কাতার বিশ্বকাপ ২০২২: বিশ্বকাপ সম্ভব করেছে এমন কজন অভিবাসী শ্রমিকের বয়ান

দোহার কাছে এশিয়ান টাউনের একটি শপিং মল এলাকায় বিগ স্ক্রিনে আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকোর মধ্যে ম্যাচ দেখছেন অভিবাসী শ্রমিকরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দোহার কাছে এশিয়ান টাউনের একটি শপিং মল এলাকায় বিগ স্ক্রিনে আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকোর মধ্যে ম্যাচ দেখছেন অভিবাসী শ্রমিকরা
    • Author, জোসে কার্লোস কিটো এবং স্যাম শেরিংহ্যাম,
    • Role, বিবিসি নিউজ মুন্ডো, দোহা

কাতারের চোখ জুড়ানো আল জানুব স্টেডিয়ামের ২০ কিলোমিটার দূরে একটি জায়গায় বিশাল টিভি স্ক্রিনে বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেন হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক।

স্টেডিয়ামটি তৈরিতে কাজ করলেও এর চেয়ে কাছে গিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার সাধ্য নেই তাদের।

যারা কথা বলেছেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের আসল নামের বদলে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলো।

সেদিন ছিল শুক্রবারের রাত। দোহার ঝকমকে, চকচকে শপিং মল আর সারি সারি রেস্তরা থেকে দূরে এশিয়ার টাউন নামে পরিচিত মহল্লার ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের উপচে পড়া ভিড় ।

ঢোকার মুখে টাঙানো বিশাল এক ব্যানার, আর তাতে আরবি, ইংরেজি এবং হিন্দিতে লেখা : "এ যাবত-কালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব করতে ভূমিকা রাখার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।"

"এটি গরিবদের ফ্যান জোন," বলেন জন - ঘানা থেকে আসা একজন অভিবাসী শ্রমিক।

তিনি এবং তার আশপাশে যে হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক দাঁড়িয়ে-বসে রয়েছেন তারা সবাই এই বিশ্বকাপের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে কাজ করেছেন।

"আমি ১০বছর এখানে কাজ করতে চাই, যদিও আমার চুক্তির মেয়াদ মাত্র দুই বছরের," বলেন জন।

"কাতারে আমার বেশ ভালো লাগে। যদিও মাঝে মাঝে ভয় লাগে যে কোনও কি বিপদে পড়লে আমি কি পুলিশকে গিয়ে বলবো নাকি তাদের এড়িয়ে চলবো - এ নিয়ে মাঝে মধ্যে আড়ষ্ট বোধ করি। এদেশের পুলিশ দেখলে ভয় লাগে," হাসতে হাসতে বলেন জন।

কাতার নিয়ে জনের মনোভাব মোটামুটি ইতিবাচক, কিন্তু সব শ্রমিকের তেমনটি নয়।

অন্যান্য খবর:

Doha workers and Football fans watch the match between Portugal and Ghana at the Industrial Area Fan Zone in the Asian Town Cricket Stadium

ছবির উৎস, Getty Images

"আমরা অনেকটা ক্রীতদাসের মত কাজ করি," বলেন উগান্ডা থেকে আসা মোজেজ।

"ভীষণ গরম। তারপর মাঝে মাঝে এত লম্বা সময় ধরে আমাদের কাজ করতে হয় যেটা চুক্তিতে ছিলনা । চুক্তিতে রয়েছে আট ঘণ্টা কাজ, কিন্তু আমরা ১৩ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করি।"

"কিন্তু তারপরও সহ্য করি যাতে দেশে আমার ছোট ভাইটা খেতে পারে, স্কুলে যেতে পারে," বলেন মোজেজ।

এই বিশ্বকাপের আগে অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি আচরণ নিয়ে মানবাধিকার অনেক সংগঠন কাতারের তীব্র সমালোচনা করেছে।

এমনকি জাতিসংঘ শ্রম সংস্থা আইএলও বলেছে বিশ্বকাপের জন্য অবকাঠামো তৈরির সময় কয়েক ডজন অভিবাসী শ্রমিক মারা গেছে।

