সাত পাক, কন্যাদান আর মঙ্গলসূত্র- হিন্দু বিয়ের আইনি স্বীকৃতি পেতে জরুরি যত রীতি

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, আনাঘা পাঠক
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
"তার মানে আমার বিয়েটা বৈধ নয়?" বন্ধু গায়ত্রী আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। হিন্দু বিয়ে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি পর্যবেক্ষণের কথা পড়ে তিনি আমাকে ওই প্রশ্নটা করেন।
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে যে হিন্দু বিবাহ একটি ‘সংস্কার’ এবং তা একটি অনুষ্ঠান করে সঠিক রীতি মেনে সম্পন্ন করা উচিত।
‘হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫’ হিন্দুদের বিয়ের স্বীকৃতি দেয়।
গায়ত্রীর বয়স ৩৫। তিনি একজন আধুনিক নারী। নিজের বিয়েতে কন্যাদান অনুষ্ঠান করতে দেননি তিনি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি কোনও জড়বস্তু নন, যা দান করে দেওয়া যায়।
আমাদের দুজনের ওই কথাবার্তা থেকেই আমার মনে পড়ল যে আমার দুই বোনের বিয়েতে বরপক্ষের অতিথিদের পা ধোয়ার রীতি মানা হয়নি। তার অর্থ কি বোনেদের বিয়েগুলোও অবৈধ?
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
এককথায় বলতে গেলে এই প্রশ্নের উত্তর হলো– না। তবে এই লেখাটি পড়তে পড়তেই আপনি এই প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর পেয়ে যাবেন।
প্রথমে জেনে নেওয়া যাক যে কোন মামলা থেকে এই বিতর্কের সূত্রপাত হলো।
আদালতের যুক্তিতর্ক এবং হিন্দু বিবাহ
বিহারের মুজফফরপুর আদালত থেকে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি আদালতে একটি বিবাহবিচ্ছেদের মামলা সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক নারী পিটিশন দায়ের করেছিলেন। তারই শুনানি চলছিল আদালতে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভারতীয় সংবিধানের ১৪২ নং অনুচ্ছেদের অধীনে ওই নারী এবং তার প্রাক্তন সঙ্গী যৌথভাবে একটি পিটিশন দাখিল করে বলেছিলেন যে তারা নিজেদের মতবিরোধ মিটিয়ে নিতে চান।
তারা এও বলেছিলেন, যেহেতু তাদের বিয়েতে চিরাচরিত রীতি মানা হয়নি, তাই তাদের বিয়েকে অবৈধ ঘোষণা করা হোক।
আদালত তাদের আবেদন মঞ্জুর করে এবং তাদের বিবাহ বাতিল ঘোষণা করে।
রায় ঘোষণার সময় আদালত কয়েকটি পর্যবেক্ষণ নথিভুক্ত করে। সেগুলির অন্যতম ছিল যে, যেখানে যথাযথ সংস্কার না মেনে বা অনুষ্ঠান না করে যে হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে, তা আইনের চোখে হিন্দু বিবাহ হিসাবে বৈধ হবে না।
বিয়ের আচারের উদাহরণ হিসাবে সাত পাক ঘোরানোর মতো রীতির উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমাদের নজর দিতে হবে ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের ১১৪ ধারার দিকে। সেখানেই বিবাহ বিষয়টা আসলে কী, তার উল্লেখ আছে।
বীণা গৌড়া মুম্বাই ভিত্তিক একজন নারীবাদী আইনজীবী। তিনি বলেন, "আদালত বরাবরই বিবাহের প্রাতিষ্ঠানিক ধারণার পক্ষে থেকেছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি দীর্ঘদিন ধরে কারও সঙ্গে বসবাস করেন এবং সমাজের সামনে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসাবে উপস্থাপন করেন, তখন আইনও ধরে নেবে যে আপনারা বিবাহিত, যদি না কোনও পক্ষ এটিকে চ্যালেঞ্জ করে।"
