ক্রিকেট: খেলায় 'মন না থাকা' ও আরো ছয় দুর্বলতা বাংলাদেশ টেস্ট দলের

সাকিব আল হাসান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাকিব আল হাসান

বাংলাদেশের একশোতম টেস্ট ম্যাচে হারের পর তৃতীয় দফায় বাংলাদেশের টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব পাওয়া সাকিব আল হাসান বলছেন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সংস্কৃতিই গড়ে ওঠেনি।

এখানে প্রশ্ন উঠেছে যে টেস্ট ক্রিকেটের সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পেছনে কী কী বড় ভূমিকা পালন করে, সেসব চর্চা বাংলাদেশে হয় কি না। নাকি ক্রিকেটাররা মাঠে ব্যর্থ হওয়ার পরে দায়টা 'ক্রিকেট সংস্কৃতি'র ওপর দিচ্ছেন।

টেস্ট ক্রিকেটে ১৩৪টি ম্যাচ খেলে ১০০টিতেই হেরেছে বাংলাদেশ। বাকি ম্যাচগুলোর মধ্যে ১৬টি টেস্টে জিতেছে, ১৮টি হয়েছে ড্র।

তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেব করলে জয়ের সংখ্যা আরও কম, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই বাংলাদেশ আটটি টেস্ট জিতেছে। এর বাইরে শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি করে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চারটি টেস্ট ম্যাচে জিতেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা মঙ্গলবার গণমাধ্যমে বলেছেন, "সাকিবকে আরও সময় দিতে হবে, দায়িত্ব পেয়েই কোনও ফ্লুক হবে না।"

তবে তিনি সাকিবের সাথে সুর মিরিয়েছেন, "টেস্ট কালচার আমাদের কখনোই ছিল না, গড়েও উঠেনি; টেস্ট কালচার তৈরী করা চাট্টিখানি কথা না।"

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা জোর দিয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্বলতার দিকেই, "আমাদের তো শেফিল্ড শিল্ড বা রঞ্জি ট্রফির মতো টুর্নামেন্ট নেই। তাই একজন বিদেশি ক্রিকেটারকে খেলার অনুমতি দিলে কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।"

টেস্ট খেলার মানসিকতা

বাংলাদেশের হয়ে ৬৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলা তামিম ইকবাল নিঃসন্দেহে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের টেস্ট দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার, তিনি দুই টেস্টে চার ইনিংসে তিনবার প্রায় নির্বিষ বল খেলতে গিয়ে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন।

সাকিব দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট খেলছেন, কিন্তু প্রথম টেস্টে যখন বাংলাদেশ ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছে তখন শেষ উইকেট জুটিতে সাকিব ৫০ করার পরপরই বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হয়ে গেছেন। ইনিংস ধরে রাখার বা উইকেটে সময় কাটানোর চেষ্টা দেখা যায়নি তার ব্যাটে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষক সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি বিবিসি বাংলাকে বলেন, তার মনে হয় ক্রিকেটারদের ফোকাস এখন আর শুধু ক্রিকেটে নেই।

"আমার মনে হয় শুধু মুশফিক ছাড়া কেউই পরিপূর্ণ ক্রিকেটে মন নেই। তামিমের নানাবিধ সমস্যা, এই টি-টোয়েন্টি খেলবেন কি খেলবেন না। সাকিব পারিবারিক দিকটাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। টেস্ট ক্রিকেটে এসব বড় ব্যাপার।"

এছাড়া টপ অর্ডারে নাজমুল হোসেন শান্তও কিছু ভালো শুরু করার পর খুবই অপ্রয়োজনীয় শট খেলে আউট হয়ে যান।

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শট সিলেকশন নিয়ে একটা প্রশ্ন বরাবরই থেকে যায়। টেস্ট ক্রিকেটে ঠিক কোন সময় ধৈর্য্য ধরতে হবে, নতুন বলে ক্রিকেটটা কীভাবে খেলতে হবে এই বিষয়গুলো নিয়ে সবসময়ই একটা দুর্বলতা দেখা যায়।

তবে মি. হুসেইনের মতে, শান্ত-জয়দের এই বয়সে এসে টেকনিক শেখানো বা পরিবর্তন করা যাবে না।

"বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা জাতীয় দলে এসে ক্রিকেট খেলা শেখেন।"