মোজেজ বিবিসিকে বলেন, তার সাথে কাজ করতো এমন দুজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তবে মোজেজের এই বক্তব্যের সত্যতা নিরপেক্ষ সূত্রে যাচারই করা সম্ভব হয়নি।

"একজন প্রচণ্ড গরমে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, তার পর সে মারা যায়," বলেন মোজেজ।

অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়ে বিবিসির পক্ষ থেকে কাতারি সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য চাওয়া হলেও তারা সাড়া দেয়নি।

তবে সম্প্রতি কাতারের একজন সরকারি মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ যা করেনি, কাতার তা করেছে। তিনি বলেন, কাতারের নেওয়া শ্রম সংস্কার কর্মসূচির ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে।

কাতার সরকার শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন মজুরি বেঁধে দিয়েছে। সেই সাথে বিতর্কিত কাফালা ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করেছে। কাফালা ব্যবস্থার আওতায় নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া চাকরি বদলালে গ্রেপ্তার, মামলা এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকি ছিল ।

অভিবাসী শ্রমিকরা দোহার ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বিগ স্ক্রিনে বিশ্বকাপ দেখছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অভিবাসী শ্রমিকরা দোহার ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বিগ স্ক্রিনে বিশ্বকাপ দেখছেন

দোহার এশিয়ান টাউনের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সেদিন কমপক্ষে এক ডজন শ্রমিকের সাথে কথা হয়েছে বিবিসির। তাদের সবার বক্তব্য প্রায় একইরকম - তারা গড়ে সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করেন, এবং দিনে গড়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। বেঁধে দেওয়া সর্বনিম্ন অথবা কাছাকাছি মজুরিতে তারা কাজ করেন যার পরিমাণ মাসে কম-বেশি ১০০০ কাতারি রিয়াল বা ২৭৫ ডলার।

মজুরি এতই কম যে এমনকি দোহা শহরের কেন্দ্রে ঘুরতে যাওয়াও এসব শ্রমিকদের জন্য বিলাসিতা।

"মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি একটা খাঁচার মধ্যে রয়েছি," বলেন জন। "স্টেডিয়ামে গিয়ে একটি ম্যাচ দেখার কথা একবারও ভাবিনি। একসময় হয়তো আমার মুক্তি হবে। কিন্তু এই ফ্যান জোন আমাদের। এজন্য কাতারকে ধন্যবাদ খুবই ভালো লাগে এখানে।"

এশিয়ান টাউনে যত জনের সাথে বিবিসি কথা বলেছে, তাদের সিংহভাগই কাতার সরকারের চেয়ে যেসব কোম্পানিতে তারা কাজ করেন তাদের ব্যাপারেই বেশি হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন নিয়োগকর্তারা তাদের সাবধান করেছেন কেউ যেন সাংবাদিকদের সাথে কথা না বলে।

আরও পড়ুন:

"আমরা কথা বলতে পারিনা। আমরা কোনও ঝামেলা চাইনা, কিন্তু এ অবস্থা নিয়ে আমরা স্বস্তিতে নেই," বলেন একজন শ্রমিক।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সম্প্রতি বলেছে শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি কাতারে সম্প্রতি কিছুটা উন্নত হয়েছে।, কিন্তু "কাতারে ঢুকতে, এখানে বসবাস করতে বা কাজ করতে অভিবাসী শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকারীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।

"নিয়োগকারীর অবহেলার কারণে একজন শ্রমিক যে কোনও সময় কাগজে-কলমে অবৈধ অভিবাসী হয়ে পড়তে পারে। নিয়োগকারীর অবহেলা, দায়িত্বহীনতার পরিণতি ভোগ করতে হয় শুধু শ্রমিকদের।"

মোজেজ বলেন তাকে নিয়োগকর্তায় দয়ার ওপর ভরসা করে থাকতে হয়। চুক্তি ভেঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও রাস্তা তার সামনে নেই।

"কোম্পানির জন্য আমরা প্রচুর করি, কিন্তু বিনিময়ে প্রাপ্তি খুবই সামান্য। আমি সবসময় প্রার্থনা করি যাতে চাকরি বদলাতে পারি," বলেন মোজেজ।

"অমি মনি করিনা বিশ্বকাপের পর পরিস্থিতি বদলাবে। আরও খারাপ হতে পারে।"