ইমরুল কায়েস: সমর্থকদের বিদ্রুপ আর জাতীয় দলে 'অবহেলা' কীভাবে সামাল দেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
২০১৯ সালের পর থেকে জাতীয় দলে ডাক পাননি, তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ- ২০২২ শিরোপা জয়ের পর আবারও আলোচনায় এসেছেন ইমরুল কায়েস।
যদিও সোশাল মিডিয়ায় বরাবরই আলোচনায় থাকেন তিনি- তবে সেটিও অন্য ক্রিকেটারদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন কারণে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিছু অনুসারী অনেক সময়ই ইমরুল কায়েসকে নিয়ে হাসিঠাট্টায় মাতেন, জার্সি নাম্বার থেকে শুরু করে ইমরুল কায়েসের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে নানা ধরনের ট্রল, মিম ও সোশাল মিডিয়া কন্টেন্ট দেখা যায়।
জাতীয় দলের বাইরে থাকার পরও তাকে নিয়ে এই আলোচনা কেন?
প্রমিথ রায়হান প্রায় নব্বইয়ের দশক থেকে ক্রিকেটের নিয়মিত দর্শক, তার মতে ইমরুল কায়েসের চলন-বলন তারকাদের মতোন নয়, এটা তার পাবলিক ইমেজের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
মি. রায়হান মনে করেন, ইমরুল কায়েস যদি তারকাদের মতোন অ্যাপ্রোচে নিয়ে চলতেন সেক্ষেত্রে তার পারফরম্যান্স আরও গুরুত্ব পেত।
ইমরুল কায়েসকে নিয়ে বিবিসি বাংলায় কিছু প্রতিবেদন যা আপনারা পড়তে পারেন-
অনেকে হয়তো স্রেফ মজা করার উদ্দেশ্যেই সোশাল মিডিয়ায় এসব কন্টেন্ট তৈরি করেন, তবে এর দ্বারা মানসিকভাবে ক্রিকেটাররাও প্রভাবিত হতে পারেন।
ইমরুল কায়েস ২০২১ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি নিজে এসব দেখেন না, কিন্তু কখনো কখনো পরিবারের সদস্যদের বিব্রত করে এসব অনাকাঙ্খিত মজা।
তবে ইমরুল কায়েস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব একটা থাকেন না বলেই জানিয়েছেন, তার মতে, খেলা নিয়ে কে কী বলছে সেটা নিয়ে খুব একটা চিন্তার কিছু নেই।
"দেখেন বাংলাদেশে ভালো খেললে অনেককে মুহুর্তেই অনেক ওপরে তুলে দেয়া হয়, আবার খারাপ খেললে একেবারে তুলোধনা করা হয়। এটা রেগুলার।"
ইমরুল কায়েস বলেছেন, মাঠের বাইরে কী হয় তার চেয়ে মাঠের বিষয়ে থাকাই ভালো।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয় শিরোপা জয় ইমরুল কায়েসের
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এবারের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগটা আমার জন্য অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা। বড় বড় টিমের ক্রিকেটার। ড্রেসিংরুম শেয়ার করা মাঠে ওদের সাথে খেলা, আমি যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছি মাঠে, সেটা ওরা মেনে নিয়েছে।"
ফ্যাফ ডু প্লেসি, মইন আলী, সুনীল নারিনের মতো টি টোয়েন্টি ক্রিকেটাররা ইমরুল কায়েসের অধীনে খেলেছেন এবারের বিপিএলে।
এবারের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ইমরুল কায়েস একটা ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছেন ব্যাটসম্যান হিসেবে যেখানে তিনি কখনো মিডল অর্ডারে কখনো বা টপ অর্ডারে ব্যাট করেছেন।
ইমরুল কায়েস বলেছেন, দলে যেহেতু টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের উপযোগী আরও ব্যাটসম্যান ছিলেন তাই দলের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাট করেছেন তিনি।
যখন প্রয়োজন হয়েছে তখন নিজের ব্যাটিং স্টাইলের বাইরে এসে মেরে ব্যাট করেছেন তিনি, সিলেট সানরাইজার্সের বিপক্ষে একটি ম্যাচে ৮ বলে ১৬ রানের একটি ইনিংস খেলেন।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১৮তম ম্যাচে, মিরপুরে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের বিপক্ষে ১৪৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কুমিল্লা ৯ উইকেটের জয় পায়, এই ম্যাচে ৬২ বলে ৮১ রান তোলেন ইমরুল, ৫ টি ছক্কা হাঁকান তিনি।
"আমি সাধারণত এক থেকে তিনে খেলি, এবারের বিপিএলে এমনও হয়েছে আমি খেলেছি পাঁচে।"
তিনি বলেছেন, এতে নিজের পারফরম্যান্সে কিছুটা হলেও ক্ষতি হয়, কিন্ত দল এবং কোচও মনে করেছেন যাতে দলের সুবিধা হয় সেটাই আসল ব্যাপার।

