গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রতি নরম অবস্থান থেকে সরে আসছে ইউরোপ

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ক্যাটিয়া অ্যাডলার
- Role, ইউরোপ সম্পাদক
ইউরোপে হঠাৎ করে কোনো এক অদৃশ্য সুতো ছিঁড়ে গেছে।
সোমবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড 'অবশ্যই দরকার' যুক্তরাষ্ট্রের।
তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ইউরোপের নেতারা এ নিয়ে 'খুব একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে না'।
তবে বুধবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মুখোমুখি হলে ইউরোপীয় নেতাদের কৌশল হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গ্রিনল্যান্ড হলো ডেনমার্কের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। আর ডেনমার্ক হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেটোর সদস্য।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এই দুই সংস্থার সদস্য ও ডেনমার্কের মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছেন, যাতে এই দেশগুলো কোপেনহেগেনের পাশে না দাঁড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয়। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সব পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হবে।
এটি ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ এক পরিস্থিতি, যেগুলো এমনিতেই ধুঁকছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলো; যেমন জার্মানির গাড়ি শিল্প ও ইতালির বিলাসবহুল পণ্যের বাজার।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম শুরুর আগে গত সোমবার ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রীর সাথে জরুরি বৈঠকের পর জার্মানির অর্থমন্ত্রী বলেন, "আমরা নিজেদের ব্ল্যাকমেইল হতে দেব না"।
ট্রাম্পের এই হুমকি ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য ছিল গালে চপেটাঘাতের মতো—কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য পৃথকভাবে মাত্র গত বছরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে শুল্ক সংক্রান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছিল।
"আমরা অচেনা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগে কখনো এমন দেখিনি। ২৫০ বছরের মিত্র, এমন এক বন্ধু ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে শুল্ক প্রয়োগের কথা ভাবছে," বলেন ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেকিউর।
জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল যোগ করেন, "একটি সীমা অতিক্রম করা হয়েছে… ঠিক কী ঘটবে তা আজ আমি বলছি না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইউরোপকে প্রস্তুত থাকতে হবে"।
হঠাৎ করেই ট্রাম্পের প্রতি ইউরোপের সেই নরম অবস্থান—যেটি তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর ইউরোপীয় নেতারা বেছে নিয়েছিলেন—মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ইউরোপের কৌশল
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে শেষ পেরেক গেঁথে ফেলার সময় এখনো হয়নি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্তত আশা করছে, বুধবার সুইজারল্যান্ডে গ্লোবাল ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে তারা 'বিগ স্টিক ডিপ্লোমেসি', অর্থাৎ শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা করলেও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত থাকবে। (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের 'বিগ স্টিক ডিপ্লোমেসি' থিওরির ভাবনাকে নতুন করে তুলে ধরার কথাই ভাবছেন তারা।)
থিওডোর (টেডি) রুজভেল্ট বিশ্বাস করতেন, লক্ষ্য অর্জনে কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য শক্তির সমর্থন দরকার। ইউরোপ এখন যেন সেই নম্র ও কঠোর হওয়ার সেই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল গ্রহণ করছে।
ইউরোপীয় নেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেছেন যে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় তারা তাকে সমর্থন করবেন। তাই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এককভাবে এগোনোর দরকার নেই।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ট্রাম্প যদি তথাকথিত 'গ্রিনল্যান্ড শুল্ক' আরোপে এগোন, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (৮০ বিলিয়ন পাউন্ড) শুল্ক আরোপের কথা ভাবছেন।
