অনিশ্চয়তায় জামায়াতের জোট, ভেতরে অবিশ্বাস

- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনসহ দুটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তাদের ১১ দলীয় জোট।
জামায়াতকে নিয়ে 'অবিশ্বাস' আর 'সন্দেহের' কথা এসেছে এই জোটে। ইসলামী আন্দোলনের নেতারা আলাদা জোট গঠনের ইঙ্গিতও দিচ্ছেন।
এই দলগুলো দুদিন ধরে দফায় দফায় বৈঠক করেও সমাধানে আসতে পারেনি। আসন সমঝোতার চূড়ান্ত অবস্থান জানাতে আগের নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনও স্থগিত করতে হয়েছে।
এমন পটভূমিতে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য আসন সমঝোতার ইস্যুতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট শেষপর্যন্ত ভেঙে যাবে নাকি টিকে থাকবে, এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। এই জোটে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তাদের সংকট কোথায়-এসব প্রশ্নও রয়েছে আলোচনায়।
যদিও জামায়াত নেতারা বলছেন, শেষমুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কিন্তু যখন অবিশ্বাস বা সন্দেহ তৈরি হয়, তখন সংকট গভীরে চলে গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
'ওয়ান বক্স পলিসি' অর্থাৎ ইসলামী দলগুলোর এক বাক্সে ভোট–– এই স্লোগান নিয়ে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামী দল আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করে যাত্রা শুরু করেছিল নয় মাস আগে।
নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনেও নেমেছিল ওই মোর্চা। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে আন্দোলন থেকে সরে এসে তারা তৎপর হয় আসন সমঝোতায়।
এরই মধ্যে সরাসরি ধর্মভিত্তিক দল নয়, এমন তিনটি দল আসন ভাগাভাগিতে যোগ দিলে মোর্চাটিকে ১১ দলের আসন সমঝোতার জোটে রূপ দেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়। তখন ইসলামী দলগুলোর এক বাক্সে ভোট–– এই স্লোগান সেভাবে সামনে আনা হয়নি।
অবশ্য ১১ দলের এই ঐক্য আসলে একটি জোট, নাকি আসন ভাগাভাগির একটি প্ল্যাটফর্ম, তাদের ভেতরেই এমন প্রশ্নও উঠেছে।
এখন সেই ১১ দলের আসন সমঝোতা নিয়েই বিভেদ বেড়েছে, সংকটে পড়েছে তাদের ঐক্য।

কেন এই বিভেদ, সংকট কোথায়
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিভেদের মূলে রয়েছে আসন বন্টন নিয়ে জামায়াতকে ঘিরে শরিকদের অসন্তোষ।
প্রথমে যে দলটি ইসলামী দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার স্লোগান দিয়েছিল, সেই ইসলামী আন্দোলন তাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এনেছে।
দলটির নেতারা বলছেন, ১১ দলের আসন ভাগাভাগিতে তাদের দাবি ছিল ১০০ আসন। ঐক্যের স্বার্থে তারা আগের দাবি থেকে সরে এসে অন্তত ৫০টি আসন চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ৪০টির বেশি আসনে ছাড় দিতে রাজি নয় জামায়াত।
এছাড়াও চরমোনাই ইউনিয়ন নিয়ে বরিশাল-৫ নির্বাচনী এলাকায় ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি। সেখানে প্রার্থী দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।
বরিশালের ওই আসনেও ছাড় না দিয়ে জামায়াত প্রার্থী রেখেছে। ফলে ক্ষুব্ধ হয়েছে ইসলামী আন্দোলন।
দলটির নেতারা বলছেন, আসন নিয়ে তাদের 'অপমান', 'অবহেলা' করা হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
আরেকটি দল মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি থেকে ২৫টি আসন চেয়েছে।
তাদের জামায়াত ছাড় দিয়েছে ১৩টি আসনে। ফলে এই খেলাফত মজলিসও অসন্তুষ্ট।
এই দুই দলই শুধু নয়, আমার বাংলাদেশ বা এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দলও অসন্তুষ্ট আসন ভাগাভাগি নিয়ে।
শেষপর্যন্ত প্রত্যাশিত আসনে ছাড় না পেলে ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের একাধিক নেতা। তাদের সঙ্গে আরো দু'একটি দল যেতে পারে।

