ঘূর্ণিঝড় বুলবুল: সাইক্লোনের সতর্কসংকেতে কি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন

ছবির উৎস, STR
- Author, মুন্নী আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে সবশেষ ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল' আঘাত হানার আগে ১০ নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করা সত্বেও বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী ছিল।
অথচ ১০ নম্বর হলো 'মহাবিপদ সংকেত', এর অর্থ হচ্ছে যে যেখানে যেভাবে আছেন, সে সেই অবস্থায় তৎক্ষণাৎ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটুন অথবা নিরাপদ কোন পাকা ভবনের অভ্যন্তরে অবস্থান নিন।
কিন্তু এমন একটি সতর্ক সংকেত সত্বেও উপকূলীয় এলাকার বহু মানুষেই নাকি পুলিশের সহায়তায় জোরপূর্বক আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়েছে।
বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়কে সাইক্লোন বলা হলেও আটলান্টিক এলাকায় উদ্ভূত দুর্যোগগুলোকে হারিকেন বলা হয়।
এই হারিকেনগুলোর সম্পর্কে যখন আগাম সতর্কতা দেয়ার প্রশ্ন আসে, তখন সেগুলোকে ভাগ করা হয় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে। অর্থাৎ এগুলো কতটা শক্তি নিয়ে আঘাত করবে স্থলে তার উপর নির্ভর করবে এর ক্যাটাগরি বা মাত্রা।
আরো পড়ুন:
যেমন ২০০৫ সালে আমেরিকায় আছড়ে পড়া সামুদ্রিক ঝড় 'ক্যাটরিনা' ছিলো একটি ৫ মাত্রার সুপার হারিকেন। এটির ধ্বংসযজ্ঞ ছিলো ব্যাপক। আমেরিকার মতো দেশটিতে হারিকেনটি ১২শ মানুষের প্রাণহানীর কারণ হয়েছিলো।
কিন্তু বাংলাদেশে দুর্যোগের আগে যে সতর্কসংকেত জারি করা হয়, তার প্রায় সবগুলোই হয় বন্দরকেন্দ্রিক। এতে বাতাসের গতিবেগ উল্লেখ থাকে।
এই সতর্কসংকেত দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনগুলোর শক্তিমত্তা সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না। যেমনটি ধারণা পাওয়া যায় হারিকেনের ক্যাটাগরি দিয়ে।
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের সময় পর্যায়ক্রমে যে সংকেতগুলো দেয়া হয় সেগুলোতে আসলে কী বলা হয়?
দূরবর্তী সংকেত ১:
সমুদ্রের দূরবর্তী স্থানে ঝড়ের মতো আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। বাতাসের গতিবেগ অন্তত ঘণ্টায় ৬১ কিলোমিটার।

ছবির উৎস, Getty Images
দূরবর্তী সতর্কসংকেত ২:
গভীর সমুদ্রে একটি ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। গতিবেগ ঘন্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার।
স্থানীয় সতর্কসংকেত ৩:
বন্দরে ঝড় আছড়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাতাসের গতিবেগ হতে পারে ঘন্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার।
স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত ৪:
বন্দরে ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়তে পারে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫১-৬১ কিলোমিটার। তবে ঘূর্ণিঝড়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়ার মতো তেমন বিপজ্জনক সময় এখনো আসেনি।
বিপদসংকেত ৫:
বন্দর ছোট বা মাঝারী তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়তে যাচ্ছে। ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরকে বাম দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
বিপদসংকেত ৬:
একই ঝড় বন্দরকে ডান দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
বিপদসংকেত ৭:
ঝড়টি বন্দরের ওপর বা কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
মহাবিপদ সংকেত ৮:
বন্দর প্রচন্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়তে পারে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা তার বেশি হতে পারে। প্রচন্ড ঝড়টি বন্দরকে বাম দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে।
মহাবিপদ সংকেত ৯:
ঝড়টি বন্দরকে ডান দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে।
মহাবিপদ সংকেত ১০:
বন্দর প্রচন্ড বা সর্বোচ্চ তীব্রতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েতে যাচ্ছে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার বা তার বেশি হতে পারে। প্রচন্ড ঝড়টি বন্দরের উপর বা নিকট দিয়ে উপকূল অতিক্রম করবে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সংকেত ১১:
আবহাওয়ার বিপদ সংকেত প্রদানকারী কেন্দ্রের সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা আবহাওয়া অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ বলে মনে করেন।
উপরে উল্লেখিত সংকেতগুলো দিয়ে সাগরের অবস্থা কেমন তা বোঝা গেলেও ঝড়টি স্থলভাগের জন্য কতটা ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনতে পারে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বোঝা সম্ভব হয় না।
আর তাই সতর্ক সংকেতগুলো বদলে দেয়ার সময় এসেছে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান অবশ্য বলেন, ঝড়টি মূলত দক্ষিণ দিক অর্থাৎ সাগরের দিক থেকে আসে। তাই যে বন্দরের উপর দিয়ে যাবে সে বন্দরেই বেশি ক্ষতির মুখে থাকবে।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়টা কতটা শক্তিশালী তা নির্ভর করে এর বাতাসের গতিবেগ কেমন তার উপর।

