বলিউডে 'সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের' ইঙ্গিত দিয়ে সমালোচনার মুখে নতুন বয়ান এআর রহমানের

বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এআর রহমান
ছবির ক্যাপশান, বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এআর রহমান

অস্কার জয়ী সংগীত পরিচালক এআর রহমান বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যেভাবে বলিউডে 'সাম্প্রদায়িক' বৈষম্যের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তার প্রেক্ষিতে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।

বিবিসির এশিয়ান নেটওয়ার্ককে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মি. রহমান বলেছিলেন যে বিগত আট বছর ধরে তার কাছে বলিউডের কাজ না আসার পিছনে "হয়ত সাম্প্রদায়িক কোনও ব্যাপার আছে, যদিও আমার সামনে কেউ এটা বলেনি"।

তার এই মন্তব্য নিয়ে সিনেমা, সংগীত এবং সাহিত্য জগৎ থেকে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এখন মি. রহমান এক নতুন বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে ভারতীয় হিসাবে তিনি গর্বিত।

সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, "সংগীত সবসময়েই আমার কাছে সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করা, তা নিয়ে আনন্দের জন্য আর সম্মান দেওয়ার মাধ্যম হয়ে থেকেছে। ভারত আমার প্রেরণা, আমার গুরু আর আমার বাসস্থান।"

অস্কার পুরস্কার হাতে এআর রহমান - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Jeffrey Mayer/WireImage

ছবির ক্যাপশান, অস্কার পুরস্কার হাতে এআর রহমান - ফাইল ছবি

বলিউডে 'সাম্প্রদায়িক' বৈষম্যের ইঙ্গিত

বিবিসির এশিয়ান নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক এআর রহমান তার সংগীত জীবন, সিনেমা জগতের বদল, ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনার সঙ্গেই বর্তমান সামাজিক পরিবেশ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছিলেন।

ওই সাক্ষাৎকারেই তিনি চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, "গত আট বছরে হয়ত ক্ষমতার ভারসাম্য বদলিয়ে গেছে। যারা সৃজনশীল নন, এম মানুষরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। হয়ত সাম্প্রদায়িক কোনও ব্যাপারও আছে, যদিও আমার সামনে কেউ এটা বলেনি।"

তবে এটা তিনি স্বীকার করেছিলেন যে এখন তার কাছে কাজ আসে না।

"কিছু কথা তো কানে আসেই। যেমন আপনাকে বুক করা হল কিন্তু অন্য কোনও মিউজিক কোম্পানি ছবিটার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করল আর তাদের নিজেদের সংগীত পরিচালক নিয়ে এল। আমি বলি যে ঠিক আছে, আমি বিশ্রাম করব, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবো। আমি কাজ খুঁজছি না। আমি চাই কাজটা আমার কাজ আসুক। আমি চাই পরিশ্রম আর সততার সঙ্গে কাজ করেই সাফল্য আসুক," বলেছিলেন মি. রহমান।

"তবে আমি এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবি না, কারণ আমার মনে হয় না এর মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো বিষয় আছে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে, নিজের পছন্দ আছে। আমি কতটা কাজ পাব, সেটা তো আর আমার হাতে নেই,"ওই সাক্ষাৎকারেই এআর রহমান বলেছিলেন।

বলিউডে কাজ না পাওয়ার পিছনে 'সাম্প্রদায়িকতা'র যে ইঙ্গিত তিনি দিয়েছিলেন, তার জন্য গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় এআর রহমানকে।

কঙ্গনা রানাওয়াত (বাঁয়ে), লেখিকা শোভা দে (ডানে)

ছবির উৎস, Getty Images / ANI

ছবির ক্যাপশান, কঙ্গনা রানাওয়াত (বাঁয়ে), লেখিকা শোভা দে (ডানে)

যে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিবিসির সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হওয়ার পরেই চলচ্চিত্র, সংগীত আর সাহিত্য জগতের ব্যক্তিত্বরা এআর রহমানের মূল বক্তব্যটি, অর্থাৎ বলিউডে 'সাম্প্রদায়িক বৈষম্য' থাকার ইঙ্গিত যেভাবে তিনি দিয়েছিলেন, তার সমালোচনা করতে শুরু করেন।

গীতিকার ও কবি জাভেদ আখতার মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, "আমার তো কখনও এমনটা মনে হয়নি। আমি মুম্বাইতে সব ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করি। মানুষ তাকে (এআর রহমানকে) অনেক সম্মান দেয়। হতে পারে অনেকের হয়ত মনে হয় যে তিনি এখন পশ্চিমা দেশগুলিতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আবার এটাও সম্ভব যে কেউ হয়ত ভাবেন যে তার অনুষ্ঠানগুলো খুব লম্বা সময় ধরে চলে, তাতে অনেক সময় লেগে যাবে।

