স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া কি আসলেই দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে?

বাংলাদেশে বিয়ে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে বিয়ে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বাংলাদেশের মুসলমানদের দ্বিতীয় বিয়ে করতে আর স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে এরকম একটি সংবাদ ও ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক। আদালতের আদেশে আসলে কী বলা হয়েছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

তবে আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে বিবিসি বাংলা নিশ্চিত হয়েছে, এ ধরনের একটি বিষয় বাংলাদেশের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে উঠলেও মুসলিমদের পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতির যে বিধান আগে ছিলো সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই আবার বিয়ে করা যাবে- এমন দাবি সঠিক নয় বলেই বলছেন তারা।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টিকে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর দেওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট মামলা করেছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতির আবেদন করেছিলেন।

আইনজীবীদের মতে, এতে ওই আইনজীবী কার্যত মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টিকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। কিন্তু রিটটি গত বছর ২০শে অগাস্ট খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট।

এর ফলে পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম পারিবারিক আইনে আগে যেই নিয়ম ছিল সেটিই বহাল রইলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবী মিতি সানজানা ও অধ্যাপক আবু নাসের মোঃ ওয়াহিদ।

গত ডিসেম্বরে রিটের ২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও ফটোকার্ড প্রকাশের পর এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে এ নিয়ে নানারকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, আবার বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি বা অনুমতি নেওয়ার যে নিয়ম ছিল তাতে কোনো পরিবর্তনই আসেনি।

"আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে নিবন্ধিত হবে না। আবার ওই কাউন্সিলে কাউকে পুনরায় বিয়ের আবেদন করতে হলে অবশ্যই আবেদনের সাথে বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতি বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আবু নাসের মোঃ ওয়াহিদ বলছেন 'পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না' বলে যে প্রচার চলছে তা সম্পূর্ণ ভুল, বরং হাইকোর্টের রায়ে স্ত্রীর সম্মতিসহ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমেই বিয়ের অনুমতির যে পদ্ধতি সেটিকেই যৌক্তিক বলা হয়েছে।

স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই আবার বিয়ে করা যাবে- এমন দাবি সঠিক নয় বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই আবার বিয়ে করা যাবে- এমন দাবি সঠিক নয় বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা

পুনরায় বিয়ে ও আরবিট্রেশন কাউন্সিল

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা অপরাধ ও শাস্তির বিধানও আছে। তবে সালিশি পরিষদের সিদ্ধান্ত থাকলে এটি কার্যকর হবে না।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে তাহলে তাকে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে।

''এভাবে পরিশোধ না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হইবে; এবং এই অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হইলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডের'' বিধান আছে।

আবার ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী পুনরায় বিয়ের জন্য আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের অনুমতি নিতে হবে এবং এই পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা যাবে না।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রেশন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

"বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি করার জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর রেজিস্ট্রি করতে হলে সালিশি পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। আবার এ অনুমতির আবেদনের শর্তগুলোর মধ্য একটি হলো বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অধ্যাপক আবু নাসের মোঃ ওয়াহিদ।

আইনজীবী মিতি সানজানা

ছবির উৎস, Zahidur rahman biplob

ছবির ক্যাপশান, আইনজীবী মিতি সানজানা

এক্ষেত্রে আবেদন করতে হয় স্ত্রী কিংবা শেষ স্ত্রীর এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে। তিনি আবেদন পাওয়ার পর আবেদনকারী স্বামী ও তার বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধিদের মনোনয়ন করতে বলবেন।

"এক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও আবেদনকারী স্বামী ও তার স্ত্রী কিংবা স্ত্রীদের প্রতিনিধিদের মিলেই সালিশি পরিষদ। তারাই আলোচনার মাধ্যমে দেখবেন যে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও যে বিয়ের আবেদন করা হয়েছে সেটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত কি-না," বলছিলেন মি. ওয়াহিদ।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে মুসলিমদের যে আইনের আওতায় বিয়ে সম্পন্ন হয় সেটি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন। এই আইনে বলা আছে – পুনরায় বিয়ের আবেদনের সাথে তিনটি বিষয় থাকতে হবে।

এগুলো হলো- সরকারি ফি, কেন তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাচ্ছেন সেই ব্যাখ্যা আর বলতে হবে যে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কি-না ।

এসব বিষয়ের ভিত্তিতে আরবিট্রেশন কাউন্সিলে আলোচনার পর কাউন্সিল আবেদনটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করলে পুনরায় বিয়ের জন্য শর্তহীন বা শর্তযুক্ত অনুমতি দিতে পারে।

মি. ওয়াহিদ বলছেন, "এবার হাইকোর্টও আগের এই নিয়মই বহাল রেখেছে। আদালত রিট আবেদন খারিজ করে বলেছে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের যে সিস্টেম আছে সেটাই যৌক্তিক"।

পুনরায় বিয়ে নিয়ে একটি রিট খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুনরায় বিয়ে নিয়ে একটি রিট খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট

আইনজীবী মিতি সানজানাও বলছেন হাইকোর্টের এই রায় নিয়ে বিভ্রান্তিকর একটি প্রচারণা শুরু হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

"এ প্রচারণার কোনো ভিত্তি নেই। দ্বিতীয় বা আবার বিয়ের জন্য বিদ্যমান সব স্ত্রীর অনুমতি নিয়েই আরবিট্রেশন কাউন্সিলে যেতে হবে। কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া বিয়ে হলে সেটি রেজিস্ট্রেশন হবে না। কাউন্সিলেই আলোচনা হবে যে আবার বিয়ে কেন প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

হাইকোর্টের রায়ের বিভিন্ন অংশ ইতোমধ্যেই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এসব খবর অনুযায়ী রায়ে হাই কোর্ট বলেছে, "এটি স্পষ্ট যে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার অধীনে আরেকটি বিবাহের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়। এই আইন কোনো পক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ের) অধিকার খর্ব করে না বা কেড়ে নেয় না; একই সঙ্গে এটি সালিশ পরিষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতাও আরোপ করে না"।

একই সাথে হাইকোর্ট বলেছে, "সালিশ পরিষদ বিবাহের কোনো পক্ষের ওপর একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।"

মিতি সানজানা বলছেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশেই কিছু ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করা আছে, যেসব ক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও আরবিট্রেশন কাউন্সিল পুনরায় বিয়ের অনুমতি দিতে পারে।

"বন্ধ্যাত্ব, শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা কিংবা কোন স্ত্রী যদি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিখোঁজ থাকেন তা অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরবিট্রেশন কাউন্সিল বিবেচনায় নিতে পারে। কারও স্ত্রী একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিখোঁজ থাকলে এক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও পরিষদ বিয়ের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।