ঘূর্ণিঝড় পাইলিনের তান্ডব তবে 'শূন্য প্রাণহানি'

india cyclone
ছবির ক্যাপশান, পাঁচ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ‘পাইলিন' ভারতের উড়িষ্যা উপকূলে রাতভর ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও মৃত্যু এড়ানো গেছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক পূর্বাভাস এবং সাবধানতা নেওয়ায় প্রাণহানি এড়ানো গেছে।

ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের মহাপরিচালক এল এস রাঠোর এক সংবাদ সম্মেলনে 'জিরো ডেথ' বা শূন্য প্রাণহানির দাবি করেছেন।

মি রাঠোর বলেন, ঝড়ের সঠিক পূর্বাভাস এবং সেইমত তিনদিন ধরে লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ফলে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

উড়িষ্যায় গাছ চাপা পড়ে নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ শুরু হয়েছে।

জাহাজ ডুবি, নিখোঁজ নাবিক

ভারতের দুর্যোগ মোকাবেলা দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন শনিবার রাতে ঝড়ের সময় পশ্চিমবঙ্গের উপকুলের কাছে গভীর সাগরে বিদেশী একটি জাহাজ ডুবে গেলে ১৮ জন নাবিকের কোন খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।

পানামার পতাকাবাহি এমভি বিঙ্গো নামে জাহাজটি প্রথমে কাত হয়ে পড়লে নাবিকরা একটি নৌকা নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যান বলে তাদের কাছে খবর রয়েছে।

তবে এরপর এখন পর্যন্ত নাবিকদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

প্রথম আঘাত গোপালপুরে

বঙ্গোপসাগের সৃষ্ট ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ‘পাইলিন' শনিবার ভারতীয় সময় রাত সোয়া ন'টার দিকে উড়িষ্যার উপকূলীয় গ্রাম গোপালপুরে প্রথম আঘাত হানে।

ভারতের আবহাওয়া দফতরের প্রধান এল এস রাঠোর জানান, ঘূর্ণিঝড়টি যখন গোপালপুরে আঘাত হানে তখন এর আওতায় বাতাসের গতি ছিল ঘন্টায় ২০০ হতে ২১০ কিলোমিটার।

আজ (রবিবার) ভোর থেকে কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণে কাজ শুরু করেছেন।

উড়িষ্যা এবং অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলে এখনো ঝড়ো হাওয়া বইছে।

ঝড়ের কারণে উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর সহ বহু জায়গাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র ‘পাইলিন’কে সুপার সাইক্লোন বা সর্বোচ্চ মাত্রার সাইক্লোন বলে বর্ণনা করেছে যার আওতায় বাতাসের গতি ঘন্টায় ১৯৬ মাইল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

তবে ভারতের আবহাওয়া দফতর বলছে এটি ছিল ক্যাটাগরি চার সাইক্লোন।

এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ভারতের পূর্ব উপকূল জুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়। অন্তত পাঁচ লক্ষ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।

কোলকাতা থেকে বিবিসির অমিতাভ ভট্টশালী জানান, ঘূর্ণিঝড় পাইলিন উড়িষ্যা রাজ্যের গোপালপুর দিয়ে প্রথম স্থলভাগে আঘাত হানে। উড়িষ্যা ও অন্ধ্র প্রদেশের প্রায় আড়াইশো থেকে তিনশো কিলোমিটার উপকূল রেখা জুড়ে ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশংকা করা হচিছল।

ভারতের উপদ্রুত এলাকার বন্দরগুলোকে আবহাওয়া দফতর থেকে দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানো হয়।

সামরিক বাহিনী মোতায়েন

ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ভারত সরকার ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী সদস্যদের মোতায়েন করেছে।

সেই সঙ্গে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবেলা বাহিনীর প্রায় ২৩০০ সদস্যকে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বিবিসির অমিতাভ ভট্টশালী জানান, ১৯৯৯ সালে এক ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দশ হাজার মানুষের নিহত হয়েছিলেন। সেবার ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সরকারের যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না বলে সমালোচনা হয়েছিল। সে কারণে এবার আগে থেকেই ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার জন্য সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

সারা রাত ধরে অভিযান চালিয়ে উপকুল থেকে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়।

জনশূন্য গোপালপুর

ঘূর্ণিঝড় পাইলিন উড়িষ্যার যে জায়গায় প্রথম আঘাত হানে, সেখান থেকে পনের কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলেন বিবিসির একজন সংবাদদাতা সালমান রাভি।

ঝড় আঘাত হানার ঘন্টাখানেক আগে টেলিফোনে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, সেখানে তখনই প্রচন্ড হাওয়ায় বাড়ী ঘরের টিনের চাল উড়ে যেতে শুরু করে।

“আমি দেখছি আমার সামনে টিনের চাল উড়ে যাচ্ছে, গাছপালা ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে । রাস্তাঘাট একেবারে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।”

“বাতাসের যে তীব্র আওয়াজ আমি শুনছি, এরকম আওয়াজ আমি জীবনে শুনিনি। ঝড়ের এই তীব্র আওয়াজ সারা জীবন আমার মনে থাকবে।”

তিনি আরও জানান, বহু মানুষকে উপকূলীয় এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়া হলেও গবাদিপশু রক্ষার কোন ব্যবস্থা না করায় অনেকে তাদের বাড়ী ছেড়ে যেতে চাইছেন না।

সুপার সাইক্লোন

মার্কিন নৌবাহিনীর ‘টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার’এই ঘুর্ণিঝড় সম্পর্কে যে পূর্বাভাস দিচ্ছে, তার সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাসের কিছুটা তফাৎ দেখা যায়।

ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের হিসেবে ‘পাইলিন’ হচ্ছে ক্যাটাগরি ফোর বা চার মাত্রার ঘূর্ণিঝড়। এই ঘূর্ণিঝড়ের আওতার মধ্যে ঝড়ো বাতাসের সর্বোচ্চ গতি হতে পারে ঘন্টায় ১৩৬ মাইল হতে ১৫০ মাইল পর্যন্ত। এর সঙ্গে দশ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাসও হতে পারে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার হিসাব দিচ্ছিল এই ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতি ঘন্টায় ১৬১ মাইল হতে বেড়ে ১৯৬ মাইল পর্যন্ত হতে পারে যা ক্যাটাগরি ফাইভ ঘূর্ণিঝড়ের সমতুল্য।

সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ক্যাটাগরি ফাইভ হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী। এই ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপারে ভারতীয় কর্মকর্তারা যে ধারণা দিচ্ছিলেন, তার চেয়ে চেয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের আশংকা অনেক বেশি ছিল।

নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলছে, বঙ্গোপসাগরে এ পর্যন্ত যত ঘূর্ণিঝড়ের রেকর্ড তাদের কাছে আছে, পাইলিন হতে যাচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়গুলোর একটি।

তবে ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা এখন বলছেন, তাদের পূর্বাভাসই যে সঠিক ছিল তার প্রমাণিত হয়েছে।