'ভাড়াটে সৈন্য' হিসেবে রাশিয়ার পক্ষে লড়ছে বাংলাদেশি তরুণরা, তারা যুদ্ধে জড়াচ্ছে কীভাবে?

- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ১৫ মিনিট
"প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পারবো, এটা কল্পনাও করতে পারতাম না। যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ ছিল," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা মোহন মিয়াজি।
মি. মিয়াজি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউক্রেনের বিপক্ষে যুদ্ধে গিয়েছিলেন।
এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে যে ভয়বহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, "চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই দেখা যায় মানুষ মরে পড়ে রয়েছে।"
"আসলে ফ্রন্টলাইন (সম্মুখযুদ্ধ) মানে প্রতিটা সেকেন্ডেই মৃত্যুর ভয়। সব সময় গুলি, আর্টিলারি, ড্রোন হামলা চলতেই থাকে...যেখানে-সেখানে ল্যান্ডমাইন। হাঁটার সময় একটু এদিক-সেদিক হলেই মাইন বিস্ফোরণ হয়ে প্রাণ চলে যেতে পারে," যোগ করেন মি. মিয়াজি।
এই যুদ্ধে তার এক বন্ধুও প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানান।
"আমার বন্ধু আশিকুর, ওর বাড়ি নোয়াখালী, সেও আমার সঙ্গে একসাথে যুদ্ধ গিয়েছিল। কয়েক মাস আগে ও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মারা গেছে," বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে মি. মিয়াজির।
খাবারের কষ্টের বিষয়ে বলেন, "যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে প্রায়ই খাবার পৌঁছাতে সমস্যা হয়। তখন দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়।"
এমন পরিস্থিতিতে রুশ সৈন্যশিবির থেকে পালিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন মুন্সিগঞ্জের এই তরুণ। যদিও পালিয়ে আসার বিষয়টি সহজ ছিল না।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
"সেনাক্যাম্পের চারপাশে সব সময় কড়া গার্ড থাকে। পালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু আমার কিছুদিনের ছুটি ছিল। তখন ক্যাম্পের বাইরে এসে সেখান থেকে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির সহায়তায় দেশে ফিরে এসেছি," বলেন মি. মিয়াজি।
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশটির অনেক নাগরিক এখনও রাশিয়ার পক্ষে লড়ছেন।
সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে তারা প্রাণ হারাচ্ছেন, হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্বও বরণ করছেন কেউ কেউ।
কারো কারো ক্ষেত্রে আবার মাসের পর মাস কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কী বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন?- জানেন না দেশে থাকা স্বজনরা।
কিন্তু ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধে কেন এবং কীভাবে জড়িয়ে পড়ছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা?
অনুসন্ধানে বিবিসি বাংলা এমন একটি দালাল চক্রকে খুঁজে পেয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ভালো চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষদের রাশিয়া নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
দালালদের এই চক্রটির সঙ্গে ভারতীয় দু'জন নাগরিকের জড়িত থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, পড়াশোনা ও কাজের সুবাদে বাংলাদেশ থেকে যারা রাশিয়া যাচ্ছেন, তাদের মধ্য থেকেও অনেকে মোটা অর্থ ও স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও জানা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Mohan Miajee
রাশিয়ায় কাজে গিয়ে যুদ্ধে জড়াচ্ছে যেভাবে
যুদ্ধে যাওয়ার মাস ছয়েক আগে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনা একটি তেল-গ্যাস কোম্পানিতে কাজ করতে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মোহন মিয়াজি। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই চাকরিটা ছেড়ে দেন তিনি।
"কোম্পানিটা বেতন-ভাতা ভালোই দিতো, কিন্তু সাইবেরিয়া অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ছিল। গড় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি নিচে নেমে যেত। চারদিকে বরফে ঢাকা। সেজন্য সবাই অতিষ্ঠ হয়ে অন্য কোম্পানিতে কাজের সুযোগ খুঁজছিল," বলছিলেন মি. মিয়াজি।
