বগুড়াকে নিজেদের আদি দুর্গ দাবি জামায়াতের, ব্যালটে জবাব দিতে চায় বিএনপি

    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, বগুড়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শুরু না হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোটের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা বগুড়ায় অনেকটা স্বস্তিতে আছে বিএনপি। তবে, জেলার সাতটি আসনের মধ্যে দুই থেকে তিনটি আসনে বিএনপির সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।

জেলার সাতটি আসনের মধ্যে বগুড়ার সদর আসন থেকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হয়েছেন। ওই আসনসহ সবগুলো আসনেই প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণফোরাম, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, এলডিপি এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ মোট ৯টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী।

তবে ভোটাররা বলছেন, জেলার অন্তত তিনটি আসনে বিএনপির সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী নির্বাচনসহ অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফল তুলে ধরে জামায়াতের বগুড়া সদরের আমীর আবিদুর রহমান বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেন, বগুড়া ছিল মূলত জামায়াতের আদি দুর্গ। এবারের নির্বাচনে তারা সেই দুর্গ ফেরত আনতে চায়।

এর জবাবে বিএনপির জেলা সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলছিলেন, এটি শুধু দুর্গ নয়, বিএনপি রাজনীতির তীর্থস্থান। এর প্রমাণ মিলবে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ব্যালটে।

নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতার বাইরেও এই এলাকার ভোটাররা তাদের অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলছিলেন, এবার নির্বাচনটি যেন অন্তত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে হোক।

নির্বাচন নিয়ে পথে ঘাটে চায়ের আড্ডায় নানা আলোচনা হলেও, নির্বাচন কমিশনের আইনি বাধ্যবাধকতায় ভোটের প্রচার প্রচারণায় দেখা যায়নি।

সুষ্ঠু ভোট নিয়ে এবার শঙ্কা কেন?

বগুড়া সদর থেকে গাবতলী উপজেলায় যাওয়ার পথে দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। উত্তরের এই জেলার বিশাল অংশ জুড়ে আবাদি জমি। আলু, ভুট্টা, সরিষা, ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমে আলাদা ফসলের আবাদ হয়।

এ মৌসুমে কুয়াশা যেমন কম পড়েছে, শীতের প্রকৃতিও খুব একটা বৈরি আচরণ করেনি, বলছিলেন সদরের রাজারহাট ইউনিয়নের কৃষক রেজাউল করিম।

সকাল থেকে নিজের জমিতে ফসলের পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই মাঠের রাজনীতির খবর রাখার খুব একটা সময়ও হয় না তার। তবে, এবারের নির্বাচন ঘিরে তার অপেক্ষা যেন একটু বেশিই।

কেন বেশি? এই প্রশ্নে মি. করিম বলছিলেন, "এই বয়সে মাত্র দুইবার ভোট দিতে পারছি। এরপর ২০০৮ সালের পরে আর ভোট দিতে পারি নাই। এখন ভোট আসছে, আমরা তো চাচ্ছি ভালো পরিবেশে ভোটটা ভালো হোক। যাতে কেন্দ্রে যাওয়ার পর না শুনি আমরা ভোট হয়ে গেছে"।

এরপর বিগত তিনটি নির্বাচনে তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন তিনি। মি. করিম জানাচ্ছিলেন, বগুড়ায় এবার যেই জিতুক, যারাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক তারা যেন এমন একটা পরিবেশ পান যাতে ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে পারে কোনরকম শঙ্কা না করে।

গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায়। এখন কেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিয়ে এমন শঙ্কা কেন? এই প্রশ্নে পাশেই ছিলেন ষাটোর্ধ কৃষক আব্দুস সামাদ।

তিনি বলছিলেন, সারা বছরই পরিবেশ ভালো থাকে। ভোটের সময় এই সেই পরিবেশ আর থাকে না। তবে এবার যেন অতীতের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই প্রত্যাশার কথাও বলছিলেন মি. সামাদ।

অবশ্য এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে পাশের গাবতলী উপজেলার একজন কর্মজীবী নারীর কাছ থেকে। নুরজাহান আক্তার আর তার স্বামী মিলে একটি গ্যারেজে কাজ করেন।

মিসেস আক্তার বলছিলেন, "উপরের বড় নেতারা তো ভালো ভালো কথা বলে। মাঠের ছোট নেতারা তো নিজের মতো যা খুশি করে। এখন তাদের কারণেই তো অনেক সময় দলের দুর্নাম হয়। এত কিছুর পরও যদি আমরা ঠিক না হই তাহলে তো আর কিছু করার নাই।

বগুড়া সদর, গাবতলী, সারিয়াকান্দি, শেরপুর এলাকার ভোটারদের সাথেও কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। এই এলাকার ভোটাররা এবার অন্তত এমন একটা নির্বাচন চান যেখানে তারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন।

নিজ ঘাটিতে কতটা স্বস্তিতে বিএনপি?