তার দাবি, হিন্দু বিবাহ আইনে বিয়ে হলে কিছু আচার-অনুষ্ঠান করতেই হবে। এছাড়াও, বিবাহের শংসাপত্রের জন্য এই সব অনুষ্ঠানের প্রমাণ দিতে হবে।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post
তিনি বলছিলেন, “বিশেষ বিবাহ আইন অনুযায়ী বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করাটাকেই বিবাহ বলে মানা হবে। মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী যেমন নিকাহনামা হচ্ছে আপনার বিয়ের প্রমাণ। খ্রিষ্টান আইন অনুযায়ী বিয়ে হলে চার্চ একটি শংসাপত্র দিয়ে থাকে। এই সব বিয়েতে বিবাহের শংসাপত্র বা তার নিবন্ধনটাই বিয়ের অঙ্গ। কিন্তু হিন্দু আইনে বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কোনও ব্যাপার আগে ছিল না, এটা পরে আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়।”
“হিন্দু আইনে বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা রয়েছে এবং উভয় পক্ষের যে কোনও একদিকে রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য মেনে বিবাহের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে। শুধু রেজিস্ট্রেশন হিন্দু বিয়ের প্রমাণ হতে পারে না। তাই আইনের চোখে দেখলে আদালত যা বলেছে তা কিছুটা হলেও সঠিক,” বলছিলেন বীণা গৌড়া।
সাত পাক ঘোরানো, কন্যাদান বা মঙ্গলসূত্র পড়ানোর মতো আচারগুলিকে অধিকাংশ সময়েই পশ্চাদপদতা আর ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রীতি হিসাবে দেখা হয়, যেখানে নারীদের অন্যের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে একটা সম্পত্তির মতো।

ছবির উৎস, Getty Images
আইন কী বলে?
এ ক্ষেত্রে আইন স্পষ্ট। সেখানে কোনও আচার-অনুষ্ঠানের উল্লেখ নেই। ‘হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫’-র সাত নম্বর ধারায় বলা হয়েছে বর বা কনে পক্ষের কোনও একটি পক্ষের রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য মেনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন করা যাবে।
বীণা গৌড় একটা উদাহরণ দিচ্ছিলেন।
তার কথায়, “কর্ণাটকের কিছু সম্প্রদায়ের মানুষ কাবেরী নদীকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করে। আবার কোনও কোনও বিয়েতে সূর্যকে সাক্ষী রাখা হয়। অনেক ধরনের অনুষ্ঠান ও রীতি-আচার রয়েছে।
“আইনে বলা নেই যে কোনও নির্দিষ্ট রীতিতে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে। এতে শুধু বলা হয়েছে, বর বা কনে পক্ষের ঐতিহ্য মেনে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করা যাবে,” বলছিলেন মিজ গৌড়।
হিন্দু বিবাহ আইনের তিন নম্বর ধারায় আবার রীতিনীতির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে ধারাবাহিকভাবে যেসব রীতি এবং আচার পালন করা হচ্ছে, সেগুলো ঠিক সেভাবেই পালন করতে হবে। এইসব ঐতিহ্যবাহী আচার ও রীতিগুলি একেকটি সম্প্রদায়, বর্ণ, গোষ্ঠী বা পরিবারের কাছে আইনের মতো হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট-সহ ভারতীয় আদালতগুলি কেন সাত পাক ঘোরার মতো আচার-অনুষ্ঠানের ওপরে এত জোর দিচ্ছে ?