এর মধ্যে ওই কোম্পানিতে কর্মরত আরেক বাংলাদেশি চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
"আমার ওই সহকর্মীর নাম সোহেল। সে আমার পাশের রুমে থাকতো। রাশিয়ায় আসার আগে বাংলাদেশে যখন মেডিকেল (স্বাস্থ্য পরীক্ষা) করি, তখনও আমরা একসঙ্গেই করছিলাম। সে রাতের আঁধারে পালিয়ে যুদ্ধে চলে যায়," বলেন মোহন মিয়াজি।
ওই সহকর্মীর পরামর্শ ও উৎসাহেই পরবর্তীতে রুশ সেনাবাহিনীর যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান মুন্সিগঞ্জের এই তরুণ।
"যুদ্ধে যাওয়ার পর সোহেল একটা হটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলে। সেখানে সে যুদ্ধের বিভিন্ন ভিডিও শেয়ার করতে থাকে এবং সবাইকে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে ইন্সপায়ার (উৎসাহিত) করতে থাকে," বলেন মি. মিয়াজি।
তিনি আরও বলেন, "সোহেল বলেছিল, সেখানে সে ভালো আছে। তাকে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়া লাগেনি। ক্যাম্পেই বিভিন্ন কাজ করে। আমরা যোগ দিলে আমাদেরও যুদ্ধে পাঠানো হবে না। সেজন্য রাজি হয়েছিলাম।"
রাজি হওয়ার পর সোহেল নামের ওই সহকর্মী একজন রুশ নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন মোহন মিয়াজিকে। সেই নারীই পরবর্তীতে তাকে রুশ সেনা দফতরে নিয়ে যান।
"সেখানেও ওই ম্যামকে আমি জানিয়েছিলাম যে, সরাসরি যুদ্ধ যেতে চাই না। আমি যেহেতু ইলেক্ট্রনিক কাজে স্কিলড (দক্ষ), সেজন্য ওইকাজে দিতে বলছিলাম। ম্যামও বললো, হ্যাঁ, ওখানে এই কাজ আছে," বলেন মি. মিয়াজি।
কিন্তু কিছুদিন না যেতেই বাংলাদেশি এই তরুণের বুঝতে বাকি থাকে না যে, তাকে আসলে মিথ্যা বলা হয়েছে।
"ওই ম্যামের কথামত ক্যাম্পে কমান্ডারকে আমি আমার সব স্কিলস দেখাই। কিন্তু সে আমাকে বলে, আপনি ইলেক্ট্রনিক কাজে এক্সপার্ট আছেন, কিন্তু আপনার তো এখানে কন্ট্রাক্ট (চুক্তি) হয়েছে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। কাজেই আপনাকে অন্য কাজে দেওয়ার কোনো স্কোপ (সুযোগ) নেই। সে (রুশ নারী) আপনার সাথে প্রতারণা করেছে," বলছিলেন মি. মিয়াজি।

ছবির উৎস, Tain's Family
'বেশিরভাগই হয় পঙ্গু, না হয় মৃত'
মি. মিয়াজি চীনা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন, সেখানকার এক ডজনেরও বেশি কর্মী পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে বর্তমান ও সাবেক কর্মীরা।
যারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার।
মি. মিয়াজির মতো তারাও মি. সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। যদিও বর্তমানে রুশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে কেউই নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
"সোহেল আমাদেরকে বলতো, বিদেশি নাগরিক কাউকে রাশিয়া যুদ্ধে পাঠায় না। বাহিরের কাজ দেয়। স্যালারি (বেতন) ভালো, রাশিয়ার পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। তো উনি (সোহেল) বলতেন, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো, আমি আসার ব্যবস্থা করে দিবো। এভাবে আমরা ধাপে ধাপে কোম্পানি থেকে অনেকজন যুদ্ধে আসি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রুশ সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি যুবক রাসেল শিকদার (ছদ্মনাম)।
সাবেক সহকর্মীদের মধ্যে যারা একসঙ্গে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই হতাহত হয়েছে বলে জানান তিনি।
"আমরা যারা একসঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই গোলাগুলিতে হয় পঙ্গু হয়ে গেছে, না হয় মারা গেছে। সোহেল ভাই যদি মিথ্যা কথা বলে আমাদেরকে না আনতো, তাহলে আমরা কখনোই যুদ্ধে আসতাম না," বলেন ওই যুবক।
অভিযুক্ত মোহাম্মদ সোহেল নিজেও বর্তমানে রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি রুশ বাহিনীর পক্ষে সৈন্য সংগ্রহের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এছাড়া সাবেক সহকর্মীদের কয়েকজনকে রাশিয়ার সেনা বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে সাহায্য করার কথা স্বীকার করলেও সেটার বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
যদিও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
