তাবলীগের বিদেশি সদস্যরা কেন এখনও ভারতে? কেন্দ্রের কৈফিয়ত চায় সুপ্রিম কোর্ট

দিল্লির মারকাজ নিজামুদ্দিন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাবলিগ সদস্যদের। ৩০শে মার্চ, ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির মারকাজ নিজামুদ্দিন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাবলিগ সদস্যদের। ৩০শে মার্চ, ২০২০
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

তাবলীগ জামাতের সদস্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিদেশি নাগরিক কেন এখনও ভারতে আটকা পড়ে আছেন, কেন্দ্রকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে বলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আজ মন্তব্য করেছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকশো বাংলাদেশিও আছেন।

তাবলীগ জামাতের বিদেশি সদস্যদের 'কালো তালিকাভুক্ত' করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩৪জন বিদেশি নাগরিক ভারতের শীর্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন, তাদের আবেদনের শুনানিতেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা আজ এ মন্তব্য করেন।

মূল মামলাটি অবশ্য আগামী ২রা জুলাই পর্যন্ত মুলতুবি করা হয়েছে, কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এখনও বিদেশি তাবলীগ সদস্যদের আবেদনের প্রতিলিপিই পৌঁছয়নি।

এর আগে গত ২রা এপ্রিল ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ৯৬০জন বিদেশি তাবলীগ সদস্যকে দশ বছরের জন্য 'ব্ল্যাক লিস্টেড' (কালো তালিকাভুক্ত) করার কথা জানায়। ৪ঠা জুন সেই তালিকায় যোগ করা হয় আরও ২৫০০ জনকে।

এই কালো তালিকাভুক্ত করার অর্থ হল আগামী দশ বছরের জন্য তারা ভারতে আসার ভিসা পাবেন না।

এই বিদেশি নাগরিকরা অনেকেই মার্চ মাসে দিল্লিতে তাবলীগের সদর দফতর মারকাজ নিজামুদ্দিনে এক ধর্মীয় সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন, যাকে পরে সরকার করোনাভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে।

এরপরই তাবলীগ জামাতের বিরুদ্ধে ভারতে ইসলামোফোবিয়ার ঝড় বয়ে যায়, সারা দেশ জুড়ে বিদেশি তাবলীগ সদস্যদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হতে থাকে।

পর্যটক ভিসায় ভারতে ঢুকে ধর্মীয় কর্মকান্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের মতো কোনও কোনও কোনও রাজ্য বিদেশি তাবলীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে এফআইআর-ও জারি করে।

'পাসপোর্ট জব্দ, ফিরতে পারছি না নিজের দেশেও'

এখন তাবলীগের এমনই ৩৪ জন বিদেশি সদস্য – যারা ৩৪টি বিভিন্ন দেশের নাগরিক – তারা সম্মিলিতভাবে ভারত সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেছেন। মূল আবেদনটি করেছেন ফরাসি নাগরিক, মওলানা আল হাদরামি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

দিল্লিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভবন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভবন

ওই আবেদনে বলা হয়েছে, যেভাবে বিদেশি নাগরিকদের বক্তব্য না-শুনেই ভারত সরকার 'একতরফাভাবে' এই 'ব্ল্যাক লিস্ট' করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সংবিধানের আর্টিকল ২১-র পরিপন্থী।

মওলানা আল হাদরামি তাদের আবেদনে আরও জানিয়েছেন, ভারত সরকার তাদের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে রাখায় এই শত শত বিদেশি এখন দেশেও ফিরতে পারছেন না।

অন্য আবেদনকারীদের মতো মওলানা আল হাদরামিকেও মার্চের শেষে একটি কোয়ারেন্টিন সেন্টারে আটক রাখা হয়। প্রায় দুমাস পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হলেও যেহেতু তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না – তাই এখনও তিনি দিল্লির ওই সেন্টারেই থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

আবেদনকারীদের মধ্যে একজন থাই মহিলাও আছেন – যিনি আবার সাত মাসের গর্ভবতী। তার অবস্থাও অবিকল একই রকম – তিনিও আজ পর্যন্ত কোয়ারেন্টিন সেন্টারেই থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

থাইল্যান্ডে ফিরে গিয়ে তিনি যাতে নিজের দেশে নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে সন্তানের জন্ম দিতে পারেন, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের কাছে সেই আর্জিও জানিয়েছেন ওই মহিলা।

সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চের তিনজন বিচারপতি – এ এম খানউইলকর, দীনেশ মাহেশ্বরী ও সঞ্জীব খান্নার এজলাসে আজ সোমবার সকালে এই মামলার শুনানি শুরু হয়।

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

শুধু প্রেস বিবৃতি, জারি হয়নি কোনও আদেশ

শুনানির শুরুতেই বেঞ্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের একটি প্রতিলিপি দেখতে চান। যখন জানা যায়, এ ব্যাপারে সরকার এখনও পর্যন্ত শুধু প্রেস বিবৃতিই দিয়েছে – কিন্তু কোনও নির্দেশ জারি করেনি, বিচারপতিরা রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেন।

কলকাতায় এই হজ সেন্টার কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে এখনও আছেন বহু বিদেশি তাবলিগ সদস্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতায় এই হজ সেন্টার কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে এখনও আছেন বহু বিদেশি তাবলিগ সদস্য

আবেদনকারীদের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী সি ইউ সিং বলেন, "সরকার এই বিদেশি নাগরিকদের ঢালাওভাবে কালো তালিকাভুক্ত করলেও তাদের কাউকে ব্যক্তিগতভাবে কিন্তু কোনও নোটিশ ধরায়নি। তাদের ভিসা বাতিল করে কোনও নির্দেশও জারি হয়নি।"

"অথচ তাদের সবার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে নেওয়ার ফলে তারা নিজের দেশেও ফিরতে পারছেন না!"

আইনজীবী রজত নায়ার শুনানিতে কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করেন। তিনি বেঞ্চকে জানান, আবেদনের কোনও প্রতিলিপি সরকারের হাতে এখনও আসেনি – তাছাড়া সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও এদিন অন্য একটি মামলায় ব্যস্ত আছেন।

এরপরই সুপ্রিম কোর্ট শুনানি ২রা জুলাই পর্যন্ত মুলতুবি করার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে সেই সঙ্গেই বিচারপতিরা বলেন, "এই বিদেশি নাগরিকরা কেন এখনও ভারতে রয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারকে আমাদের কাছে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।"

"তাদের ভিসা যদি বাতিল না-করা হয়ে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র সেই কারণেই এই আবেদন খারিজ করা যেতে পারে", মন্তব্য করেন তারা।

এই মামলার রায়ের ওপরেই এখন নির্ভর করছে ভারতে আটকে পড়া শত শত বাংলাদেশি-সহ বিদেশি তাবলীগ সদস্য কবে নিজের দেশে ফিরতে পারবেন – এবং আগামী এক দশকে তারা আদৌ কখনও আর ভারতে আসতে পারবেন কি না!