ত্রিবেণীর 'প্রাচীন হিন্দু উৎসবের' ভিত্তি কি অক্সফোর্ডের বিকৃত থিসিস?

ছবির উৎস, Ananda Das
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২২ সাল থেকে যে 'ত্রিবেণী কুম্ভ' মেলা শুরু হয়েছে, শুরুতে তা সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে এটি এক প্রাচীন উৎসব - যা ৭০০ বছর আগে এক মুসলিম শাসকের আক্রমণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পিএইচডি থিসিসের বিকৃতি ঘটিয়ে সেটিকে এই হিন্দু উৎসবের 'ঐতিহাসিক প্রমাণ' বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
ওই প্রাচীন উৎসব, যেটিকে 'কুম্ভ মেলা' বলে দাবী করা হচ্ছে, তার ‘খোঁজ’ পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মেলার উদ্যোক্তাদের সরকারিভাবে প্রশংসা করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার ত্রিবেণীতে ২০২২ সাল থেকে এই কুম্ভ মেলা শুরু হয়। দাবী করা হচ্ছে যে 'সাতশো বছরেরও বেশি আগে এ মেলা অনুষ্ঠিত হত এবং এক মুসলমান শাসকের আক্রমণের পর থেকে মেলাটি বন্ধ হয়ে যায়'।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষকরা এই তথ্য বিকৃতির ঘটনায় হিন্দুত্ব ‘ইকো-সিস্টেম’-এর স্পষ্ট হাত দেখতে পাচ্ছেন।
ঠিক যেভাবে নানা জায়গায় হিন্দু মন্দির ভাঙা বা হিন্দুদের প্রথা বন্ধ করে দেওয়ার পিছনে মুসলমান শাসকদের হাত ছিল বলে ‘ঐতিহাসিক প্রমাণ’ সামনে নিয়ে আসা হয়, সেভাবেই হুগলী জেলার ত্রিবেণীতে প্রাচীন কুম্ভ মেলার ‘উদ্ভাবন’ তাদেরই কাজ বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ওই মেলার অস্তিত্বের অন্যতম প্রমাণ হিসাবে হাজির করা হয়েছিল, ১৯৭৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া একটি থিসিসকে।
তার ওপরে ভিত্তি করে একাধিক প্রচার পুস্তিকা লেখা হয়েছে, এমনকি সরকারী কর্মকর্তারা তাদের ভাষণেও ওই থিসিসের কথা উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু এখন ওই থিসিসের লেখক, নৃতত্ত্ববিদ অ্যালান মরিনিস বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে তার মূল থিসিসের একটি বাক্য সম্পূর্ণভাবে বদলিয়ে দিয়ে সেটিকেই ‘কুম্ভ মেলা’র ঐতিহাসিক প্রমাণ বলে দাবী করা হচ্ছে।
যারা অক্সফোর্ডের ওই থিসিসের ভিত্তিতে কুম্ভমেলার অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন আগে, তারা সবাই বলছেন, কেউ তাদের কাছে ওই থিসিসটা পাঠিয়েছিল, তার ভিত্তিতেই তারা কথা বলেছিলেন বা লিখেছিলেন।
সেটি যে বিকৃত করা হয়েছে, সেটা তারা জানতেন না।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Alan Morinis
যেভাবে বদলে দেওয়া হয়েছে অক্সফোর্ডের থিসিস
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কানাডিয়ান নৃতত্ত্ববিদ অ্যালান মরিনিস ভারতে আসেন ১৯৭৪ সালে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট করার জন্য বিষয় খুঁজতেই তিনি ভারতে এলেও প্রাথমিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে তাদের স্মল পক্স বা গুটি বসন্ত দূরীকরণের কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন।
ভারতে থাকাকালীনই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু তীর্থক্ষেত্রগুলি নিয়ে গবেষণার কথা মাথায় আসে। সেটাকেই তিনি অক্সফোর্ডে তার পিএইচডির বিষয় হিসাবে বেছে নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ড. মরিনিস বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, “এটা চিরাচরিত অর্থে নৃতত্ত্বের বিষয় নয়। কিন্তু আমি যখন যুক্তি দিয়ে বোঝাই বিষয়টা, তারা মেনে নেন। পরবর্তী একবছর আমি হিন্দু তীর্থক্ষেত্রগুলোতে পায়ে হেঁটে ঘুরেছি, কখনও হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে, কখনও বা লাখো তীর্থযাত্রীর সঙ্গে।“
সঙ্গে চলেছিল তার তথ্য যোগাড়ের কাজ। তার ভিত্তিতেই তিনি ১৯৭৯ সালের জুন মাসে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেন তার পিএইচডি থিসিস : ‘হিন্দু পিলগ্রিমেজ উইথ পার্টিকুলার রেফারেন্স টু ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া’।
ড. মরিনিস দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন, এবং এখনও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ যেমন রয়েছে এই রাজ্যের সঙ্গে, তেমনই ভারতের বিষয়েও নিয়মিতভাবেই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
“সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার ইমেইলে যোগাযোগ হয় এবং তিনি আমাকে একটি পিডিএফ ফাইল পাঠান। আমার কাছে থাকা মূল ডিসার্টেশনের সঙ্গে ওই পিডিএফটি মিলিয়ে দেখে আমি নিশ্চিত হই যে মূল লেখা বদলিয়ে দেওয়া হয়েছে,” জানাচ্ছিলেন ড. মরিনিস।
মাত্র একটি বাক্য বদলানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলছেন, “আমি লিখেছিলাম “At the present time, the principal attraction of Tribeni is the sacred Ganges River, as is reflected in its annual festival calendar, which celebrates every sankranti (auspicious for a bath in the Ganges), the festival of Varuna, the god of water, ….”