কিন্তু ফেসবুকে তার যে ভেরিফাইড প্রোফাইল রয়েছে, সেখানে বছরখানেক ধরেই নিয়মিতভাবে যুদ্ধের ময়দান থেকে ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে তাকে। সেগুলোতে রুশ সেনাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ভারি অস্ত্র ও যুদ্ধে তাদের অর্জনকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
তার এসব ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং কমেন্টে বাংলাদেশ থেকে অনেকেই রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন।

ছবির উৎস, Nazrul's Family
দালাল চক্রের প্রতারণা
পরিচিত মুখের বাইরেও যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশি অনেক অপরিচিত মুখ দেখেছেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন চীনা কোম্পানি থেকে যুদ্ধে যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের কয়েকজন।
"অপরিচিতদের মধ্যে আমার সঙ্গে একজনের দেখা হয়েছিল, যে স্টুডেন্ট ভিসায় রাশিয়া গিয়েছিল। আরেকজন ছিল মধ্যবয়সী। সে প্রতারণার শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে আসছিলো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মোহন মিয়াজি।
রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি আরেক তরুণও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।
"আমাদের আগের ব্যাচে প্রায় ৪৭ জনের একটা বাংলাদেশি টিম যুদ্ধের জন্য এসেছিল। উনারা দালাল চক্রের মাধ্যমে এসেছে বলে আমরা পরে জানতে পারি," বলেন ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধরত এক বাংলাদেশি, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের নামপ্রকাশ করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ থেকে যারা দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন, তেমনই একজন রাজবাড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম।
সাবেক সেনা সদস্য মি. ইসলাম বেশ কয়েক মাস আগে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানান তার পরিবারের সদস্যরা।
"ফোন দিয়ে হাউমাউ করে কাঁনতেছে আর বলতেছে, আমারে ক্ষমা করে দিও। চারটে জান্নাত (সন্তান) তোমার কাছে রেখে আসছি। তুমি ওই চারটে জান্নাত দেখে রাইখো। পরে সেও আমার কাছে ক্ষমা চাইলো, আমিও তার কাছে ক্ষমা চাইলাম," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী আইরিন আক্তার।
"তখন বললো যে, যদি পনেরদিন-একমাস দেখো যে, আমার সাথে যোগাযোগ নেই, ভেবে নিও আমি মারা গেছি," বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মিজ আক্তার।
স্বামীর সঙ্গে এটাই ছিল আইরিন আক্তারের শেষ কথা। মিজ আক্তার জানান, ভালো বেতনে হাসপাতালে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার স্বামীকে রাশিয়ায় নিয়ে যায় দালালদের একটি চক্র। এরপর চাপ প্রয়োগ করে মি. ইসলামকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী।
"ওদের আটকায় রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেয় যে, যদি আপনারা আজকে এই কাগজপত্রে সই না করেন, রাশিয়ান যে কাগজে, যদি সই না করেন, তাহলে আপনাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে, এমনকি আপনাদের লাশটাও দেশের মানুষ খোঁজ পাবে না," বলছিলেন মিজ আক্তার।
"পরে উনি আমারে এগুলো বলে হাউমাউ করে কাঁনতেছে যে, আমি কী করলাম! তোমার কথাও শুনলাম না। তুমি যা যা বলছো, আজ তাই তাই হচ্ছে। আজ তোমার কথা শুনলে আমি হয়তো প্রাণে বেঁচে থাকতাম, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ডাল-ভাত খাইতে পারতাম," বলতে গিয়ে আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী আইরিন আক্তার।

'এভাবে প্রতারণা করবে, বুঝতে পারি'
নজরুল ইসলামের মৃত্যুর খবর স্ত্রী-সন্তানরা জানতে পারেন তার সহযোদ্ধা ইকবাল হোসেনের মাধ্যমে।
ফার্নিচার কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে মি. হোসেনকেও যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
"আগে জানলে কখনোই আমরা তাকে যাইতে দিতাম না। আমি এজেন্সিকে বারবার বলেছি যে, আপনারা এখনও সত্য কথা বলেন, প্রয়োজনে আমি টাকা ফেরত নিবো না। যদি যুদ্ধে পাঠানো হয়, তাহলে আমি উনাকে দিবো না। কিন্তু উনারা বলেছে, কোনোভাবেই যুদ্ধ পাঠানো হবে না। বলছে, যুদ্ধ তো অনেক দূর, নিতেছি ফার্নিচার কোম্পানির কাজের জন্য। যুদ্ধে পাঠানো হইবো নাকি!," বিবিসি বাংলাবে বলছিলেন ইকবাল হোসেনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস।