এমনকি ব্যাংক ও উচ্চপ্রযুক্তি কোম্পানিসহ মার্কিন ব্যবসার জন্য ইইউর বিশাল একক বাজারে প্রবেশ সীমিত করাও বিবেচনায় রয়েছে তাদের।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপগুলোর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব ৫০টি রাজ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে এবং বলা হয়ে থাকে ৩৪ লাখ মার্কিন নাগরিককে কর্মসংস্থান দিয়েছেন তারা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিশ্বমঞ্চে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কণ্ঠ দুর্বল। ২৭ সদস্যের এই জোট প্রায়শই পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে জড়ানো দেশ নিয়ে গঠিত।
কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বিপুল, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো মূলত ইউরোপীয় কমিশনই নেয় ইইউর একক বাজারের সদস্যদের পক্ষে।
২০২৪ সালে বিশ্ব পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দখলে ছিল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক শক্তি।
তাই ব্রাসেলস আশা করছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সর্বোচ্চ দাবির অবস্থান থেকে সরে এসে সমঝোতায় আসবেন—যদি তিনি বোঝেন, গ্রিনল্যান্ড নামের একটি দ্বীপ পেতে গিয়ে তিনি হয়তো ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপকে হারাবেন এবং ইইউর প্রতিশোধমূলক শুল্কের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের খরচ বাড়ার দায়ও তার ওপর পড়বে।
'আমাদের অগ্রাধিকার হলো সম্পৃক্ততা, উত্তেজনা বাড়ানো নয়,' সোমবার বলেন ইউরোপীয় কমিশনের উপ-মুখপাত্র ওলোফ গিল।

ছবির উৎস, WPA Pool/Getty Images
"ইউরোপীয়দের মেরুদণ্ড শক্ত করতে ট্রাম্প বাধ্য করছেন," বলেন ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ব্রুয়েগেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ নিকলাস পোয়াতিয়ে।
"(ট্রাম্পের) শুল্কারোপের ক্ষতি ইউরোপের জন্য সামাল দেওয়া সহজে সম্ভব… কিন্তু এখানে বড় প্রশ্নটি অর্থনীতি নয়, বরং নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি"।
"প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে থাকতে পারে না ইইউ"।
মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থা
তবে সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মোটেও মুগ্ধ হননি। দাভোসে বক্তব্যে তিনি এমন এক প্রেসিডেন্টের ছবি এঁকেছেন, যার মনোভাব স্থির, "প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছেন"।
"আমরা আমাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তায় অন্য কারও ওপর নির্ভর করব না"।
ইউরোপের পাল্টা শুল্কারোপ 'বোকামি' হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। আর এখানেই ইউরোপ নিজেকে ফাঁদে পড়া মনে করছে। পদক্ষেপ নিলেও বিপদ, না নিলেও বিপদ।
ইউরোপের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এখন যদি তারা ট্রাম্পের সঙ্গে আরও কঠোর অবস্থানে যান, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
নিষ্ঠুর সত্য হলো—ইউক্রেনের জন্য টেকসই শান্তিচুক্তি এবং নিজ মহাদেশীয় নিরাপত্তার জন্য ইউরোপের ওয়াশিংটনকে প্রয়োজন। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অঙ্গীকার সত্ত্বেও ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ছবির উৎস, Getty Images
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করলেও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার সোমবার জোর দিয়ে বলেন, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়া আসলে যুক্তরাজ্যের 'জাতীয় স্বার্থে'।
"আমাদের পারমাণবিক নিবারণ ক্ষমতা (পারমাণবিক অস্ত্রকে ব্যবহার না করানোর জন্য অন্য দেশের উপর চাপ সৃষ্টি বা প্রতিরোধের কৌশল) আমাদের প্রধান অস্ত্র। যুক্তরাজ্যের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমার প্রধান দায়িত্ব, আর এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা জরুরি"।
কিন্তু ট্রাম্প যখন নেটোর আরেক মিত্র ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলছেন এবং কোপেনহেগেনকে সমর্থন করলে অন্য মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছেন, তখন ইউরোপ যদি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে 'সামলানোর' চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং তার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ায়, তবে মহাদেশটিকে দেখে মারাত্মক দুর্বল মনে হতে পারে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Shutterstock
সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কায়া ক্যালাস লেখেন, "আমাদের বিবাদ বাঁধানোর আগ্রহ নেই, কিন্তু আমরা নিজ অবস্থান ধরে রাখব"।
