'আমি সুদানের গণকবরে লাশ ফেলে দিতে দেখেছি'

- Author, মার্সি জুমা এবং পিটার বল
- Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
- Reporting from, আদ্রে, চাদ
সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ চাদে পালিয়ে যাওয়ার আগে সুদানের পশ্চিমাঞ্চলীয় দারফুরে যা দেখেছেন তাতে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছেন মালিম।
"যাদের সাথে আমি কাজ করেছি তারা যদি জানে যে আমি আপনাকে এই ছবি এবং ভিডিওগুলি দেখিয়েছি, এই ভিডিও তুলেছি, তাহলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত," বলছিলেন তিনি।
তিনি তার ফোন হাতে তুলে নিলেন এবং এল জেনিনা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মরদেহের বীভৎস সব ছবি দেখালেন।
তার নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা তার নামটি বদলে দিয়েছি।
দেশ ছাড়ার আগে একদল লোকের সাথে তার দায়িত্ব ছিল রাস্তা থেকে মৃতদেহ সরিয়ে গণকবরে দাফন করা।
এপ্রিল মাস থেকে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে সুদান কেঁপে উঠছে।
আরএসএফের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যেখানে সেই দারফুরে লড়াইয়ের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ।
সতর্কবাণী: এই প্রতিবেদনে কিছু বীভৎস ছবি রয়েছে
এসব ফটোতে দেখা যাচ্ছে কয়েক ডজন মৃতদেহ।
এদের মধ্যে কিছু দেহ কম্বল এবং কাপড়-চোপড় দিয়ে ঢাকা।
অন্য মৃতদেহগুলি ফুলে উঠেছে গেছে এবং ইতোমধ্যেই সেগুলোতে পচন ধরেছে।

ছবির উৎস, Reuters
মালিম একটি সাহায্য সংস্থার অফিসের কিছু ছবিও দেখান যেটি ধ্বংস করা হয়েছে ও লুটতরাজ চালানো হয়েছে।
"খুব খারাপ লাগছিল। আমার মনে হয়েছিল, ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে এরা মারা গেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রাস্তায় মরে পড়ে ছিল," আবেগকুল কণ্ঠে আমাকে বললেন তিনি।
সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে ফুটেজটি তিনি আমাদের দেখিয়েছিলেন সেই ভিডিওটি তিনি একটি ঝোপের আড়াল থেকে তুলেছিলেন।
এতে দেখা যাচ্ছে, একটি লরি থেকে এক গণকবরে মৃতদেহ ঢেলে দেয়া হচ্ছে।
"মৃতদেহগুলো কবর দিতে আমার জঙ্গলের মধ্যে কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আরএসএফ আমাদের সেটা করতে দেয়নি। আরএসএফ ট্রাক ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়েছিল একটি গর্ত খুঁড়ে মৃতদেহগুলিকে মাটি চাপা দিতে।" মালিম জানালেন আরএসএফ এরপর তাদের ঐ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
"মুসলিম রীতি অনুযায়ী তাদের দাফন করা উচিত ছিল। তাদের জন্য আমাদের প্রার্থনা করা উচিত ছিল। কিন্তু আরএসএফ জোর দিয়ে বলেছিল আবর্জনার মতো তাদের ফেলে দিতে।"

End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
কিন্তু লাশগুলো কার কিংবা কীভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে সে সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।
কিন্তু অনেক পরিবার যারা চাদে আশ্রয় নিয়েছে তারা আমাদের বলেছে যে আরএসএফ বিশেষভাবে পশ্চিম দারফুরে যুবক ও ছেলেদের টার্গেট করে হত্যা করছে।
গোপন আস্তানা থেকে জোর করে টেনে বের করে এনে তাদরে হত্যা করছে।
পরিবারগুলো বলছে, আরবিভাষী নয় এমন সম্প্রদায়ের সদস্যদের টার্গেট করা হয়েছে।
তারা আরএসএফ তল্লাশি চৌকিতে তাদের থামানোর বর্ণনা দিয়েছে এবং বলেছে, তাদের জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
তারা আমাদের জানিয়েছে, হত্যা করা হবে এই ভয়ে তারা কখনই স্বীকার করেনি যে তারা মাসালিত জাতিগোষ্ঠীর লোক।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বিবিসি আরএসএফ-এর সাথে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু তারা কোনও জবাব দেয়নি।
শুধু গত মে মাসে মাসালিত সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর একই রকম হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগটি তারা চলতি সপ্তাহে অস্বীকার করেছে।