বিভেদের পেছনে আসন ভাগাভাগিই একমাত্র কারণ?
শুরুতে ইসলামী দলগুলোর একটি ভোট বাক্সের স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ধর্মভিত্তিক সব দল তাতে সাড়া দেয়নি।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মোর্চাটিকে যেহেতু নির্বাচনী আসন সমঝোতার জোটে রূপ দেওয়া হচ্ছে, ফলে সেখানে বিভেদ বা সংকটের পেছনে আসন বন্টনের বিষয়টিই বড় কারণ।
তারা এ-ও উল্লেখ করছেন, ধর্ম ভিত্তিক দলগুলোর স্ব স্ব রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকেও তাদের নির্বাচনী জোটে সংকট বেড়েছে।
তবে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তাদের 'অবিশ্বাস', 'সন্দেহ' তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে ওই দলগুলো কিছু ঘটনাকেও উদাহরণ হিসেবে টেনে আনছেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের এককভাবে বৈঠককে মেনে নিতে পারেনি ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল।
যদিও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে গিয়ে জামায়াত নেতা সেই বৈঠকটি করেছিলেন। কিন্তু বৈঠকে জামায়াতের আমির নির্বাচনের পরে সরকার গঠনের আগে বিএনপি নেতার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছেন এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন। যা জামায়াতের সঙ্গে থাকা ইসলামী অন্য দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে ধারণা পাওয়া যায়।
এছাড়া সরাসরি ধর্মভিত্তিক দল নয়, যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং এবি পার্টিকে আসন সমঝোতায় শরিক করা হয়েছে।
এই তিনটি দলকে যুক্ত করা এবং আসন সমঝোতা করার ক্ষেত্রে জামায়াত তাদের মোর্চা বা জোটের অন্য দলগুলোর সঙ্গে সে ব্যাপারে কোনো আলোচনা করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঐক্যের কথা বললেও জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে তাদের দলীয় স্বার্থে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেটা জোটের অন্যদের ক্ষুব্ধ করছে বলে বলছেন ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নেতারা।
ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "জামায়াত একেবারে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করছে। জামায়াতই অন্য দলগুলোকে আসনে ছাড় দিচ্ছে, এমন একটা মনোভাব তাদের"।
মি. রহমান এটাও বলেন, "আসন সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে যেসব আসনে, সেগুলোতেই জামায়াত তাদের প্রার্থী রেখে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা আসলে অন্য দলগুলোকে অবহেলা করছে, অপমান করছে"।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাদেরও একই রকম অভিযোগ রয়েছে। তাদেরও অবিশ্বাস, সন্দেহ তৈরি হয়েছে জামায়াতকে নিয়ে।
অবশ্য জামায়াতের নেতারা এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াসহ শরিকদের বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করছেন।

ছবির উৎস, MD. MOKHLESUR RAHMAN
সংকট কতটা গভীরে
আসন ভাগাভাগিতে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে জোটের অন্য দলগুলোর অসন্তোষ রয়েছে।
জোটের কোনো কোনো দল মনে করছে, একদিকে আসন সমঝোতায় অস্পষ্টতা রয়েছে, অন্যদিকে ঐক্যের রাজনৈতিক কোনো নীতিমালা ঠিক করা হয়নি।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিবিসি বাংলাকে বলেন, ১১ দলের আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো বেশ কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমঝোতার সুনির্দিষ্ট একটি 'রাজনৈতিক স্মারক' নির্ধারণ করা দরকার ছিল, যা এখনো হয়নি।
তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, দলগুলোর একত্রে এখন পর্যন্ত কোনো বৈঠকও হয়নি। আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থান, সমর্থন ও নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতার পাশাপাশি সংসদে দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল। সেক্ষেত্রেও দলগুলোর অসন্তোষ রয়ে গেছে।
জামায়াতকে নিয়ে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের সন্দেহ, আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে সংকটটা গভীর বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তারা বলছেন, ধর্মীয় নেতা বা পীর কেন্দ্রিক দল এবং কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে অতীতে জামায়াতের তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না।
এই দলগুলোর সম্পর্কের পরিবর্তন দেখা যায় জুলাই গণ-অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর। জামায়াত ও অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোও তৎপর হয়েছিল তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করতে।
সেই তৎপরতার প্রেক্ষাপটেই আসন সমঝোতার ১১ দলীয় জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ধর্ম বিষয়ে লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, আকিদা এবং ধর্মীয় তাত্ত্বিক অনেক বিষয়ে ওই দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য আছে। এরপরও তাদের ঐক্যের চেষ্টা ছিল।
তবে এখন আসলে ঐক্য গভীর সংকটে পড়েছে বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

সমঝোতা ভেঙে যাবে নাকি টিকে যাবে
১১দলের আসন সমঝোতার জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের দুই অংশই বেশ তৎপর রয়েছে।
দুদিন ধরে দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিবিসিকে বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলমান।
আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবে এবং তাদের ঐক্য বহাল থাকবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০শে জানুয়ারি।
এই সময়ের আগেই সব দল ও জোটকে তাদের আসন ভাগাভাগি বা সমঝোতার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বিবিসিকে বলেছেন, তারা ১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতার জোট টিকিয়ে রাখতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। দু'একদিনের মধ্যেই সমাধান হবে বলে তারা আশা করছেন।
দলটির মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদও একই মন্তব্য করেছেন।
তবে ওই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই দিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন। এরই মধ্যে তারা তাদের সারা দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেছে।
দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বিবিসিকে জানান, তাদের সারাদেশের নেতা-কর্মীরা জামায়াতের কাছে অপমান, অবহেলার শিকার হচ্ছেন। ফলে তাদের তৃণমূল ক্ষুব্ধ।
ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, "আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় তো আমরা আছি। এখানে কেউ যদি আমাদের প্রতি কোনো অবিচার করে বা কেউ যদি অসম্মান করে, অবহেলা করে তাহলে সেটাকে আমরা স্বাভাবিকভাবে তো নিতে পারি না। আত্মসম্মানবোধ তো সবারই আছে। তাই না?"
এই বক্তব্যে ভিন্ন চিন্তার ইঙ্গিত আছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
শেষপর্যন্ত ১১ দলের ঐক্য টিকবে কি না, তা দু'একদিনের মধ্যে স্পষ্ট হবে বলে বলা হচ্ছে।
বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, এই জোট টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা আছে। তবে অবিশ্বাস, সন্দেহ তৈরি হয়েছে; একটা ফাটল ধরেছে। যদি জোট টিকে যায়, এরপরও ঐক্যে আন্তরিকতা ও আস্থা কতটা থাকবে সেই সন্দেহ রয়েছে।