অর্থাৎ, বর্তমানে ত্রিবেণীর মূল আকর্ষণ হল পবিত্র গঙ্গা নদী; উৎসবের বার্ষিক তালিকায় আছে যে প্রতি সংক্রান্তিতে (গঙ্গায় পবিত্র স্নান) জলের দেবতা বরুণের উৎসব পালিত হবে।
নিজের থিসিসের যে বিকৃত রূপটি তিনি পেয়েছেন, সেখানে লেখা হয়েছে:
“At the present time, the principal attraction of Tribeni is the sacred Ganges River, as is reflected in its annual festival calendar, which celebrates every sankranti (a Kumbha-mela was held here in past), the festival of Varuna, the god of water, ….”
বাকি সব কিছু ঠিক রেখে ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা হয়েছে ‘পূর্বে এখানে একটি কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হত।‘
“শুধুই যেটুকু অংশ ব্র্যাকেটের মধ্যে আছে, সেটাই বদলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি কখনই লিখি নি যে সেখানে কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হত,” বলছেন নৃতত্ত্ববিদ অ্যালান মরিনিস।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে বিকৃত করা শব্দবন্ধে লেখা আছে was here in past, এবং এখানে তিনি হলে লিখতেন ‘in the past’। তার মতে, the শব্দটা সম্ভবত বাদ দিতে হয়েছে অক্ষর সংখ্যা মেলানোর জন্য।

ছবির উৎস, Alan Morinis
কে করে থাকতে পারে এই কাজ?
ড. মরিনিস বলছেন, তিনি জানেন না যে কে বা কারা তার থিসিস বিকৃত করে কুম্ভ মেলার ঐতিহাসিক প্রমাণ বলে দাবী করেছেন। তবে তিনি এটা বলছেন, এমন কেউ এটা করেছেন, যাদের স্বার্থ আছে।
কোনও একজন ব্যক্তির কাজ নয় এটা, তাও মনে করছেন তিনি। তার কথায়, যে ফন্ট ব্যবহার করে থিসিসটি বদলানো হয়েছে, সেই ফন্ট এখন পাওয়াই যায় না। তার থিসিস টাইপ করা হয়েছিল ইলেক্ট্রনিক টাইপ রাইটারে। অথচ বিকৃত থিসিসটিতে সেই ফন্ট খুঁজে বার করে ব্যবহার করা হয়েছে।
এটা একাধিক ব্যক্তির কাজ বলেই তিনি মনে করেন, কিন্তু সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীটি যে কে, সে ব্যাপারে ড. মরিনিসের কোনও ধারণা নেই।

ছবির উৎস, Mygovindia youtube screengrab
নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসা
ড. মরিনিসের থিসিস কে বা কারা বিকৃত করেছে, তা নিয়ে তার কোনও ধারণা না থাকলেও, ওই বিকৃত থিসিসের ভিত্তিতে প্রাচীন হিন্দু উৎসব কুম্ভ মেলা খুঁজে পাওয়ার জন্য মেলার সংগঠকদের প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
প্রতি মাসে মি. মোদী ‘মন কি বাতেঁ’ নামে যে রেডিও ভাষণ দেন, ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ তারই ৯৮ তম এপিসোডে তিনি বিষয়টির উল্লেখ করেছিলেন।
মি. মোদী বলেছিলেন, “এখন আমি যা বলব, তা নিঃসন্দেহে আপনাদের খুশি করবে… আপনারা আমাদের ঐতিহ্যের জন্য গর্বিত হবেন। আমেরিকা নিবাসী শ্রীমান কাঞ্চন ব্যানার্জী এরকমই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার এরকমই এক প্রচেষ্টার ব্যাপারে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই।
“বন্ধুরা, পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার বাঁশবেড়িয়ায় এই মাসেই ‘ত্রিবেণী কুম্ভ মহোৎসব’ পালিত হয়েছে। আট লক্ষেরও বেশি মানুষ তাতে অংশ নিয়েছেন.. কিন্তু জানেন এটার বিশেষত্ব কি? এটা বিশেষ একারণে যে এই প্রথাটি প্রায় ৭০০ বছর পরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে,“ রেডিও ভাষণে বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদী।