প্রথমে যখন বিএনপি দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করে তখন দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বগুড়া-৭, এবং তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে এই আসনে আগেই বিকল্প প্রার্থী রেখেছিল বিএনপি। মিসেস জিয়ার মৃত্যুর পর গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টনকে বিএনপির প্রার্থী করা হয়।

মূলত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নিজের এলাকা হওয়ার কারণে গাবতলীতে বিএনপির অবস্থান অনেকটাই শক্তিশালী। অন্যদিকে দীর্ঘদিন খালেদা জিয়া এই আসন থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় এখানে বিএনপির অবস্থানও শক্তিশালী।

গাবতলী এলাকার ভোটার রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "নভেম্বর মাসে খালেদা জিয়া যখন খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল, তারেক রহমান দেশের বাইরে ছিল। তখন বিএনপির অনেকেই হতাশ হয়ে গেছিলো। তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিএনপির ভোটাররা মনোবল ফিরে পাইছে"।

ভোটার ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে বোঝা গেছে, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ এই দুইটি আসনেই বিএনপির সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। জিয়াউর রহমানের গ্রামের বাড়ি, সেটিই সবচেয়ে বড় কারণ।

বাটি পাঁচটি আসনের মধ্যে আদমদীঘি দুপচাচিয়া নিয়ে গঠিত বগুড়া-৩ এবং সারিয়াকান্দি সোনাতলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-১ আসনেও বেশ শক্ত অবস্থানে আছে বিএনপি।

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বগুড়া শুধু বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান না, বিএনপির রাজনীতির তীর্থ স্থানও। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা ব্যালটেও তার প্রমাণ দিবে"।

এছাড়া বগুড়া-৫ শেরপুর-ধুনট আসনেও অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বিএনপি। যদিও এবার এই আসনে জামায়াত শক্তিশালী প্রার্থী দেওয়ায় এই আসনটিতে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে দুই দলের মধ্যে।

বগুড়া-২ আসনে বিএনপি জোটের হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। যদিও এই আসনে বিএনপিও ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী দিয়েছিল। প্রথমে, এই আসন থেকে মি. মান্নার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। তখন বৈধ প্রার্থী হিসেবে টিকে যায় বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী মীর শাহে আলম।

বগুড়া থেকে মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় নির্বাচন কমিশনে আপিল করে আবার মনোনয়ন ফিরে পান মি. মান্না।

এই মুহূর্তে মি. মান্নার মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় এ নিয়ে বেশ বিপাকে আছে বিএনপি। জেলা বিএনপির সভাপতি মি. বাদশা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এ নিয়ে এখনো ওই আসনে জোটের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হয়নি। যেটি তারা আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত করবেন।

অতীত নির্বাচনের ফলাফল বলছে, গত তিন দশকে এই জেলার আসগুলো বেশিরভাগই বিএনপির দখলে ছিল। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নির্বাচনে বিএনপির দুর্গে ভাগ বসায় আওয়ামী লীগ। সেইবার এই জেলায় নৌকার প্রার্থী বগুড়া ১ ও বগুড়া ৫ আসনে জয়লাভ করে।

জামায়াত বলছে- 'বগুড়া আদি দুর্গ'

ঐতিহাসিক ও পুরাতন শহর বগুড়া। গণ অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।

ফলে বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত এই জেলার সাতটা আসনে অনেক দল ও প্রার্থী থাকলেও ভোটাররা বলছেন এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।

বগুড়ার যে সব জেলায় জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালী তার মধ্যে বগুড়ার শিবগঞ্জ একটি।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলেও এই আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। এছাড়া বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বগুড়া ৬, অর্থাৎ সদর আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত।

স্থানীয় ভোটার ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভাষ্য, বগুড়ার যে আসনগুলোতে জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালী তার মধ্যে কাহালু নন্দীগ্রাম নিয়ে গঠিত বগুড়া-৪ আসন একটি। এবার নির্বাচনে এই আসতে চমক দেখাতে পারে বলে আশা জামায়াতেরও।

যদিও জামায়াতে ইসলামীর দাবি ঐতিহাসিকভাবে বগুড়ার বেশ কয়েকটি আসনই জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। স্বাধীনতাপূর্ব ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও এই জেলা থেকে আসন জিতেছিল জামায়াত।

যে কারণে জামায়াত বলছে, এটি শুধু বিএনপির ঘাটি না, জামায়াতের অতীত দুর্গও।

শহর জামায়াতের আমির আবিদুর রহমান সোহেল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা কিন্তু বিএনপির ঘাটি ছিল না। এটা ছিল জামায়াতের ঘাটি। আমরা জোটবদ্ধ নির্বাচন করার কারণে আমরা ওইভাবে সবগুলো আসনে নির্বাচন করিনি। এবার সবগুলো আসনে আমরা প্রার্থী দিয়েছি। এবার আমরা আমাদের ঘাটি পুনরুদ্ধার করবো"।

২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত পাঁচ জন চেয়ারম্যান, ৯ জন পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ও দুইজন জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জয়লাভ করেন স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে।

জামায়াত নেতা মি. সোহেল জানান, এবার ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের ভোটাররাও জামায়াতকে ভোট দিবে বলে তাদের বিশ্বাস। যে কারণে এবার এই জেলায় ভোটে চমক দেখাতে পারে তারা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখানে দুইটা দলেরই (বিএনপি-জামায়াত) প্রাধান্য আমরা লক্ষ্য করছি। এখানে বিএনপির দুর্গে ভোটের রাজনীতিতে অপর পক্ষ কোনো কোনো আসনে এগিয়েও যেতে পারে"।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হলে এবার জেলার অনেক আসনের আদি হিসাব নিকাশও বদলে যেতে পারে।