বোমা বন্ধ না হলে আলোচনা নয়, বিবিসিকে বললেন সুদানের জেনারেল হেমেডটি

মোহাম্মদ হামদান হেমেডটি ডাগালো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হেমেডটির বাহিনী রাজধানী নিয়ন্ত্রণ করছে। শক্ত অবস্থান আছে ডারফুরেও।

সুদানের লড়াইরত জেনারেলদের একজন, আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) প্রধান মোহাম্মদ হামদান হেমেডটি ডাগালো বিবিসিকে বলেছেন লড়াই বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো আলোচনায় যাবেন না।

দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত এই জেনারেল হেমেডটি নামে ভালোভাবে পরিচিত। তিনি বলেছেন তিনদিনের যুদ্ধবিরতির সময় তার যোদ্ধাদের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে।

“আমরা সুদানকে ধ্বংস করতে চাই না,” তিনি বলছিলেন এবং চলমান সহিংসতার জন্য তিনি দায়ী করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানকে।

জেনারেল বুরহান দক্ষিণ সুদানে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মতি দিয়েছিলেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘের কূটনৈতিক চেষ্টায় বৃহস্পতিবারে সেখানকার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিলো।

ফোনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে মি. হেমেডটি বলেছেন যে তিনি আলোচনায় রাজি কিন্তু শর্ত হলো যুদ্ধবিরতি মানতে হবে। “শত্রুতা বন্ধ করুন। এরপরেই আমরা আলোচনায় বসতে পারি”।

তিনি বলে জেনারেল বুরহানের সাথে তার কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নেই। তবে তিনি দেশটির ক্ষমতাচ্যুত শাসক ওমর আল বশিরের অনুগতদের সরকারের নিয়ে আসার অভিযোগ করে জেনারেল বুরহানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে প্রবল গণআন্দোলনের জের ধরে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ তাকে যৌথভাবেই ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছিলো।

বশিরের তিন দশকের রাজত্বকাল পরিচিত ছিলো ইসলামপন্থী আদর্শ ও শরিয়া আইন কার্যকরের জন্য।

“দু:খজনকভাবে বুরহান পরিচালিত হচ্ছে উগ্রবাদী ইসলামী নেতাদের দ্বারা,” হেমেডটি বলছিলেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

২০২১ সালে তিনি ও জেনারেল বুরহান ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি চুক্তি বাতিল করে দিয়েছিলেন।

কার্যত দেশটিতে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনা বিশেষ করে হেমেডটির এক লাখ সদস্যের শক্তিশালী আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে নিয়মিতকরণের সময়সীমা নিয়ে তাদের মধ্যে সমঝোতা ভেঙ্গে পড়েছিলো।

“আমি আজকেই বেসামরিক সরকার পেতে চাই। আগামীকাল নয়। একটি পূর্ণ বেসামরিক সরকার। এটাই আমার নীতি,” বিবিসিকে বলছিলেন হেমেডটি।

আরএসএফ প্রধানের গণতন্ত্রের প্রতি এমন অঙ্গীকার প্রকাশ নতুন কোনো বিষয় নয়। যদিও বিশ্লেষকরা অতীতে গণআন্দোলন দমাতে এই বাহিনীকে নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করে থাকেন।

হেমেডটি বলেন আরএসএফ যোদ্ধারা সেনাবাহিনীর সৈন্যদের শত্রু নয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে তারা গত ত্রিশ বছরের সরকারের ধ্বংসাবশেষ থেকে সুদানকে রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছিলেন।

“আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে লড়বো না। দয়া করে আর্মি ডিভিশনসে ফেরত যান এবং আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে লড়বো না”।

খার্তুম ছাড়ছে মানুষ।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, খার্তুম ছাড়ছে মানুষ।

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

হেমেডটি বিবিসির সাথে এমন সময় কথা বললেন যখন লাখ লাখ মানুষ খার্তুমে আটকা পড়ে আছে এবং সেখানে খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সংকট আছে।

শহরের কিছু জায়গায় পরিখা খনন করা হয়েছে কারণ রাস্তায় রাস্তায় প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো লড়াই করছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

জাতিসংঘ বলছে আরএসএফ যোদ্ধারা লোকজনকে বাড়িঘর থেকে বের করে লুটপাট ও চাঁদাবাজি করছে।

তবে হেমেডটি বিবিসিকে বলেছেন যে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা আরএসএফের ইউনিফর্ম করে এগুলো করছে তার যোদ্ধাদের অসম্মানিত করার জন্য।

লুটপাটসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছেন ১৪দিন আগে শুরু হওয়া সংঘর্ষ থেকে মুক্ত রাখতে তার যোদ্ধারা শহরবাসীকে সহায়তার চেষ্টা করছে।

“আমার টিম আমাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে কাজ করছে। দুঃখজনকভাবে টেকনিশিয়ান ও প্রকৌশলীদের পাওয়া যাচ্ছে না। এবং এটাই এখন বড় সমস্যা,” বলছিলেন তিনি।

দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে দু পক্ষে লড়াইয়ে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১২ জন মারা গেছে আর ৪ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে।

তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশী বলে মনে করা হয়।

সুদানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচশো মানুষ নিহত হয়েছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, সুদানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচশো মানুষ নিহত হয়েছে

জাতিসংঘ বলছে লাখ লাখ সুদানি বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে এবং প্রায়শই যাওয়ার জন্য তাদের টাকা দিতে হচ্ছে এবং যাত্রাপথে হয়রানির শিকার হচ্ছে।

জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স বলেছে অনেকে প্রায় চারশো কিলোমিটার হেঁটে খার্তুম থেকে দক্ষিণ সুদান সীমান্তে গেছে।

এদিকে তুরস্কের একটি উদ্ধারকারী বিমান খার্তুমের বাইরে একটি বিমানবন্দরে অবতরণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এতে কেউ হতাহত হয়নি আর কাজটি আরএসএফের বলে সেনাবাহিনী বললেও আরএসএফ সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

এখনো যারা খার্তুমে আছে তারা প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকার বর্ণনা দিচ্ছেন।

“আমরা বিমান আর বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। জানিনা কবে এটি শেষ হবে,” খার্তুমের উত্তরে বাহরি এলাকার অধিবাসী ৬৫ বছর বয়সী মাহাসিন আল আওয়াদ বলেছেন রয়টার্সকে।

ওদিকে সুদানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ডারফুর আল জেনেইনা শহরে সহিংসতা খুবই খারাপ রূপ নিয়েছে, যেখানে আরএসএফ ও মিলিশিয়াদের গ্রুপ গুলো লুটপাট এবং বাজার, ব্যাংক ও এইড ওয়্যারহাউজগুলোতে আগুন দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।