তার ভাষণে ত্রিবেণী কুম্ভ মেলার সঙ্গে যুক্তদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী এবং আরও বেশ কিছক্ষণ ধরে মি. মোদী ত্রিবেণী অঞ্চলটির ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব, কোন কোন ঐতিহাসিক দলিল ও প্রাচীন সাহিত্যে ত্রিবেণীকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তারও বর্ণনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী যে কাঞ্চন ব্যানার্জীর কথা উল্লেখ করেছিলেন তার রেডিও অনুষ্ঠানে, তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি বাংলা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মি. ব্যানার্জী ত্রিবেণী কুম্ভ পরিচালনা সমিতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সমিতিটির কাজকর্মের পথ প্রদর্শন করেন অবশ্য হিন্দু ধর্মীয় গুরুরা।

ছবির উৎস, Ananda Das
শুধু ওই থিসিস নয়, অন্য তথ্যও রয়েছে
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস বিকৃত করা নিয়ে মি. ব্যানার্জীর কাছে বিবিসি কয়েকটি প্রশ্ন পাঠিয়েছিল। তার একটা দীর্ঘ লিখিত জবাব দিয়েছেন মি. ব্যানার্জী।
তিনি লিখেছেন, “যারা ঐতিহ্য মেনে চলেন না এবং যারা ঐতিহ্যের ব্যাপারে উদাসীন, তারা কখনই হিন্দু ঐতিহ্যের বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে পারবেন না, যেমন একজন কবি যদি পদার্থ বিদ্যা বোঝার চেষ্টা করেন।
তিনি আরও লিখেছেন, “হুগলীর ত্রিবেণীর গুরুত্ব বুঝতে গেলে কারও ইতিহাস বা পুরাতত্ব, অথবা বিদেশীদের লেখা নথির প্রয়োজন নেই।“
তার যুক্তি, ত্রিবেণী নামটার অর্থই হল তিনটি নদীর সঙ্গমস্থল। ঠিক যেমনটা তিন নদীর সঙ্গমস্থল হিসাবে এলাহাবাদ বা বর্তমানের প্রয়াগরাজ হিন্দুদের কাছে অতি পবিত্র, হুগলীর ত্রিবেণীও সেরকমই পবিত্র।
তিনি রঘুনন্দনের ‘প্রায়শ্চিত্ত তত্ব’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, “দক্ষিণ প্রয়াগ উন্মুক্ত বেণী সপ্ত গ্রামোখ্যা / দক্ষিণ দেশে ত্রিবেণী খ্যাতঃ”।
কাঞ্চন ব্যানার্জী এবং ত্রিবেণী কুম্ভ পরিচালনা সমিতির ব্যাখ্যা - হুগলীর ত্রিবেণীকেই দক্ষিণের প্রয়াগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এখানে।
আবার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা মাধবাচার্যর কথা লিখেছেন মি. ব্যানার্জী। ওই কবি ত্রিবেণীতেই থাকতেন।
ভারতের যে চারটি শহরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কুম্ভ মেলা এবং মহাকুম্ভ হয়, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন মি. ব্যানার্জী।
অবশেষে তার লেখায় ড. অ্যালান মরিনিসের থিসিসের প্রসঙ্গে এসেছেন কাঞ্চন ব্যানার্জী।
তাদের কাছে “ড. মরিনিসের থিসিসের যে ভাষ্যটি এসেছিল”, তার থেকেই উদ্ধৃত করেছেন মি. ব্যানার্জী।
ড. মরিনিসের যে থিসিসটি পেয়েছিলেন বলে দাবী করছেন মি. ব্যানার্জী, সেখানেও সেই বাক্যটি রয়েছে, যেটিকে ড. মরিনিস বলছেন বিকৃত করা হয়েছে।
তবে যে ভাষ্যটিকে ড. মরিনিস তার থিসিসের বিকৃত রূপ বলে জানাচ্ছেন, সেটি তাদের কাছে 'কেউ' পাঠিয়েছিল বলে দাবী কাঞ্চন ব্যানার্জীর।

ছবির উৎস, Getty Images
ত্রিবেণীতে কুম্ভমেলার ইতিহাস কোথাও পাওয়া যায় না