মুশফিকুর রহিম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুশফিকুর রহিমের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেট খেলার মানসিকতা লক্ষ্য করা যায় বলছেন বিশ্লেষকরা

'এ টিম' নিয়ে আলাদা কোনও ভাবনা নেই

এক্ষেত্রে 'এ' দলের পরিকল্পনাহীন খেলার উদাহরণও দেন তিনি।

"বাংলাদেশের এ দল এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। সাধারণত কোনও বিকল্প দল সফরের আগেই খেলে আসে, সেখানে নিজেদের যাচাই করে।"

ভারতের ক্রিকেটার রিশাভ পান্ত, মোহাম্মদ সিরাজের উদাহরণ টেনেছেন মি. হুসেইন।

এই ক্রিকেটাররা বড় মঞ্চে নামার আগেই এ টিমের হয়ে নানা দেশে ক্রিকেট খেলে এসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভালো করছেন এবং ম্যাচ জেতাচ্ছেন।

যে কারণে বাংলাদেশে কোনও ব্যাকআপ নেই বলছেন তিনি।

"বাংলাদেশে আপনি মুমিনুলকে বাদ দিবেন কিংবা শান্তকে বাদ দিবেন সেটার ব্যাকআপ কোথায়?"- এই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের এই ক্রিকেট বিশ্লেষক।

অমিত হাসান, মাইশুকুর রহমান, ফজলে রাব্বির মতো ব্যাটসম্যানরা ভালো করছেন - কিন্তু তাদের পরের লেভেলে নেয়া হচ্ছে না বলে মনে করছেন মি. হুসেইন।

'এ টিম'-এর কার্যক্রম বাংলাদেশে নেই, এটা একটা বড় পার্থক্য বলে মনে করেন বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

ওয়ানডেকে ঘিরে চিন্তা বাংলাদেশের, এটাও একটা বড় কারণ বলছেন সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি।

আরও একটা ব্যাপার কাজ করে যে ক্রিকেটারদের পরিচর্যা করা হয় না কোনও টুর্নামেন্ট ধরে।

যেমন এই বছর আছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।

কিন্তু বছরের শুরুতে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের পরে, 'টি-টোয়েন্টির প্রস্তুতি কই, যেসব ক্রিকেটার উঠে আসছেন তাদের খেলা কই' - প্রশ্ন মি. হুসেইনের।

এমনকি নেপালেও চারটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট চলে, ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের বাইরে জাতীয় পর্যায়ে টি-টোয়েন্টি লিগ হয়।

লিটন দাস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লিটন দাসও এই সফরে তেমন ভালো করতে পারেননি

টপ অর্ডারের ব্যর্থতা

টেস্ট ক্রিকেটে নতুন বল পুরনো বলের হিসেবটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম সেশনটা ব্যাট করে কাটিয়ে দিতে পারলে, লাঞ্চের পরে ব্যাট করা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।

বলও হালকা হতে শুরু করে, একদম আনকোরা ডিউক বলের যে ধার ও ঔজ্জ্বল্য থাকে তা কিছু ওভার খেলার পরে ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং এজন্য মাঝের ওভারগুলোতে ব্যাট করা তুলনামূলক সহজ হয়।

কিন্তু এই টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ কোনওভাবেই কোনও ইনিংসেই ভালো ব্যাট করতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলগুলোও বাংলাদেশের নানা ধরনের দুর্বলতা খুব সহজেই মার্ক করেছে বলে মনে করেন সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি।

"আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুরঙ্গ লাকমাল বা কেমার রোচের বল যখন ফেস করে তখন কিন্তু তারা বিকেএসপির মাঠে বল করেন না। সেন্ট লুসিয়া বা বারবাডোজের উইকেটের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ঘরের মাটিতে পান না।"

শুধু এই সিরিজ না, ২০১৯ সালে ভারত সফর থেকে শুরু করে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের টপ অর্ডার ভালো করতে পারেনি। একদম ধারাবাহিকভাবেই ৫০ রানের ভেতর ৩-৪ উইকেট হারিয়ে একটা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং সেখান থেকে সামাল দিতে মুশফিকুর রহিম বা লিটন দাস কিছু ইনিংস খেলেছেন। এই টেস্ট সিরিজে মুশফিক ছুটিতে এবং লিটন দাস ঠিক নিজের সাম্প্রতিক ফর্ম অনুযায়ী খেলতে পারেননি - একারণে বাংলাদেশের ব্যর্থতা আরও বেশি ফুটে উঠেছে।

বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কোচদের শিক্ষার মান

সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি আরও বলছেন, বাংলাদেশের কোচদের সবচেয়ে বড় সমস্যা তারা চৌকষ নন খুব বেশি। ক্রিকেট শুধু মাঠের খেলা না, এখানে চিন্তারও খোরাক আছে।

"কোচদের শিক্ষা নেই বললেই চলে, গেম ডেভেলপমেন্টের কোচদের যে শিক্ষা সেটা আপডেট হয়নি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।"

"বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেট কোচ যারা - নাজমুল আবেদীন ফাহিম স্যার বলেন আর সালাউদ্দিন স্যার - তারা বেশ সিনিয়র লেভেলের ক্রিকেটার হাতে পান।"

যে বয়সে এসে ক্রিকেটারদের খুব বেশি পরিবর্তন করার থাকে না।

কিন্তু তার আগে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট কোচদের শিক্ষার ব্যাপারটা নিশ্চিত করার দিকে জোর দেয়ার কথা বলেছেন মি. হুসেইন।

খালেদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, টেস্ট ক্রিকেট খেলার উপযোগী পেস বোলার পাওয়াই যায় না বাংলাদেশের

মানসম্মত দলগুলোর সাথে টেস্ট না খেলা

বাংলাদেশের ক্রিকেট কূটনীতিতে একটা বড় ব্যর্থতা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারতের মতো দলগুলোর সাথে বেশি টেস্ট খেলতে না পারা।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ শেষবারের মতো টেস্ট ক্রিকেটে খেলেছে ২০০২ সালে। ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশ টেস্ট সফরে গিয়েছিল ২০১০ সালে।

এমনকি টেস্ট খেলার দিক থেকেও বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা অনেক পিছিয়ে আছেন।

মুশফিকুর রহিম বাংলাদেশের হয়ে নিয়মিত টেস্ট ক্রিকেট খেলেন। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া দলে তার পরে অভিষিক্ত যেকোনও নিয়মিত ক্রিকেটার মুশফিকের চেয়ে বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ স্মিথ মুশফিকের পাঁচ বছর পরে টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করে তার চেয়ে তিন টেস্ট বেশি খেলেছেন। এর মধ্যে আবার প্রায় এক বছরের মতো নিষিদ্ধও ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা নিয়মিত ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যেমন ভারতের টেস্ট ক্রিকেটাররা রঞ্জি ট্রফি খেলেন নিয়মিত। এমনকি শচীন টেন্ডুলকারও ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত ভারতের ঘরোয়া চারদিনের ক্রিকেট ম্যাচে মাঠে নেমেছেন।

সম্প্রতি ফর্ম হারানো চেতেশ্বর পুজারা নিজের ব্যাটিং নিয়ে কাজ করতে ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলেন।

পেস বোলারের অভাব

টেস্ট ক্রিকেটে পেস বোলিং সবসময়ই একটা মাথাব্যথার কারণ। বাংলাদেশে আদতেই প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের হুমকি দেয়ার মতো পেস বোলার নেই বলছেন মি. হুসেইন।

শুধু সিলেট বিভাগ থেকেই পেস বোলার উঠে আসছেন - ইবাদত, রাহী, খালেদ - এই তিনজনের মতো বোলার আর কোনও বিভাগে নেই বলছেন সামি।

এসব সমস্যা মিলিয়েই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করা হয়ে উঠছে না।

সাকিবের কথাতেও উঠে এসেছে, টেস্ট ক্রিকেট খেলার জন্য যে চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রয়োজন সেটা বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা দেখাতে পারেননি।

দর্শকের অনীহা

বাংলাদেশের মাঠে যখন খেলা হয়, তখন টেস্ট ক্রিকেটে তেমন দর্শক হয় না - এটাও টেস্ট ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে না ওঠার একটা কারণ বলে মনে করছেন সাকিব আল হাসান।

তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে টেস্ট ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্বটা ক্রিকেটারদেরই।

সাকিব বলেন, "এমন না যে আমরা গুরুত্ব দেই না। কিন্তু আমরা ভালো করছি না।"