ড. সরসু থমাস বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল স্কুলের অধ্যাপক এবং পারিবারিক আইন এবং লৈঙ্গিক-আইন বিশেষজ্ঞ। তিনি বিশ্বাস করেন যে “সমস্ত বিবাহ ব্রাহ্মণ ঐতিহ্য এবং প্রথা অনুসারে করা হয় না। তবে এটা সত্যি যে আদালত ব্রাহ্মণ ঐতিহ্য ও রীতিনীতি অনুসরণ করারই কথা বলছে।”
তিনি বলেন, “আমি মনে করি আদালত যেখানে সাত পাক ঘোরা বা হোম-যজ্ঞ করার ওপরে জোর দিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে তা সঠিক নয়। কেউ কেউ মনে করতেই পারেন, মঙ্গলসূত্র বাঁধাটা সাত পাক ঘোরানোর মতো কোনও ঐতিহ্যশালী আচার নয়।”
“যদি বর বা কনের যে কোনও পক্ষের আচার বা রীতি অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হয় তবেই সেটিকে হিন্দু বিবাহ আইনে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে,” বলছিলেন মিজ থমাস।

ছবির উৎস, Getty Images
আদালতের ভিন্ন অবস্থানও আছে
কিছু ক্ষেত্রে আদালত ভিন্ন অবস্থানও নিয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক একটি মামলায় ইলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল যে হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী কন্যাদান কোনও বাধ্যতামূলক অনুষ্ঠান নয়।
পুনের বাসিন্দা রমা সরোদ নারী অধিকার সংক্রান্ত আইনের বিশেষজ্ঞ।
ভারতীয় আদালতগুলির প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তার কথায়, “সুপ্রিম কোর্টের উচিত অবশ্য পালনীয় আচার-অনুষ্ঠানের সংজ্ঞা প্রসারিত করা। তাদের স্পষ্ট করে জানানো উচিত যে কোন কোন আচার অনুষ্ঠান এর মধ্যে থাকবে। হিন্দু বিবাহ আইন আসে ১৯৫৫ সালে। এটা সত্য যে এই আচার, রীতিনীতি, ঐতিহ্যগুলি সেই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে এখন আমাদের এসব নিয়মগুলোকে আধুনিক সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন প্রগতিশীল হিন্দু যদি সেই পুরানো রীতিনীতিগুলি অনুসরণ করতে অস্বীকার করে তাহলে কী হবে?

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
নতুন আইন দরকার?
ড. সারসু বলছিলেন, “নতুন আইনের কোনও প্রয়োজন নেই।
তার কথায়, “শেষ পর্যন্ত উদ্বেগটা তো সেই নারীদেরই হবে, কারণ বেশিরভাগ মানুষ তো তাদের ঐতিহ্য মেনেই বিয়ে করবে। এখন যদি এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা হয়, তার মানে তো নারীদেরই বিয়েটা অবৈধ হয়ে যাবে।”
“আমার মতে, আইনটা ঠিকই আছে। প্রগতিশীল দম্পতিদের সামনে সবসময়েই বিশেষ বিবাহ আইনের বিকল্প তো আছেই। কিন্তু নতুন আচার-অনুষ্ঠান, অনুষ্ঠানের জন্য নতুন কোনও আইনের দরকার নেই। তবে আইনে এটা বলা যেতে পারে যে, বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশনই যথেষ্ট প্রমাণ।”
আবার বীণা গৌড় বলছেন যে আদালতের একটি প্রগতিশীল অবস্থান নেওয়া উচিত। যেসব আচার-রীতিনীতি লৈঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চলে আসছে, সেগুলোর আইনি স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করা উচিত আদালতের।
একই সঙ্গে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি কতটুকু প্রাসঙ্গিক এবং এর অধীনে নারী অধিকারের মর্যাদা কী, সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, “ভারতীয় আইনে বৈবাহিক ধর্ষণের বিচার হয় না। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট রায় দেয় যে বিবাহিত অবস্থায় স্বামীর অস্বাভাবিক যৌন মিলন অপরাধ নয়। সম্মতির কোনও ব্যাপারই নেই। এর অর্থ হলো যৌনতার বিষয়ে একমত না হলেও, আপনি বিয়ে করেছেন বলেই আপনাকে তাতে রাজি হতে হবে। এই বিষয়গুলি আমি মনে করি আরও প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা দরকার।”
মিজ গৌড়ের কিছু কথা আমাকে কয়েকটা ব্যাপার ভাবতে বাধ্য করছে।
তিনি বলেন, “এটা বলা সহজ যে বিয়ে সমতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কিন্তু আইন কি একজন নারীকে সমমর্যাদার সঙ্গী হওয়ার অনুমতি দেয়?”
আমার যতদূর মনে পড়ে, আমাদের নারীদের বলা হয় কখন বিয়ে করতে হবে, কাকে বিয়ে করতে হবে আর কীভাবে বিয়ে করতে হবে।
এত কিছুর মাঝে আমাদের এই লড়াইতে সমতা শব্দটা কোথায়?