ত্রিবেণী অঞ্চলের প্রাচীন ধর্মীয় গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে চণ্ডীমঙ্গল বা প্রায়শ্চিত্ত তত্বের মতো বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন মি. কাঞ্চন ব্যানার্জী।
কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন প্রাচীন সাহিত্যকর্মগুলি সমসাময়িক যুগের একটা বর্ণনা ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে রচয়িতার নিজস্ব বিশ্লেষণও থাকে।
গবেষকরা বলছেন বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে যত ঐতিহাসিক গ্রন্থ আছে, সেগুলির কোথাও ত্রিবেণীতে কুম্ভ মেলা হত, এমন তথ্য তারা পান নি।
পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন বলেছেন, এই প্রসঙ্গে সবথেকে প্রামাণ্য গ্রন্থ হচ্ছে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের দ্য অ্যানালস অফ বেঙ্গল বইটি। সেখানে রাঢ় বাংলা থেকে শুরু করে প্রাচীন বাংলার সব ঐতিহ্য, লুকিয়ে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি এবং উৎসবের তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।
"এমনকি আমি সম্প্রতি কৌম সম্প্রদায়, অর্থাৎ ভারতবর্ষের যারা মূলনিবাসী বা অ্যাবরিজিনাল, তাদের একটা উৎসবে গিয়েছিলাম, সেটাও একটা স্নানেরই উৎসব, তারও উল্লেখ আমি হান্টারের বইতে পেয়েছি। কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও এই তথ্য আমি পাই নি যে ত্রিবেণী সঙ্গমে কুম্ভ মেলা হত।“
মি. হান্টারের বই ছাড়াও দীনেশ চন্দ্র সেন বা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বইপত্রও খুঁজে দেখেছেন শরদিন্দু উদ্দীপন। সেখানেও কুম্ভ মেলার কথা নেই।
মি. উদ্দীপনের ব্যাখ্যা, “এই যে মকর সংক্রান্তিতে পুণ্য স্নানের বিষয়টা হিন্দু সমাজে চালু আছে, এটা আর্যদের বিষয়ই নয়। এটা কৌমদের একটা ঐতিহ্য। তাদের সমাজে এটাকে সাঁকরাত বলা হয়। সাঁকরাত একটি অস্ট্রিক শব্দ।
এর সঙ্গে নানা লোকগাথা জড়িয়ে আছে এবং সবগুলি কাহিনীর শেষেই স্নানের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে, আর্যরা স্নানের ব্যাপারটিকে আত্মীকরণ করে নেয় নিজেদের ধর্মীয় আচারের অংশ হিসাবে।“

ছবির উৎস, Snigdhendu Bhattacharya
কুম্ভ মেলার পাশেই দরগাহ
ত্রিবেণী কুম্ভ পরিচালনা সমিতি এই হিন্দু উৎসব পুনর্প্রবর্তনের যুক্তি-ব্যাখ্যার মধ্যেই আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে এনেছে।
প্রথমটি হল, তারা বারবার বলছে আর লিখছে যে হুগলীর ত্রিবেণীতে কুম্ভ মেলা প্রায় ৭০০ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। এটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাতেঁ’-তেও বলেছেন।
আর দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করছেন কুম্ভ মেলার আয়োজকরা - সেটি হল ওই জায়গায় একটি দরগাহর প্রসঙ্গ।
এখন এই ৭০০ বছর আর দরগাহর প্রসঙ্গটি এইভাবে আনা হয়েছে, যে ১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দে হুগলীর এই এলাকায় আক্রমণ চালান জাফর আলি খান গাজি। তিনি বহু স্থানীয় মন্দির ধ্বংস করে দেন, হিন্দু তীর্থযাত্রীদের হত্যা করেন।
“তখন থেকেই কুম্ভ মেলা বন্ধ হয়ে যায়,” বিবিসিকে জানিয়েছেন কাঞ্চন ব্যানার্জী।