"রহমান এতটাই উচ্চস্তরের মানুষ যে ছোটোখাটো প্রযোজক তার কাছে ঘেঁষতেই ভয় পান। কিন্তু আমি মনে করি না যে এরমধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িক ব্যাপার আছে," বলেছেন জাভেদ আখতার।

অভিনেত্রী ও বিজেপির সংসদ সদস্য কঙ্গনা রানাওয়াতও এআর রহমানকে নিশানা করেছেন।

তিনি ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে লিখেছেন, "ডিয়ার এআর রহমান, আমাকে ফিল্প ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক বৈষম্য আর পক্ষপাতিত্বের মোকাবিলা করতে হয়েছে, কারণ আমি গেরুয়া দলের লোক। তবুও আমি বলব আপনার থেকে বেশি পক্ষপাতিত্ব আর ঘৃণা করা মানুষ আমি দেখিনি।

"আমার পরিচালিত 'ইমারজেন্সি' সিনেমাটার কাহিনি আপনাকে শোনাতে চেয়েছিলাম … কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতেও রাজি হননি। আমাকে বলা হয়েছিল যে আপনি কোনও প্রচারমূলক সিনেমার অংশ হতে চান না। তবে মজার কথা হলো 'ইমারজেন্সি' ছবিটাকে সব চলচ্চিত্র সমালোচকই কিন্তু 'মাস্টারপিস' আখ্যা দিয়েছিলেন," লিখেছেন মিজ. রানাওয়াত।

এআর রহমানের মূল বক্তব্যের পরে বলিউডের শিল্পী শান বলেছিলেন, "আমার মনে হয় না সংগীতের জগতে সাম্প্রদায়িকতা বা সংখ্যালঘুর বিষয় আছে। যদি এরকম কিছু থাকতই তাহলে ৩০ বছর ধরে যে তিনজন আমাদের সুপারস্টার আছে, তারাও তো সংখ্যালঘু, কিন্তু তাদের ভক্তের সংখ্যা কি কম? সেই সংখ্যা তো বেড়েই চলেছে।"

আবার সাহিত্যিক শোভা দে বলেছিলেন, "এটা খুব বিপজ্জনক মন্তব্য … আমি ৫০ বছর ধরে বলিউডকে দেখছি। আমি যদি এমন কোনো জায়গা দেখে থাকি যেটা সাম্প্রদায়িকতা-মুক্ত, তাহলে সেটা বলিউড। আপনার প্রতিভা থাকলে আপনি সুযোগ পাবেন।"

ভজন শিল্পী অনুপ জালোটার কথায়, "কখনই বিষয়টা এরকম নয়। সত্যটা হলো তিনি পাঁচ বছরেই ২৫ বছরের কাজ করে ফেলেছেন। এখন কী করা যাবে? উনি তো অনেক কাজ করেছেন, আর খুবই ভালো ভালো কাজ করেছেন। মানুষের মনে তার প্রতি খুবই সম্মান রয়েছে।"

জাভেদ আখতার (ডানে), এআর রহমান (মাঝে), পরিচালক কেতন মেহতা (বাঁয়ে)- ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Sondeep Shankar/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাভেদ আখতার (ডানে), এআর রহমান (মাঝে), পরিচালক কেতন মেহতা (বাঁয়ে) - ফাইল ছবি

নতুন বিবৃতিতে কী বলেছেন?

কয়েকদিন ধরে সমালোচনার পরে ইনস্টাগ্রামে এক বিবৃতি পোস্ট করেছেন এআর রহমান।

সেখানে তিনি লিখেছেন, "আমার মনে হয় কখনও কখনও কারও অভিপ্রায় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সবসময়েই সংগীতের মাধ্যমে সম্মান জানানো আর সেবা করা। আমি কখনই কাউকে দুঃখ দিতে চাইনি আর আমি আশা করব যে আমার আন্তরিকতা অনুভব করতে পারবেন।"

তিনি আরও লিখেছেন, "ভারতীয় হতে পেরে আমি গর্বিত। কারণ এই পরিচয়টা আমাকে নিজের কথা বলার জায়গা দেয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয় এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির কথা জানার সুযোগ দেয়।"

নিজের সংগীতের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতির অবদানের কথা স্মরণ করে এআর রহমান লিখেছেন যে এসবই তার লক্ষ্যকে শক্তিশালী করেছে।

সমাজ মাধ্যমের পোস্টে তিনি লিখেছেন, "আমি এই দেশের কাছে কৃতজ্ঞ এবং এমন সংগীতের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যা অতীতকে সম্মান দেয়, বর্তমানকে বাঁচিয়ে রাখে এবং ভবিষ্যৎকে অনুপ্রাণিত করে।"

শেষে তিনি লিখেছেন, "জয় হিন্দ, জয় হো।"