মি. হোসেন বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছেন। প্রায় মাসখানেক ধরে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিলো না পরিবারের সদস্যরা। পরে জানা যায় যে, তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
"পুরোটা ফ্যামিলির ভিতর একমাত্র উপার্জনকারী আমার স্বামী। তো উনার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে রাস্তায় বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই আমাদের। আমার একটা বাচ্চা। আমার বিয়ে হইছে একটা বছর হইলো মাত্র"
"আমার এই বাচ্চাটা ছোট রাইখা, একমাস ২৪ দিনের বাচ্চা রাইখা উনি রাশিয়া গেছে। দালালরা এভাবে প্রতারণা করবে, আমরা সেটা বুঝতে পারি নাই," দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মিজ ফেরদৌস।

মধ্যপ্রাচ্য হয়ে রাশিয়া
অনুসন্ধানে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে যে, বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগিদেরকে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো একটি দেশে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাশিয়ায়।
রাশিয়া পৌঁছানোর পর ফাঁদে ফেলে চক্রের সদস্যরা কীভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানে বাধ্য করেন, বিবিসি বাংলা'র কাছে সেটার বর্ণনা দিয়েছেন এক ভুক্তভোগি। তিনিও বর্তমানে রুশ বাহিনীতে কর্মরত থাকায় নিরাপত্তার কথা ভেবে নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
"ওইখানে আমাদেরকে মনে করেন একপ্রকার জোর-জবরদস্তি করেই কন্টাক্টটা সাইন করায় ওরা আমাদের। আমাদের পাসপোর্টগুলা তাদের কাছে ছিল। আমরা ফেরত চাইছি অনেকবার, কিন্তু তারা ফেরত দেয় নাই। না দিয়ে একপ্রকারের ব্ল্যাকমেইল করে আমাদের দিয়ে এই কন্টাক্টটা সাইন করানো হইছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেওয়া ওই বাংলাদেশি।
চুক্তিপত্রটি ছিল রুশ ভাষায়। ফলে স্বাক্ষর করার আগে বাংলাদেশি এসব নাগরিকরা জানতেন না, সেখানে ঠিক কী লেখা আছে।
"আমরা তো রুশ ভাষা জানি না। আমাদের শুধু বলছে, সিগনেচার করতে, আমরা সিগনেচার করছি। সিগনেচার না করলে তো আমরা এখান থেকে বের হতেও পারতেছি না। আমাদের প্ল্যান ছিল, আমরা এখানে সিগনেচার করবো, তারপর ফিল্ডে যাবো। সেখান থেকে পলাই-টলাই হয়তো বের হওয়া যাবে। কিন্তু সেটা তো পারি নাই," বলেন রুশ সেনাদের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া ওই প্রবাসী বাংলাদেশি।
রুশ ভাষায় লেখা যে কাগজে দালালরা জোর করে সই করতে বাধ্য করেছে, সেটির একাধিক কপি বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে। যাচাই করে বিবিসি বাংলা দেখেছে যে, কাগজটি আসলে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র। একবছর মেয়াদী ওই চুক্তিপত্রে রাশিয়ার সরকারি সিল এবং রুশ সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষরও রয়েছে।

ছবির উৎস, Tain's Family
বেতনের অর্থও হাতিয়ে নিচ্ছে দালালরা
বিবিসি জানতে পেরেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিটি ব্যক্তির ব্যাংক হিসেবে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দেয় রুশ সরকার। এর বাইরে, প্রতিমাসে বেতনও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব অর্থেরও বেশিরভাগ অংশ তুলে নিচ্ছে দালাল চক্রের সদস্যরা।
"আমাদের কন্টাক্ট সাইন (চুক্তি স্বাক্ষর) করা বাবদ বিশ লাখ রুবল দিয়েছে রাশিয়ার সরকার। কিন্তু আমাদের দেওয়া হইছে, আট লাখ রুবল, আর বাকিটা ওরা খাইছে। এমনকি আমরা যদি মারা যায়, বা যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলেও রুশ সরকারের দেওয়া অর্থ বা সম্পদ তারা পাবে- এভাবে করে আমাদের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করে কাগজপত্রে সই করে নিছে ওরা। জোর করে নিছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন ইউক্রেনে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হওয়া প্রবাসী ওই বাংলাদেশি।
