মোস্তাফিজ ইস্যু, বাংলাদেশ-ভারতের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ছায়া যখন ক্রিকেটে

ছবির উৎস, BCB/Reuters
- Author, নাগিব বাহার
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটের দর্শক-সমর্থকদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাদা ছোড়াছুড়ি বা অপরপক্ষকে হেয় করে ট্রল করার সংস্কৃতি চলে আসছে বহু বছর ধরেই। কিন্তু সম্প্রতি মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের দল থেকে বাদ দেওয়া ও তার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ক্রিকেটে দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা যেন আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
গত দেড় বছরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, দূতাবাসের নিরাপত্তার মত নানা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কেও যথেষ্ট অবনতি হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই কয়েক দফায় অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে কোনো বিষয়ে নিন্দা জানাতে বা চলমান কোনো ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাতে। দুই দেশের অনেক রাজনীতিবিদও বিভিন্ন সময়ে মাঠ গরম রাখতে অন্য দেশকে হেয় করে বক্তব্য দিয়েছেন।
সম্পর্কের এই তিক্ততাটা এতোদিন সোশ্যাল মিডিয়ার 'টাগ অব ওয়ার' বা কূটনৈতিক বিবৃতি প্রদানের মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এবার সেই রেষারেষিটা সরাসরি ক্রিকেটের ওপর পড়লো।
আর ক্রিকেট ঘিরে দুই দেশের এই দফার বিরোধটা যে বাংলাদেশ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুতরভাবে নিচ্ছে, তা বোঝা যায় বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত থেকে। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে আইপিএল'এর ম্যাচ দেখানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে সোমবার নির্দেশনা জারি করেছে তারা।
সম্পর্কের তিক্ততার জের ধরে ক্রিকেটীয় কূটনীতি আর সম্পর্কে প্রভাব পড়ার নজির এতোদিন ছিল ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে হওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ভারত আর বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কও এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছালো, যা আবার কবে স্বাভাবিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তে দুই দেশের সমালোচনা
মোস্তাফিজুর রহমানকে কোলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেয়ার ঘটনায় ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেকে যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশ তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে নিতে আইসিসিকে চিঠি দেওয়ায় বাংলাদেশের ভারত বিরোধী মনোভাবের মানুষও নিশ্চিতভাবেই স্বস্তি পাচ্ছেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন যে 'বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনা আমি দিয়েছি।'
তিনি ঐ স্ট্যাটাসের শেষ লাইনে লিখেছেন 'গোলামির দিন শেষ।'
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ইস্যুতে দুই দেশের নেওয়া পদক্ষেপেই ক্রিকেটীয় কূটনীতিকে প্রাধান্য না দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনার সমালোচনা করেছেন ভারতের সাংসদসহ ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
কংগ্রেস এমপি শশী ঠারুর মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার কড়া সমালোচনা করে ঐ সিদ্ধান্তকে 'অপরিণামদর্শী' হিসেবে মন্তব্য করেছেন সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।
'সোশ্যাল মিডিয়ার আক্রোশের' ভিত্তিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া 'উদ্বেগজনক' বলে মন্তব্য করেন মি. ঠারুর।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক প্রশাসক ও লেখক রামাচন্দ্র গুহাও এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন যে এটি 'মারাত্মক অবিবেচক' সিদ্ধান্ত। ভারতের 'জাতীয় স্বার্থেই বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উচিৎ' বলে পোস্টে মন্তব্য করেছেন তিনি।
একইভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার মত সিদ্ধান্ত অনেকটাই 'অতিরিক্ত হার্ডলাইন অ্যাপ্রোচ' হয়েছে বলে মনে করেন ক্রিকেটের সাথে জড়িত অনেকে।