তবে ১৩ই জুলাই জাতিসংঘের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সাথে মালিমের বর্ণনা মিলে যাচ্ছে।
এতে বলা হয়েছে, পশ্চিম দারফুরের একটি গণকবরে আরএসএফ-এর হাতে নিহত অন্তত ৮৭ জন মাসালিত এবং অন্যদের মৃতদেহ মাটিচাপা দিতে স্থানীয় জনগণকে বাধ্য করা হয়।
মালিমের ফোনে থাকা ফটো এবং ভিডিওগুলির মেটাডেটা পরীক্ষা করে জানা যাচ্ছে, ২০শে জুন থেকে ২১শে জুনের মধ্যে সেগুলি তোলা হয়েছিল।
জাতিসংঘের রিপোর্টে উল্লেখ করা তারিখের সাথে এটা মিলে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের মতোই মালিম আমাদের জানিয়েছেন যে মৃতদেহগুলি এল জেনেইনার পশ্চিমে আল-তুরাব আল-আহমার নামে পরিচিত এক খোলা জায়গায় একটি পুলিশ থানার কাছে মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মারাত্মক আহত কিছু লোক চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
মালিমের একটি ভিডিওতে মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে একজনকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়।
তার শুকনো ও ফাটা ঠোঁটের চারপাশে মাছি ভনভন করছিল এবং তিনি কথা বলার চেষ্টা করছিলেন।
মালিম জানান, ঐ ব্যক্তি আট দিন ধরে সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে ছিলেন।
এই ব্যক্তির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে তার আমরা জানতে পারিনি।
মালিম আমাদের বলেছেন, তিনি ঐ ভিডিওগুলি তুলেছিলেন কারণ তিনি তার নিজের শহরে কী ঘটছে তার সাক্ষ্য-প্রমাণ তিনি ধরে রাখতে চাইছিলেন।
কিন্তু শিগগীরই তিনি বুঝতে পারলেন যে ঐ শহরে থাকা তার জন্য আর নিরাপদ না।
"আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। কারণ, মৃতদেহ সরিয়ে নেয়ার সময় তারা কয়েকবার করে এমন সব লোককে খুঁজছিল যাদের কাছে মোবাইল ফোন ছিল।"

ছবির উৎস, Getty Images
দারফুরে আরব এবং কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান সম্প্রদায়গুলি বছরের পর বছর ধরে বিবাদে লিপ্ত রয়েছে।
দুই দশক আগে যখন বৈষম্যের অভিযোগ তুলে অনারব লোকেরা সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় তখন ভয়াবহ সহিংসতা শুরু হয়।
আরএসএফের জন্ম হয়েছিল কুখ্যাত জাঞ্জাউইদ আরব মিলিশিয়া থেকে।
এই গোষ্ঠীটি ঐ বিদ্রোহকে নির্মমভাবে দমন করেছিল এবং কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল।
জাঞ্জাউইদ মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নৃশংসতা এবং জাতিগত নিধনের অভিযোগ আনা হয়েছে, যাকে একবিংশ শতকের প্রথম গণহত্যা হিসাবে বর্ণনা করা হয়।
আরএসএফ এবং সুদানি সেনাবাহিনীর মধ্যে লড়াই শুরু হয় এপ্রিল মাসে।
এই যুদ্ধ দারফুরে নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিয়েছে বলেই দৃশ্যত মনে হচ্ছে।
গত মাসে মাসালিত জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আরএসএফ গণহত্যা চালিয়েছে এই অভিযোগ করার পর পরই পশ্চিম দারফুরের গভর্নরকে হত্যা করা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images
দারফুরের অনেক অংশে চলতি দফার সহিংসতা এলোমেলোভাবে চালানো হচ্ছে মনে হয় না।
আমরা এমন অনেক অভিযোগ শুনেছি যে আরএসএফ এবং তার সহযোগী আরব মিলিশিয়ারা মাসালিত-এর মতো কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান জাতিগোষ্ঠীর সিনিয়র ব্যক্তিত্বদের সুপরিকল্পিতভাবে টার্গেট করার চেষ্টা চালিয়েছে।
এর ফলে এসব জাতিগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষ প্রতিবেশী দেশ চাদে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
আরএসএফ বলছে, দু’হাজার এর দশকে দেখা জাতিগত সহিংসতার পুনরুজ্জীবন ঘটানো হচ্ছে এবং তারা এসব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়।
দারফুর থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার সুদানির মতোই মালিমের কাছে দেশে ফিরে আসার মতো খুব বেশি কিছু নেই।
তার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার পরিবারের সমস্ত সম্পত্তি লুট করা হয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বেদনাদায়ক যা তা হল, তার অনেক বন্ধু এবং পরিবারের অনেক সদস্য এখন আর জীবিত নেই।