এমনকি যুদ্ধে পাঠানোর পর সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও চক্রটি অনেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ করে টাকা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগিদের পরিবার।
যাদের কাছ থেকে এভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে, তেমনই একজন সাহিদ মোস্তফা তাঈন। যদিও শেষপর্যন্ত কথা রাখেনি দালাল চক্রের সদস্যরা।
"জসিম সাহেব বলে, তাইন তুমি ওখানে তিন লাখ রুবল দাও, তাহলে তোমাকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে এনে একটা সেফ জোনে রাখবো। ও সাথে সাথে টাকা দিয়ে দিছে। একসঙ্গে এতটাকা তুলতে গিয়ে ওর কার্ডও আটকে গেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাহিদ মোস্তফা তাঈনের বড় বোন লোপা মোস্তফা।

চোখে ঘুম নেই স্বজনদের
সম্মুখসারিতে যুদ্ধে যাওয়া মি. তাঈনের চার মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার দুশ্চিতায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ মা। চোখে ঘুম নেই পরিবারের অন্য সদস্যদের।
"আমার ভাই যুদ্ধে গেছে শোনার সাথে সাথেই আমার মায়ের একটা স্ট্রোক হয়, ব্রেন স্ট্রোক। ওই ঘটনার পর থেকে সে কিছুই মনে রাখতে পারে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাহিদ মোস্তফা তাঈনের বড় বোন লোপা মোস্তফা।
তাঈনের জন্য কান্নাকাটি করায় মায়ের শারীরিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
"একদিন আমি রাতের বেলা উঠে দেখি জায়নামাজে বসে সে চিৎকার দিয়ে কাঁদতেছে। আরেকদিন দেখি মাগরিবের টাইমে। বাসায় কেউ নাই, সবাই বাইরে গেছে আর আমি আমার রুমে। তখনও দেখি সে কান্না করছে," বলেন মিজ মোস্তফা।
এদিকে, বেশ কয়েক মাস স্বামীর খোঁজ না পাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তাঈনের স্ত্রী। ছোট দু'টো বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন, ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।
"গত দোসরা জুন তার সঙ্গে আমার শেষবার কথা হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. তাঈনের স্ত্রী ইয়ানুর।
"আমার দুইটা ছোট বাচ্চা। তারা তাদের বাবাকে খোঁজে। বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে বারবার, ফোনে কথা বলতে চায়। আমি বাচ্চাদের কিছু বলতেও পারতেছি না," বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে মিজ ইয়ানুরের।

নেপথ্যে ট্রাভেল এজেন্সি
নজরুল ইসলাম, ইকবাল হোসেন, সাহিদ মোস্তফা তাঈনের বিদেশ যাত্রার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, তারা সবাই একই দালালচক্রের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদেরকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, সেটির নাম 'বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস'।
ভালো চাকরির কথা বলে রাশিয়া নিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে 'বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি উল্টো দাবি করেছেন, তাদের মাধ্যমে যারা রাশিয়া গিয়েছেন তারা সবাই জেনে-বুঝেই যুদ্ধে যোগদান করেছেন।
"ভিসা হওয়ার প্রসেস শুরুর আগেই তারা সবাই স্ট্যাম্পে বন্ড দিয়ে গেছে যে, তারা সেখানে আর্মিতেই যাবে। এখানে কেউ কাউকে বাধ্য করেনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জসিম উদ্দিন।
এই দাবির পক্ষে একটি চুক্তিপত্রও তুলে ধরেন তিনি।
কিন্তু ভুক্তভোগিদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা এ ধরনের কোনো চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেননি। তবে বছরখানেক আগে তাদের কাছ থেকে কিছু সাদা কাগজে সই নেওয়া হয় বলে জানান তারা।
"বিদেশে নেওয়া বাবদ ওদেরকে তেরো লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। সেখানে আমরা সাড়ে ১১ লক্ষ টাকা দিছি। দেওয়ার পরে আমাদের কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্পে একটা সাইন নিছিল। বলছিল, চুক্তির বাকি টাকা বুঝিয়ে দিলে স্ট্যাম্পটা আমাদের দিয়ে দেওয়া হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইকবাল হোসেনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস।