ছবির উৎস, Getty Images
বেসরকারি টিভি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের ক্রীড়া সম্পাদক তাহমিদ অমিত বলছিলেন যে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলাদেশে ক্রিকেটীয় কূটনীতি অনুসারে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া, বিসিসিআইয়ের কাছে নিন্দা জানানো বা আইসিসিতে অভিযোগ জানানোর মত সিদ্ধান্ত নিতে পারতো।
"তারা (বিসিবি) আইসিসিকে বলতে পারতো নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে, তারপর সেগুলো যাচাই করে সন্তুষ্ট না হলে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। এতোটা কঠোর সিদ্ধান্ত শুরুতে না নিলেও পারতো", বলছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপের মত আইসিসি ইভেন্টে খেলতে না চাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি ক্রিকেটীয় স্বার্থের চেয়ে 'রাজনৈতিক বিবেচনা'কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
"রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সরকারের কঠোর অবস্থানের জন্য বিসিবি একপ্রকার বাধ্যই হয়েছে বলা যায় এই সিদ্ধান্ত নিতে। বিসিবি'র অনেক পরিচালকই রাজি ছিলেন না এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, কারণ বিসিবি জানে এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ক্ষতি কত বড়।"
আইসিসি থেকে পাওয়া অর্থের পাশাপাশি বিসিবি'র আয়ের একটা বড় অংশ আসে দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। এমন পরিস্থিতিতে এ বছরের অগাস্টে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারতের সাথে বাংলাদেশের সিরিজ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে এবং তার জন্য বিপুল পরিমাণ জরিমানা গুণতে হতে পারে বিসিবির।
তবে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে রাখা ও পরবর্তীতে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে বিসিসিআই কেন এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে ভারতীয় সমালোচকদের মতো বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরাও ধোঁয়াশাতেই রয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ১৯তম আসরের জন্য কোলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি বিশ লাখ রুপিতে দলে নেয় বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে। ঐ নিলাম অনুষ্ঠানটি হয় আবুধাবিতে, ১৬ই ডিসেম্বর।
ঐ ঘটনার পর থেকেই ভারতের কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন মোস্তাফিজকে দলে নেয়ার প্রতিবাদে বোলকাতা নাইট রাইডার্স ও দলটির একাংশের স্বত্ত্বাধিকারী শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন শুরু করে। তাদের বক্তব্য ছিল যে কেকেআর ভারতীয়দের আবেগের বিরুদ্ধে গিয়ে 'বাংলাদেশি' খেলোয়াড়কে দলে নিয়েছে।
তাদের এমন অভিযোগের কারণ - বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সম্প্রতি দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশন অভিমুখে পদযাত্রা সহ বেশ কয়েকদফা প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেছে। যে কারণে বাংলাদেশি খেলোয়াড় দল নেয়াকে ভারতীয়দের আবেগের বিরুদ্ধে যাওয়া বলে আখ্যায়িত করেছে তারা।
এর ধারাবাহিকতায় তেসরা জানুয়ারি ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড, বিসিসিআই জানায় যে তারা কোলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশনা দিয়েছে যেন মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়।
বিসিসিআই সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া তার বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করলেও উল্লেখ করেন যে 'সাম্প্রতিক সময়ে হতে থাকা ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে' বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোলকাতা নাইট রাইডার্সও সেদিনই জানায় যে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বিসিবি, এই ইস্যু নিয়ে পরের ২৪ ঘন্টায় দুই দফায় বোর্ড মিটিং করে।
রবিবার বিসিবি তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিবৃতি দেয় যে বাংলাদেশ দল আসন্ন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলতে ভারতে দল পাঠাবে না। বিবৃতিতে জানানো হয় যে, বাংলাদেশের ম্যাচ যেন ভারতের বাইরে অন্য কোনো ভেন্যুতে নেয়া হয় সে লক্ষ্যে আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও করেছে বিসিবি।
বিসিবি'র বিবৃতিতে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশ দলের 'নিরাপত্তা' নিয়ে শঙ্কার বিষয়টিকে, যদিও মোস্তাফিজুর রহমানকে নিরাপত্তা ইস্যুতে আইপিএলের দল থেকে বাদ দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল কিনা, তা উল্লেখ করা হয়নি।
ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো'র খবর অনুযায়ী, বিসিবি এর মধ্যে বিসিসিআইকে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে যে আইপিএলের নিলামের জন্য মোস্তাফিজকে চেয়ে চিঠি দেয়ার পরও কেন তাকে অব্যাহতি দেয়া হলো।
তবে ক্রিকইনফো তাদের খবরে বলছে, এই চিঠিতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি উল্লেখ করেনি বিসিবি।

ছবির উৎস, PROTHOM ALO
দুই দেশের মানুষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী যে চাপা বিদ্বেষ ছিল তা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে ২০২৪'এর পাঁচই অগাস্টের পর থেকে।
গত দেড় বছরের মধ্যে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি হলেও দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে এতোদিন তার সরাসরি প্রভাব পড়েনি।
যদিও ২০১৫ বিশ্বকাপের ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের পর থেকেই দুই দেশের ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে মাঠের বাইরের লড়াইয়ের তীব্রতাটা দিন দিন শুধু বেড়েছেই। সেই লড়াই যে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল বা মিমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়।
অনেক সময়ই মূলধারার গণমাধ্যম অন্য দেশের ক্রিকেট টিমকে হেয় করে বানিয়েছে 'মওকা মওকা' জাতীয় টিভি বিজ্ঞাপণ বা পত্রিকায় ছাপিয়েছে 'মুস্তাফিজ কাটার' এর মতো আপত্তিকর গ্রাফিক্স।
তবে এতোদিন কিছুটা ইঙ্গিতপূর্ণভাবে অন্য দেশের ক্রিকেটের সমালোচনা হলেও দুই বোর্ডের এবারের সিদ্ধান্তের পর হয়তো ক্রিকেটীয় বিবেচনাকে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেই প্রাধান্য দেবেন ভক্ত সমর্থকরা।








