সালমান রুশদী: স্যাটানিক ভার্সেস বইটির প্রতিবাদে বাংলাদেশে ৮৯ সালে যা হয়েছিলো

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ভারতে জন্ম নেয়া ব্রিটিশ নাগরিক ও লেখক সালমান রুশদীর স্যাটানিক ভার্সেস বইটিতে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে-এমন অভিযোগ তুলে তিন দশক আগে বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের অনেকে যে প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলো তার ঢেউ এসে পড়েছিলো বাংলাদেশেও।
উনিশশো আটাশি সালে বইটি প্রকাশ করেছিলেন সালমান রুশদী, কিন্তু বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের দেশগুলো এ নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ তুঙ্গে উঠেছিলো মূলত ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিস্টার রুশদীর মাথার মূল্য ঘোষণা করে ফতোয়া দেয়ার পর।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় তখনকার মসজিদ মাদ্রাসাগুলোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রতিবাদ কর্মসূচীগুলোর ডাক দিলেও তাতে সর্বস্তরের জনগণই অংশ নিয়েছিলো - বলছেন রাজশাহীর জামিয়া ইসলামিয়া শাহ মাখদুম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি শাহাদত আলী।
মিস্টার আলী ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের মধুপুরে ছিলেন এবং সেখানেই তিনি সালমান রুশদী বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
"মধুপুরে আলেম ওলামা ছাড়াও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্ররাই বেশি অংশ নিয়েছিলো। এক পর্যায়ে এটি হয়ে ওঠেছিলো সর্বস্তরের মানুষের প্রতিবাদ কর্মসূচি। আমার মনে আছে মিছিলটি মধুপুরে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
ঢাকায় জাতীয় মসজিদের বায়তুল মোকাররমের একজন ইমাম বলছেন, বইটিতে কী আছে সেটি হয়তো কেউ জানতো না। কিন্তু তাতে ইসলামের অবমাননা হয়েছে এই খবর তখনও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
"শুরুতে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে মিছিল শুরু হলেও পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের সংখ্যাই বেশি ছিলো। আমি তখন কিশোরগঞ্জে ছিলাম। সেখানে এমনই ছিলো পরিস্থিতি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি। তবে তিনি তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।
তার মতে তখন মানুষ ছিলো এখনকার তুলনায় অনেক কম। কিন্তু মানুষের মধ্য আবেগ তৈরি হয়েছিলো ও তারা সবাই মিছিলে মিস্টার রুশদীর শাস্তি দাবি করছিলো।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
স্যাটানিক ভার্সেস বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। পরে ধীরে ধীরে এ বই নিয়ে মুসলিমদের অনেকের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ক্রমশ এ অসন্তোষের ঢেউ এসে লাগে উপমহাদেশেও। ভারতে এ নিয়ে সংঘর্ষে কয়েকজন মারাও যায়।
এর কয়েকদিন পর ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি মিস্টার রুশদীর মৃত্যুদণ্ড ও মাথার মূল্য ঘোষণা করলে বাংলাদেশেও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচি দিতে শুরু করে ধর্মভিত্তিক নানা সংগঠন।
সংবাদপত্রে বিক্ষোভের খবর
বাংলাদেশে তখন হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হলেও সেসব পত্রিকাতেও এ বিষয়ক সংবাদ দেখা যায়।
উনিশশো উননব্বই সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারির বেশিরভাগ পত্রিকায় অন্যতম লিড নিউজ ছিলো রুশদীকে হত্যার জন্য ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনির ত্রিশ লাখ ডলার পুরষ্কার ঘোষণা।
এর কয়েকদিন পর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় 'ইরানের নেতা খোমেনির ঘোষণা: সালমান রুশদীর ক্ষমা নাই' শীর্ষক সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিলো।
একইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুশোরও বেশি শিক্ষার্থীর একটি বিবৃতিও ছাড়াও কয়েকটি ইসলামপন্থী সংগঠনের বক্তব্য প্রকাশিত হয়।
এর আগে উনিশে ফেব্রুয়ারির ইত্তেফাকের খবর ছিলো 'রুশদীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অব্যাহত'।
এই খবরের সাথেই বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলের খবর আলাদা করে দেয়া হয়েছিলো।
আর ১৮ই ফেব্রুয়ারির ইত্তেফাকে দ্বিতীয় শীর্ষ খবর ছিলো প্রাণনাশের হুমকির মুখে রুশদীর আত্মগোপন, বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া।
ইত্তেফাকের এসব খবর থেকে বোঝা যায় যে কয়েকদিন ধরেই দেশের নানা জায়গায় বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালিত হচ্ছিলো।
আর অসংখ্য সংগঠন ও ব্যক্তিরা সংবাদপত্র অফিসে বিবৃতি পাঠিয়েছিলেন মিস্টার রুশদীর শাস্তি দাবি করে।

ছবির উৎস, HORATIOGATES3/BBC
বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিকদের একজন বলছিলেন, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতেও প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছিলো তখন।
ভোলার জহিরুল ইসলাম এখন ব্যবসায়ী। উননব্বই সালে তিনি ছিলেন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র।
"আমার মনে আছে পুরো স্কুলের সবাই আমরা মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম শিক্ষকরাসহ," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
সালমান রুশদী কে ও তার স্যাটানিক ভার্সেসে কী আছে
স্যাটানিক ভার্সেস হলো সালমান রুশদীর চতুর্থ বই।
কিন্তু এটিই তার সবচেয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত কাজ যা তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজিরবিহীন বিপদে ফেলে দেয়।
বইটি প্রকাশের পর তাকে হত্যার হুমকি আসে যা তাকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করে।
ব্রিটিশ সরকার তখন তাকে পুলিশী নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসে।
যুক্তরাজ্য ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হয়।
পশ্চিমা বিশ্বের লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বইটির কারণে মুসলিমদের দিক থেকে আসা প্রতিক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
পরাবাস্তববাদী উত্তরাধুনিক এই বইটি তীব্র ক্ষোভের তৈরি করে মুসলিমদের অনেকের মধ্যে। তারা মনে করেন বইটিতে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে।
ভারতই প্রথম এই বইটি নিষিদ্ধ করেছিলো। পরে পাকিস্তানসহ অন্য বেশ কিছু মুসলিম দেশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকাও একই পদক্ষেপ নেয়।
উপন্যাসটির প্রশংসাও করেছেন অনেকে। এটি পেয়েছিলো দ্যা হুইটব্রেড প্রাইজ।
কিন্তু দু মাসের মধ্যেই বইটিকে ঘিরে দানা বাঁধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ।
কিছু মুসলিম মনে করেন বইটিতে ইসলাম ধর্মকে উপহাস করা হয়েছে।
বইটিতে দুজন যৌনকর্মীর এমন নাম দেয়া হয়েছিলো যা ইসলামের নবীর দুজন স্ত্রীর নামের সাথে মিলে গিয়েছিলো।
তিনি বইটিতে এমন দুটো লাইন লিখেছিলেন যেখানে তিনি দাবি করেন যে ইসলামের নবী কোরান থেকে সেগুলো বাদ দিয়েছেন।