ছবির উৎস, AFP
বাতাসের গতিবেগ যখন ৬২-৮৮ কিলোমিটার থাকে তখন এটা স্বল্পমাত্রার সাইক্লোন। ৮৯ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিবেগের বাতাস থাকলে তখন এটা হয় অতি প্রবল মাত্রার সাইক্লোন।
তবে আরেকটি সাইক্লোন রয়েছে যাকে সুপার সাইক্লোন বলা হয়। এই সাইক্লোনে বাতাসের গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় দুইশ কিলোমিটারের বেশি থাকে।
তবে আমাদের দেশে অতি প্রবল সাইক্লোন এবং সুপার সাইক্লোনের জন্য একই ধরণের সতর্কসংকেত দেয়া হয়। আর সেটি হলো ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত।
এজন্য অনেক সময় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত থাকলেও মানুষ আসলে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না।
আর তাই সতর্ক সংকেতের বিষয়টিতে পরিবর্তন আনা জরুরী।
"এজন্যই এই সংকেত ব্যবস্থায় আরেকটু শ্রেণীবিভাগ করা উচিত", বলেন তিনি।
তিনি বলেন, যে ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ১০০-১২০ কিলোমিটার তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আর ২০০-২৫০ কিলোমিটার গতিবেগের সুপার সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এক হবে না।
তবে তিনি বলেন যে, ৯ নম্বর সংকেতের পরই যেহেতু সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত দেয়া হয় এবং এ সংকেত অনুযায়ী, সবার আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় আলাদা সংকেতের কথা আর বলা হয় না।
মি. রহমান বলেন, "বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরীয় অঞ্চলে দুর্যোগগুলোকে ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করার রীতি নেই। সেটা কেন নেই তা অবশ্য আমার জানা নাই"।
তবে তার এই কথায় দ্বিমত পোষণ করেছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক শাহ আলম।

ছবির উৎস, বাংলাদেশ আবহাওয়া দপ্তর
তিনি বলেন, বাংলাদেশে পূর্বাভাস হিসেবে যে সংকেতগুলো ব্যবহার করা হয় সেখানে বাতাসের গতিবেগও উল্লেখ করা হয়। সে কারণে বোঝা যায় যে আসলে ঘূর্ণিঝড়টি কতটা শক্তিশালী।
তার মতে, স্থানীয় বাসিন্দারা বোঝেন যে, ৮০ কিলোমিটার বা ১০০ কিলোমিটার বাতাসের গতিবেগ হলে কি ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তারা সে হিসেবেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
সাবেক এই আবহাওয়া কর্মকর্তা বলেন, "উপকূলীয় জনগণ জানেন যে ১০০ কিলোমিটার বাতাস হলে তাদের ঘর উড়ে যাবে না। তবে সিভিয়ার ওয়েদার হলে তারা আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যায়"।
সতর্ক সংকেত পরিবর্তনের কোন দরকার নেই বলেও মনে করেন মি. আলম।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে মানুষ আসলে বোঝে যে কোন সংকেত দিয়ে কি বোঝায়।