"উনারা এখন সেই স্ট্যাম্পের ভেতরে লিখে রাখছে যে, উনাদেরকে যে যুদ্ধে পাঠাবে, এটা নাকি আমরা সব জানি," বলেন মিজ ফেরদৌস।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ট্রাভেল এজেন্সিটির কর্মকর্তা দায় এড়িয়ে যান।
"তারা যে স্ট্যাম্পে বন্ড দিয়েছে, সেটা নিয়েছে স্ব স্ব এজেন্টরা। আমি তো কোথাও কারো সাথে চুক্তি করিনি," বলেন বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের সিইও মি. উদ্দিন।

বন্ধ হয়নি লোক পাঠানো
বাংলাদেশের সাবেক সেনা সদস্য নজরুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনার পর তারা রাশিয়ায় লোক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন বলে বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেছেন বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের শীর্ষ কর্মকর্তা।
তবে আসলেই তারা লোক পাঠানো বন্ধ রেখেছেন কি-না, সেটি জানার জন্য পরিচয় গোপন রেখে বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিবিসি বাংলা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফোন নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে একজনের নাম্বার খোলা। তার নাম রেজাউল করিম শানু, যার মাধ্যমে সাহিদ মোস্তফা তাঈন রাশিয়া গিয়েছিলেন। অন্যদের পাঠানোর ক্ষেত্রেও তিনি মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগি পরিবারগুলো।
বেকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের এই এজেন্ট জানান, শিগগিরই তারা আরও একদল ব্যক্তিকে রাশিয়ায় পাঠাতে যাচ্ছেন।
"নতুন একটা দল যাচ্ছে তিনজনের। এই তিনজন যাওয়ার পর আপনাকে পাঠাবো," বলছিলেন বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের এজেন্ট রেজাউল করিম শানু।
যুদ্ধে পাঠানো হবে না বলেও অভয় দেন তিনি।
"আপনি যুদ্ধে যেতে না চাইলে কেউ আপনেরে জোর কইরা যুদ্ধে পাঠাইতে পারবে না। আপনি কাজ করবেন গাড়ির গ্যারেজ বা চকলেট ফেক্টরিতে" বলেন এজেন্ট শানু।
তবে পরবর্তীতে বিবিসি বাংলার পরিচয় দিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি অবশ্য নতুন করে লোক পাঠানোর কথা অস্বীকার করেন।
"আমি এখন ওই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না। স্টুডেন্টরা যদি কেউ স্কলারশিপ পায়, তাদের জন্য চেষ্টা করতেছি। এছাড়া আমি আর ওই ব্যবসার সাথেই এখন জড়িত না," বলেন মি. শানু।
সেইসঙ্গে দাবি করেন, ট্রাভেল এজেন্সির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাই সবকিছুর জন্য দায়ী।
"রাশিয়া লোক পাঠানোর আগে আমরা বার বার বলছি যে, ভালোভাবে জেনে নেন। তখন সে বলেছে যে, না কোনোভাবেই এদেরকে যুদ্ধে দেওয়া হবে না, লজিস্টিক সাপোর্টে দেওয়া হবে," বলেন মি. শানু।
নতুন করে লোক পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ট্রাভেল এজেন্সির সিইও দাবি করেছেন, মি. শানু এখন তার কোম্পানিতে কাজ করছেন না।
"সে এখন আমাদের সঙ্গে নেই। তাকে আমরা চাকরিচ্যুত করেছি," বলেন বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের সিইও মো. জসিম উদ্দিন।
যদিও এজেন্ট শানু চাকরিচ্যুতির ঘটনা অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি নিজে থেকে আপাতত অফিসে যাতায়াত বন্ধ রেখেছেন।

দালাল চক্রে ভারতীয় নাগরিক
বাংলাদেশি এই চক্রটির সঙ্গে দু'জন বিদেশি নাগরিকও জড়িত রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।
তাদের মধ্যে একজন দীপন দেবনাথ। তিনি কলকাতায় থাকেন বলে জানা যাচ্ছে।
মি. দেবনাথ মূলত বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আর বাংলাদেশ থেকে লোক পাঠানোর পর রাশিয়ায় তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করানো পর্যন্ত যাবতীয় কাজ করে থাকেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ জেসনু, যিনি প্রসাদ নামেই ভুক্তভোগিদের কাছে বেশি পরিচিত।
বিকন ট্রাভেলসের প্রধান কর্মকর্তাও একপর্যায়ে তাদের দু'জনের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
"দীপক তো কলকাতায় থাকে। সে রাশিয়ায় লোক পাঠানোর প্রস্তাবটা পেয়েছে প্রসাদের কাছ থেকে। প্রসাদ রাশান এক মেয়েকে বিয়ে করে এখন রাশিয়ায় বসবাস করছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রধান কর্মকর্তা মি. উদ্দিন।