ছবির উৎস, Getty Images
জাতীয় দলের কথা ভাবেন ইমরুল কায়েস?
২০১৯ সালে ভারতের বিপক্ষে কলকাতায় শেষবার একটি টেস্ট ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন ইমরুল কায়েস, এরপর আর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার সুযোগ পাননি তিনি।
ইমরুল কায়েস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি আর এসব ভাবি না। যদি ভালো খেলি সুযোগ পাবো, না হলে ডাক পাবো না।"
জাতীয় দল নিয়ে কোনও আফসোস নেই বলে আসছেন তিনি দীর্ঘদিন, তবে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাবেন এও জানিয়ে রেখেছেন।
সামনে বাংলা টাইগার্সের হয়ে চারদিনের ক্রিকেটের ক্যাম্পের সাথে থাকবেন তিনি।
ইমরুল কায়েস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে যেসব দলে ডাক পাবেন সেসব জায়গায় মনোনিবেশ করবেন তিনি।
এর আগে ২০১৯ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে জায়গা হারান ইমরুল কায়েস, তখন থেকেই জাতীয় দল থেকে অনেকটাই দূরে তিনি।
ইমরুল কায়েসকে নিয়ে তখন বাংলাদেশের ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোচ, নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেছিলেন, যখন একজন ক্রিকেটার জানেন যে অন্যদের মতো পারফর্ম করলে দলে সুযোগ মিলবে না, অন্যদের চেয়ে ভালো করতে হবে সেটা একটা মানসিক চাপ।
"একেকজনের মানসিকতা একেক রকম, ওকে যে সবাই একটু হলেও অবহেলা করে সেটা যদি জেদ হিসেবে কাজ করতো তাহলে কিন্তু ভালো হতো, যেটা হয় ওকে অবহেলা করলে ইমরুল আরো মানসিকভাবে নেতিবাচক অবস্থানে চলে যায়," বলছিলেন মি: ফাহিম।
জাতীয় দলের বিবেচনায় খানিকটা ইমরুল কায়েস খানিকটা অবহেলিত বলেই মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের হয়ে ইমরুল কায়েসের শেষ খেলা পাঁচটি ওয়ানডে ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি আছে, দশ ম্যাচের হিসেব করলে আরও দুটি অর্ধশতক, যার একটি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পার্লে।
নির্বাচকরা যদি ভালোভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করে সাথে থাকতেন তাহলে ইমরুল কায়েস অনেক ভালো করতে পারতো বলে মনে করেন নাজমুল আবেদীন ফাহিম।

ছবির উৎস, Hagen Hopkins
পঞ্চপান্ডবের কেউ নেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের
কমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক নাফিসা কামাল, কাপ পাওয়ার পরপরই বলেছেন, "আপনাদের কথিত পান্ডব ছাড়াই তো আমরা কাপ জিতেছি।"
শিরোপা জয়ের পর একটা মুচকি হাসি দিয়ে এই কথা বলেছেন।
নাফিসা কামাল বলেন, যদি সুযোগ থাকে তিনি ইমরুল কায়েসকে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে চান তিনি।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের আলোচিত পাঁচজন ক্রিকেটার- মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও সাকিব আল হাসান- এই পাঁচজন ক্রিকেটারের মধ্যে কেউই ছিলেন না ইমরুল কায়েসের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে।

ছবির উৎস, Bangladesh Cricket Board
তামিম, মাশরাফী ও রিয়াদ এক দলেই খেলেছেন এবং তাদের দল মিনিস্টার ঢাকা প্রথম পর্বে বাদ পড়েছে, ছয় দলের টুর্নামেন্টে ঢাকা হয়েছে পঞ্চম।
ইমরুল কায়েস অবশ্য এটাকে বড় করে দেখছেন না। তার মতে, 'পঞ্চপান্ডব তো বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কম দেয় নাই'।
"এখন দেখেন একটা পরিবর্তন তো আসবেই, একটা সময় পার হয়েছে এখন তরুণ যারা আসছে তারাও নিজেরে প্রমাণের জায়গা পাবে নতুন করে, ব্যাপারটা এমন না যে তারা হেরেছে, ব্যাপারটাকে আমি এভাবে দেখি যে অন্যরাও জিততে পারে এই ভাবনাটা থেকে অনেকে অনুপ্রাণিত হবে, বিশেষত নতুন ক্রিকেটাররা।"
তবে দলের মালিক নাফিসা কামালের কথা প্রসঙ্গে ইমরুল কায়েস বলেন, "কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে এ নিয়ে পাঁচবার খেলেছি। ওরা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং আমি সেটা পালন করতে পারছি এটা একটা বড় ব্যাপার।"








