ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার রাজনীতি কি থমকে গেল

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সাথে গত বছর জানুয়ারিতে বরিশালে গিয়ে দেখা করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

ছবির উৎস, Islami Andolon

ছবির ক্যাপশান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সাথে গত বছর জানুয়ারিতে বরিশালে গিয়ে দেখা করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন '১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য' থেকে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ার পর ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট 'এক বাক্সে' আনার চেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়লো কি-না সেই প্রশ্ন উঠছে।

অবশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে 'অনৈক্য আর বিবাদ' এতই তীব্র ও দৃশ্যমান যে, এসব দলের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হওয়া কতটা সম্ভব সেই আলোচনাও আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা এখনো 'এক বাক্স নীতিতে' আছে এবং দলটি মনে করছে 'ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে' আনার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

তবে ইসলামী আন্দোলন বলছে, 'ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবেন না' বলে জামায়াতের আমির যেই ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি দুই দলের মধ্যে আদর্শিক দূরত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং এই 'আদর্শিক দূরত্ব'ই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী জোট করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, নির্বাচনী ঐক্য না হলে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন- উভয় দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তবে নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড অনৈক্য নিয়ে 'ইসলামপন্থীদের ভোট' এক বাক্সে আনার কথা কিসের ভিত্তিতে বলা হয়েছিল তা তারা কখনোই পরিষ্কার করতে পারেনি।

তারা অবশ্য এও বলছেন যে, এবারের চেষ্টাটি এ ধরনের দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসিয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তারা জোটবদ্ধ না হতে পারলেও প্রচেষ্টাটির একেবারে মৃত্যু হয়ে যাবে না বলেই মনে করছেন তারা।

প্রসঙ্গত, শুক্রবারই ইসলামী আন্দোলন জামায়াত জোটে না থেকে ২৬৮ আসনে দলীয় প্রার্থীদের এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে।

ওই দিনের সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছিলেন, "ওয়ান বক্স পলিসির মাধ্যমে ইসলামপন্থি শক্তি এক করার যে চেষ্টা ছিল, সেটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই নিজেদের মতো নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন"।

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা

ছবির উৎস, Islami Andolan Bangladesh

ছবির ক্যাপশান, সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা

টানাপড়েন ও বিচ্ছেদের কারণ কী

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার লক্ষ্য নিয়ে একটি জোট গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই।

জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের চরমোনাইয়ে গিয়ে চরমোনাই পির হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সাথে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের 'সৌজন্য সাক্ষাতে'র ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল।

দলটির নেতারা তখন বলেছিলেন 'পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভেদাভেদ ভুলে এক হয়ে কাজ করতে হবে'- এটি কে 'থিম' ধরে ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে 'মতবিনিময়' শুরু করেছেন তারা, যার মূল লক্ষ্য হলো পরবর্তী সংসদ নির্বাচন"।

এর ধারাবাহিকতায় গত নয় মাস আগে নির্বাচনে আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামী দল।

কিন্তু সেই সংসদ নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময় আগে সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন জানালো যে, তারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই নির্বাচনী জোটে না থেকে আলাদাভাবেই নির্বাচন করতে যাচ্ছে।

নির্বাচনী জোট তৈরির প্রক্রিয়ায় থাকা বিভিন্ন দলের কয়েকজন নেতার সাথে আলোচনা করে যে ধারণা পাওয়া গেছে সেটি হলো- জোটের ভেতরে আসন বণ্টন নিয়ে বনিবনা না হওয়া এবং এ নিয়ে জামায়াতের কর্তৃত্ব সুলভ আচরণ ক্ষুব্ধ করেছে চরমোনাই পির হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম।

বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের ১০টি দলের মধ্যে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়।

এতে জানানো হয়, ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা দলগুলোর মধ্যে মোট ২৫৩ আসনে সমঝোতা হয়েছে।

পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না – বুধবার দলটির আমিরকে উদ্ধৃত করে এমন খবর গণমাধ্যমে আসার পর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে ইসলামী আন্দোলনের ভেতরে।

"তারা আমাদের বলেছিল ক্ষমতায় গেলে ইসলামের বিধি বিধান ও শরিয়াহ আইন করবে। কিন্তু এখন তারা সেখানে থেকে সরে গেছে। মৌলিক জায়গা থেকে সরে যাওয়ায় তাদের ওপর আস্থা রাখা কঠিন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সংবাদ মাধ্যমকে এ বিষয়ে বলেছেন, "আমিরে জামায়াত বলেছেন, বাংলাদেশে যে বিদ্যমান আইন সে আইনেই বাংলাদেশ চলবে, যেখানে সব ধর্মের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা হবে। এই আইনটাই যথেষ্ট এখন"।

বাংলাদেশে আগামী বারোই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

ছবির উৎস, BBC/Shyadul Islam

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে আগামী বারোই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

থমকে গেল এক বাক্সের রাজনীতি?

নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থিদের ভোটের পক্ষে একটি প্রচারণা শুরু হয়েছিল। এতে 'ভোট দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে' কিংবা 'বেহেশতের টিকেন' কিংবা 'ঈমানের জন্য ভোট' -এমন ধরনের মন্তব্য গত কিছুদিন ধরে আলোচনা সমালোচনায় আসছিলো।

কিন্তু এর মধ্যেই শরিয়াহ আইন নিয়ে জামায়াত আমিরের মন্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে।

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান স্বীকার করেছেন যে, জোট না হলে তারা সবাই কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কিন্তু "ইসলামের সঠিক ধারা টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ সহজ সরল মানুষ আমাদের ওপর আস্থা রাখে। তাদের বিশ্বাস ও আস্থার মূল্য আমাদের দিতে হবে"।

যদিও বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও এর সাথে ঘনিষ্ঠ বামশক্তির বাইরে বিএনপি-জামায়াতসহ অনেকগুলো দলই ইসলামপন্থিদের ভোট কম বেশি পেয়ে আসছে।

কিন্তু এবার তাদের মতে, এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও ডাইমেনশন ভিন্ন, কারণ আওয়ামী লীগ ও তাদের ঘনিষ্ঠ বামশক্তি এই নির্বাচনে নেই।

"ইসলামপন্থি ভোটার আসলে কারা এবং ইসলামপন্থি ভোট যারা এক বাক্সে আনার কথা বলেছিলেন সেটা তারা কোন চিন্তায় বলেছিলেন সেটা তারা পরিষ্কার করেননি। যদিও এটি একটি আবেগ তৈরি করছিল এবং বিএনপির জন্য তা কিছুটা চিন্তার কারণ হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী জোট না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে জামায়াত ও ইসলামি আন্দোলন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইসলামিক বিষয়ক লেখখ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ তীব্র

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMANAFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ তীব্র

যদিও কেউ কেউ আবার বলে থাকেন, ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক দলের চরিত্র নিয়ে তৈরি হওয়া সংগঠন কম।

কোনো কোনো দল শুধুই মুরিদ নির্ভর, আবার কোনো কোনো দল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কয়েকটি জায়গায় সীমাবদ্ধ।

"অনেক দল নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার নয়। অনেক দলের সাথেই জনমানুষের যোগসূত্র কম। ইসলামী আন্দোলন সরে যাওয়ায় 'ওয়ান বক্স' পলিসি কার্যকর না হলেও জামায়াত বা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষতিগ্রস্ত হবে না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।

যদিও শরীফ মুহাম্মদ বলছেন, নির্বাচনী জোট না হলে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর জেরে দেখা যাবে কিছু আসনে অল্প ভোটের জন্য দল দুটির প্রার্থীরা বিপর্যয়ে পড়বে।