অঞ্চলগত প্রভাব বাড়ানোয় তৎপর আগ্রাসী রাশিয়ার ভয়াল ছায়া নিয়ে শঙ্কিত দেশ এস্তোনিয়া। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি মস্কোকে দেখাতে চান, চাপে পরলে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারবে ও নেবে ইউরোপ।
"ইউরোপীয়রা আর পিছিয়ে থাকতে পারে না," আমাকে বলেছেন তারা ভার্মা। তিনি হলেন জার্মান মার্শাল ফান্ড নামের থিংকট্যাংকের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
"রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং ইউরোপের সমন্বিত প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করতে গত এক বছরে তারা শুধুমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত কূটনীতির পথ অনুসরণ করেছেন," তিনি বলেন।
"কিন্তু যদি তিনি (ট্রাম্প) হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করেন (যেমনটি তিনি করেছেন)—অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়গুলোকে জুড়ে দেন এবং কোনো একটি ইস্যুতে নিজের পছন্দ না মানলে নেটোকে হুমকি দেন, তাহলে এই প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর ইউরোপ কতটা আস্থা রাখতে পারে?"
পুতিন ও 'বোর্ড অব পিস'
এই সবকিছু পাশ থেকে শুধু রাশিয়া নয়, চীনও দেখছে। তাদের চোখে পশ্চিমা বিশ্ব—যেখানে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ছিল ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী—এখন ভেঙে পড়ছে।
বিশ্বে ক্রমবর্ধমানভাবে কয়েকটি বৃহৎ শক্তি প্রাধান্য বিস্তার করছে, যার মধ্যে রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ভারত, সৌদি আরব এবং কিছুটা ব্রাজিলও রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্রদের সঙ্গে আচরণে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তাতে চীন আশা করছে যে বেইজিং আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তাদের দিকে ঝুঁকবে।
যেই কানাডাকে ট্রাম্প একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি দিয়েছিলেন, সেই দেশটি এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি সীমিত বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে। অটোয়া এখন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে।

ছবির উৎস, AFP via Getty
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় পশ্চিমা শক্তিগুলোর গড়ে তোলা নেটো ও জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট খুব একটা শ্রদ্ধা দেখাননি।
ট্রাম্প যে 'বোর্ড অব পিস' গঠন করছেন এবং যেটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন তিনি এই বৃহস্পতিবার দাভোসে করতে চান, সেটির দিকে অনেকে নজর দিচ্ছেন।
সম্মেলনে বহু বিশ্বনেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ী উপস্থিত থাকবেন।
এই বোর্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েলের বিধ্বংসী দুই বছরের অভিযানের পর গাজা পুনর্গঠন তদারকি করা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামলার পর হামাসকে ধ্বংসের লক্ষ্যে গাজায় ওই অভিযান শুরু হয়েছিল।
কিন্তু বোর্ডের সনদে বলা হয়েছে, এটি হবে 'আরও তৎপর ও কার্যকর আন্তর্জাতিক শান্তি-নির্মাণ সংস্থা', যা ইঙ্গিত দেয়—এর কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে, এমনকি জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বীও হয়ে উঠতে পারে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিষয়টিকে এভাবেই দেখছেন। ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, ফ্রান্স 'বোর্ড অব পিস'-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে না—যে আমন্ত্রণ তারা 'অনেক দেশের সঙ্গে' পেয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, "(বোর্ডের) সনদ… বিশেষ করে জাতিসংঘের নীতি ও কাঠামোর প্রতি সম্মানের প্রশ্নে গুরুতর প্রশ্ন তোলে, যা কোনো অবস্থাতেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না"।
সোমবার ক্রেমলিন জানায়, ভ্লাদিমির পুতিনকেও বোর্ডে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে—যা ইঙ্গিত দেয়, ইউক্রেনে চার বছর ধরে আগ্রাসন চালানো এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনা এখনো গ্রহণ না করা সত্ত্বেও ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
বোর্ডে ট্রাম্পের সার্বিক ভূমিকা এবং স্থায়ী সদস্যপদের জন্য বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলার দাবি করার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কিন্তু তারা ভার্মার মতে, এই 'পিস বোর্ড' আসলে শান্তির জন্য নয়।
"পুতিনের মতো নেতাদের যদি এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তবে এটি শান্তির বোর্ড কীভাবে হয়?"
