেছে দারুণ করেছে।
এদিকে ক্রিকেট-বিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো-র বিশ্লেষক পিটার ডেলা পেনা সেদিনের ম্যাচের রিপ্লে পুরোটা খুঁটিয়ে দেখে জানাচ্ছেন, চার্লি ডিন সেদিন পুরো ইনিংসে অন্তত ৭২বার বল ডেলিভারির আগেই নন-স্ট্রাইকার এন্ড থেকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়েছিলেন।
ফলে তার ইঙ্গিত ছিল, ৭১বার উপেক্ষা করার পর ৭২তম বারে ডিন-কে আউট করে দীপ্তি শর্মা বা ভারতীয় দল কোনও অন্যায় করেননি।