করোনা ভাইরাস: পশ্চিমবঙ্গ সরকার আইন ভেঙে বাংলাদেশি তাবলীগ সদস্যদের সীমান্ত পার করাতে চেয়েছিল: অভিযোগ রাজ্যপালের

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। ফাইল ফটো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। ফাইল ফটো
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারতে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের লুক-আউট নোটিশ উপেক্ষা করে জনাকুড়ি বাংলাদেশি নাগরিক তথা তাবলীগ জামাত সদস্যকে নীরবে ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল ওই রাজ্যের সরকার।

'দ্য ইকোনমিক টাইমস' পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. ধনকড় আরও বলেছেন, রাজ্য সরকারের একটি কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে এই বিদেশি তাবলীগ সদস্যদের বাসে করে হরিদাসপুর (পেট্রাপোল) চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল – কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলি তাদের আটকে দেয়।

সাংবিধানিকভাবে ভারতে প্রতিটি রাজ্যের রাজ্যপাল সেখানকার নির্বাহী প্রধান এবং দেশের রাষ্ট্রপতিই তাকে মনোনয়ন দেন। তবে সাধারণত দেশের ক্ষমতাসীন শাসক দলের প্রবীণ নেতা বা অনুগত সাবেক আমলারাই এই পদে নিয়োগ পেয়ে থাকেন।

জগদীপ ধনকড়ও এর ব্যতিক্রম নন। সুপ্রিম কোর্টের এই বর্ষীয়ান আইনজীবী রাজ্যপাল হওয়ার আগে বিজেপির সক্রিয় সদস্য ছিলেন – এর আগে তিনি একজন লোকসভা এমপি এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

গত বছরের মাঝামাঝি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের সঙ্গে তার সংঘাত চরমে ওঠে।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সরকার যেভাবে কোভিড-১৯ সঙ্কট সামলাচ্ছে, তিনি বারবার প্রকাশ্যে তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশি তাবলীগ সদস্যদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টাকে ঘিরে তিনি এখন যে অভিযোগ এনেছেন, তা রীতিমতো মারাত্মক।

যেভাবে কাঠগড়ায় বিদেশি তাবলীগিরা

মার্চের মাঝামাঝি দিল্লিতে তাবলীগ জামাতের সদর দফতর মারকাজ নিজামুদ্দিনে আয়োজিত ধর্মীয় সমাবেশে যে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি সদস্য যোগ দিয়েছিলেন, সেটিকে ভারত ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কলকাতার রাজারহাটে এই কোয়ারেন্টিন সেন্টারেই ছিলেন ওই বাংলাদেশি তাবলীগ সদস্যরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতার রাজারহাটে এই কোয়ারেন্টিন সেন্টারেই ছিলেন ওই বাংলাদেশি তাবলীগ সদস্যরা

ওই সমাবেশের পর তাবলীগের অনেক সদস্যই ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন – যার মধ্যে অনেক বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। এদের খুঁজে বের করার জন্য দেশের নানা প্রান্তেই ব্যাপক অভিযান চালানো হয়, বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র জারি করে লুক আউট নোটিশ।

উত্তরপ্রদেশ সরকার এরকম বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি তাবলীগ সদস্যের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইনে মামলাও রুজু করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পর্যটক ভিসা নিয়ে ভারতে ঢুকে তারা বেআইনিভাবে ধর্মীয় কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছেন, ধর্মীয় প্রচারণাও চালিয়েছেন।

যে বাংলাদেশি তাবলীগ সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গে এসে ধরা পড়েছিলেন, তাদের রাখা হয়েছিল কলকাতার কাছে নিউটাউন এলাকার একটি কোয়ারেন্টিন সেন্টারে। রাজ্যপালের অভিযোগ, এরকম অন্তত ১৯জন বাংলাদেশি নাগরিককেই ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করেছিল রাজ্য সরকার।

ঘটনার যে বিবরণ দিচ্ছেন রাজ্যপাল

মি ধনকড় বলেছেন, "আমি খবর পেয়েছি দিনকয়েক আগে মদিনাত-আল-হাজ্জাজ নামে রাজ্যের ওই কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে বাসে করে তাদের হরিদাসপুর সীমান্তের চেকপোস্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারেন।"

"কিন্তু সীমান্ত চেকপোস্টে তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায় এদের সবার নামেই কেন্দ্রের জারি করা লুক-আউট নোটিশ আছে, অর্থাৎ আইনের চোখে এরা ফেরার। তখন ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন ওই বিদেশি নাগরিকদের আটকে দেয়।"

রাজ্য সরকারের তরফে এখানে একটি অত্যন্ত "গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ঘটনা" ঘটেছে বলেও মি ধনকড় মন্তব্য করেছেন।

দিল্লিতে তাবলীগ জামাতের ওই বিতর্কিত সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন বহু বাংলাদেশি নাগরিকও

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে তাবলীগ জামাতের ওই বিতর্কিত সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন বহু বাংলাদেশি নাগরিকও

রাজ্যপাল পুরো বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অভিযোগ জানানোর দিল্লিতে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে বিবিসি জানতে পেরেছে।

কী করে লুক-আউট নোটিশ থাকা সত্ত্বেও এতজন বিদেশি নাগরিককে রাজ্য সরকার সীমান্ত পেরোনোর জন্য পাঠিয়ে দিল, মূলত সেটাই তারা তদন্ত করে দেখছেন।

রাজ্য সরকারের বক্তব্য

পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও নেতা-মন্ত্রী রাজ্যপালের তোলা এই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে এখনও কোনও মন্তব্য করেননি।

তবে পশ্চিমবঙ্গের একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী বিবিসি বাংলাকে এদিন বলেছেন, "রাজ্যপালের এই অভিযোগের ব্যাপারে উপযুক্ত পর্যায় থেকেই ঠিক সময়ে জবাব দেওয়া হবে।"

"তবে আমি এটুকু বলতে পারি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন থেকে আমাদের সরকার যখন কাউকে ছেড়ে দিচ্ছে তখন যাবতীয় নিয়মকানুন মেনেই সেটা করা হচ্ছে।"

গত মার্চের শেষে দিল্লির তাবলীগ জামাত সমাবেশকে যখন দেশের প্রধানতম 'করোনা হটস্পট' হিসেবে অভিহিত করা হয়, তার পর থেকেই সারা দেশে ইসলামোফোবিয়ার ঝড় উঠেছিল।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য তাবলিগ সদস্যরা সত্যিই কতটা দায়ী, তা নিয়ে ভারতে বিতর্কও কম হয়নি।

এই পটভূমিতে বেশ কয়েকজন বিদেশি তাবলীগ সদস্যকে সন্তর্পণে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টার অভিযোগকে ঘিরে যে আবার হইচই শুরু হবে, তা বলাই বাহুল্য।