"ট্রাম্প নিজেকে একজন শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দেখতে চান। তিনি খবরের শিরোনাম হতে চান, কিন্তু টেকসই শান্তির জন্য যে কঠোর পরিশ্রম দরকার, তার ভিত্তি গড়তে চান না। তার কৌশল অনেকটা হিট অ্যান্ড রান"। (হিট অ্যান্ড রান কৌশল বলতে মূলত দ্রুত আক্রমণ বা পদক্ষেপ গ্রহণ করে সাথে সাথে সেই স্থান বা পরিস্থিতি থেকে সরে আসাকে বোঝায়)
"তিনি ৮০ বছর ধরে টিকে থাকা জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানকে প্রতিস্থাপন করতে পারেন না"।
সম্পর্কে টানাপোড়েন, তবে ভাঙেনি
তবে সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দশক পুরনো আন্তর্জাতিক নিয়মকে উপেক্ষা করে, এসব বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানকে কিছুটা নাড়া দিচ্ছেন—এদের আধুনিকীকরণে প্ররোচিত করছেন এবং আরও প্রাসঙ্গিক হতে বাধ্য করছেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ সম্ভবত কম পশ্চিমাকেন্দ্রিক হওয়া উচিত এবং এতে বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তিত বাস্তবতার আরও যথাযথ প্রতিফলন ঘটানো দরকার।
নেটোর ইউরোপীয় সদস্যরা স্বীকার করেছেন যে নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য তাদের আরও বেশি ব্যয় করা উচিত। ট্রাম্প প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি এটি বলেছেন, যদিও তিনি অনেক বেশি সরাসরি এবং খোলামেলা বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে যে সব দেশ নিজেদের অংশের খরচ বহন করবে না, তাদের যুক্তরাষ্ট্র আর রক্ষা করবে না। এর পরই স্পেন ছাড়া নেটোর সব সদস্য দেশ নিরাপত্তা ব্যয় নাটকীয়ভাবে বাড়াতে সম্মত হয়।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ফিরলে—জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৫৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক দ্বীপটি কিনতে চান না এবং ৮৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধী।
ডেনমার্ক ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি ক্যাপিটল হিলে আইনপ্রণেতাদের বোঝাতে তৎপর যে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা জরুরি।

ছবির উৎস, Getty Images
ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক এখনো ভাঙেনি, যদিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো তার 'বন্ধু' ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, স্যার কিয়ার স্টারমার এবং নেটোর মহাসচিব মার্ক রুট্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। যোগাযোগের পথ এখনো খোলা।
তবে শেষ পর্যন্ত, ইউরোপীয়রা যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কার্যকরভাবে নিজেদের ভাবনা পৌঁছে দিতে চান, তবে তাদের একসঙ্গে থাকতে হবে।
শুধু ইইউর বৈচিত্র্যময় সদস্য রাষ্ট্রগুলো নয়, শুধু নেটো নয়—সব দেশকে একসঙ্গে থাকতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে এখানে যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কিন্তু ইউরোপের নেতারা দ্বিধায়—আন্তর্জাতিকভাবে যা সঠিক মনে করেন তা করবেন, নাকি নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দেবেন। পূর্ণমাত্রার ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হলে তার খেসারত দিতে হবে ভোটারদেরই।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে দীর্ঘ সময় ধরে সবার একসুরে কথা বলা সহজ হবে না।