তার কথায়, “বর্তমানে সেখানে যে দরগাহ এবং মসজিদটি আছে, সেটা দুটি মন্দির ধ্বংস করে গড়া হয়েছিল। সম্ভবত মন্দির দুটি ছিল সূর্য এবং বিষ্ণুর। ডি মানি, এইচ ব্লচম্যান, ডি হান্টার, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং যদুনাথ সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ দিয়েছেন।“
জাফর খানের হিন্দু মন্দির ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছেন গোলাম মুরশিদ তার ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ বইতেও।
গোলাম মুরশিদ লিখেছেন, ত্রিবেণীতে তিনি (জাফর খান) একটি বিরাট মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তরবারি দিয়ে ধর্ম প্রচারের একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য নজির হল এই মসজিদ।
“বারোশো আটানব্বই সালে নির্মিত তার এই মসজিদে যে পাথর ব্যবহৃত হয়েছে, সেসব পাথরের অনেকটারই উল্টোদিকে আছে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি। তা ছাড়া, এই মসজিদের ওপর উৎকীর্ণ শিলালিপিতে গর্ব করে তিনি বলেছেন, কিভাবে তরবারি দিয়ে কাফেরদের তিনি বিনাশ করেছেন। এর কাছেই নির্মিত হয় তাঁর নিজের মাজার। ১৩১৩ সালে নির্মিত এই মাজারও তৈরি হয়েছে 'কাফেরদের' মন্দিরে ব্যবহৃত পাথর দিয়ে।"

End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
থিসিস বিকৃতিতে হিন্দুত্ববাদী যোগ?
ড. অ্যালান মরিনিস জানিয়েছিলেন যে কারা তার থিসিস বিকৃত করেছেন, সে ব্যাপারে কোনও ধারণাই নেই তার।
কিন্তু কোনও একজন ব্যক্তির কাজ নয় এটা, সেটাও তার মনে হয়েছে এবং এমন কোনও গোষ্ঠী এ ঘটনার পিছনে রয়েছে, তাদের স্বার্থ জড়িত আছে বলেই তিনি মনে করেন।
একটা ‘প্রাচীন হিন্দু উৎসব’ ফিরিয়ে আনা বা মুসলমান শাসকের দ্বারা হিন্দু মন্দির ধ্বংসের কথা তুলে আনার পিছনে যে 'হিন্দু পুনরুত্থানবাদী'দের স্বার্থ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।
আর হিন্দু পুনরুত্থান বা পুনর্জাগরণের কথা ভারতে প্রচার করে থাকে যেসব সংগঠনগুলি, তারা প্রায় সকলেই কোনও না কোনও ভাবে হিন্দুত্ববাদী ‘ইকো-সিস্টেম’এ জড়িত।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, “হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস-চিন্তা ভীষণভাবেই একমুখী। সেই চিন্তায় তারা বিশ্বাস করে যে একসময়ে ভারতে একটা স্বর্ণযুগ ছিল, তারপরে আক্রমণকারী মুসলমান শাসকরা এদেশে আসে এবং হিন্দুদের যে প্রাচীন সংস্কৃতি, তা ধ্বংস করে দেয়।
“সেই সময়টাকে এরা বলে থাকে গোলামির যুগ। সেই সময়ে যা কিছু অত্যাচার হয়েছে, যে সব ধর্মীয় স্থান ধ্বংস করা হয়েছে, তা সব পুনরুদ্ধার করতে হবে। ভারতের ইতিহাস থেকে মধ্যযুগটাকে মুছে ফেলতে চায় তারা,” বলছিলেন মি. মুখোপাধ্যায়।
তিনি বলছিলেন, “এই ইকো সিস্টেম কীভাবে কাজ করে, তার দুটো সাম্প্রতিক উদাহরণ আছে। কিছুদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে সেঙ্গল নামে যে রাজদণ্ড রাখা হয়েছে, সেটার ব্যাপারে যেভাবে ইতিহাস বিকৃত করে সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, এই কুম্ভ মেলার ক্ষেত্রেও অধ্যাপক মরিনিসের থিসিস বিকৃত করে সেটাকেই ধ্রুব সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে।“
কুম্ভ মেলা পরিচালন সমিতির পক্ষে মি. কাঞ্চন ব্যানার্জী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ত্রিবেণীর ইসলামি নিদর্শনগুলি সংশোধন করার কোনও পরিকল্পনা তাদের নেই।