কিন্তু বিকন ট্রাভেলসের কাছ থেকে প্রসাদের পাসপোর্টের যে ছবি রয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, তিনি মূলত ভারতের তামিলনাড়ু প্রদেশের বাসিন্দা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে মি. প্রসাদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকারও করেননি।
অন্যদিকে, যোগাযোগ করা হলেও দীপক দেবনাথের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

নিহত ছয়, নিখোঁজ তিন ডজনেরও বেশি
বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস বেশ কয়েক ধাপে নয়জনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে বলে জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা। এর মধ্যে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না আরও তিনজনের।
"আরও তো মেলা লোকরে নিছে এবং এখনও নিচ্ছে । এত লোক যেয়ে মারা যাচ্ছে। আমি আবেদন করি যেন সরকারের তরফ থেকে এদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেন তারা কেউ আর কোনো পরিবারকে নিঃস্ব করে দিতে না পারে," বিবিসি বাংলাকে বলেন নিহত নজরুল ইসলামের বড় ভাই আব্দুর রহিম।
নিখোঁজ সাহিদ মোস্তফা তাঈনের সন্ধান চেয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে তার পরিবার। কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং বর্তমানে পরিবার কোনো খোঁজ পাচ্ছে না, এ ধরনের অন্তত ৩৭টি আবেদন গত এক বছরে তাদের কাছে জমা পড়েছে।
সেসব আবেদনের প্রেক্ষিতে রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সম্প্রতি ছয় জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হতে পেরেছে মন্ত্রণালয়। বাকিদের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর চলছে।
তবে যাদের চুক্তির মেয়াদ এখনও পূর্ণ হয়নি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আগেই তাদেরকে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে ইঙ্গিত পেয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে নতুন করে আর যেন কেউ ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে না পারে, সেই প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
"একবার রাশিয়ায় চলে গেলে সেটা অনেক সময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সেজন্য আমরা এখন চেষ্টা করছি, বাংলাদেশ থেকেই যেন নতুন করে আর কেউ যুদ্ধ যেতে না পারে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আমরা অনুরোধ জানিয়েছি ," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

পুলিশের নাকের ডগায়, তবুও হয়নি গ্রেফতার
জোর করে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে নেমে তারা একাধিক দালাল চক্রের সন্ধান পেয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
"আমাদের সিআইডি'র একটা ডেডিকেটেড টিম কিন্তু এটা নিয়ে কাজ করছে। আমরা কিছু ডিটেক্ট করে ফেলেছি এর মধ্যে, অ্যারেস্টও (গ্রেফতার) আছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ।
"এ ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত কমিটেড যে, কোনোভাবেই ছাড় দেবো না বিন্দুমাত্র। যারা এই ধরনের আছে, তাদের বিষয়ে আমরা অলরেডি কাজ করছি," বলেন পুলিশের অতিরিক্ত এই মহাপরিদর্শক।
তবে দালালদের যে চক্রটি বিবিসি বাংলা খুঁজে পেয়েছে, তারা এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। যদিও চক্রটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার মালিবাগ মোড়ে সিআইডি সদরদপ্তরের ঠিক উল্টোপাশের একটি ভবনে অবস্থিত।
নাকের ডগায় থাকার পরও সিআইডি কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পারলো না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগিরা।
দালাল চক্রের এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রুশ সরকার অবহিত কি-না, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ইউক্রেন যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের মরদেহ দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের সহায়তা চাচ্ছেন স্বজনরা।
সরকারের তরফ থেকেও বলা হচ্ছে যে, তারা চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু কবে নাগাদ নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরবে কিংবা আদৌ আনা সম্ভব হবে কি-না, সেই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।








