রাজনীতিতে বড় দলগুলো ছোট দলকে জোটে টানে কেন?

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া
ছবির ক্যাপশান, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রী

বাংলাদেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিভিন্ন সময়ে অন্য ছোট দলগুলোর সাথে জোট বেঁধেছে।

এরমধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ১৮টি ছোট-বড় দল মিলে মহাজোটের ঘোষণা দিয়েছিল। এই জোট নিয়ে তারা নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয় এবং তখন ২৬৩টি আসনে জয় লাভ করে ক্ষমতায় যায় তারা।

বর্তমানে এই জোটটি আর নেই। তবে, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট এখনো রয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়াও এই জোটে আরো যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিকদল (জাসদ), গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, গণ-আজাদী লীগ, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি(জেপি)।

অন্যদিকে বাংলাদেশের আরেকটি প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ২০১২ সালে ১৮টি দল এবং পরবর্তীতে আরো দুটি দলের অংশগ্রহণ মিলিয়ে বিশ দলীয় জোট গঠন করে। বর্তমানে এই জোটটি আর সক্রিয় নেই।

বিএনপি ছাড়াও এই জোট ভূক্ত দলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি(জাগপা), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ডেমোক্রেটিক লীগ, পিপলস লীগ, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশ এবং জাতীয় দল।

বাংলাদেশের প্রধান এই দুটি রাজনৈতিক দল অন্য যেসব দলের সাথে জোট গঠন করে, সেগুলোর পেছনে জনসমর্থন খুব বেশি নেই। কোন কোন দলকে তো 'ওয়ান ম্যান ওয়ান পার্টি' অর্থাৎ একজনকে নিয়েই একটি দল বলে হাস্য-পরিহাস করা হয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই দলগুলো থেকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সমর্থন ও প্রতীক ছাড়া এককভাবে কেউ নির্বাচিত হতে পারে না। এমনকি এদের সমর্থকের সংখ্যাও খুব বেশি থাকে না।

তারপরও কেন আসলে এমন দলগুলোর সাথে জোট গঠন করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো?

বিএনপির সমাবেশ

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

ছবির ক্যাপশান, ১০ই ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির সমাবেশের চিত্র

‘যুগপৎ আন্দোলন’

ঢাকায় গত ১০ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের কর্মসূচী শেষ হয়েছে। দলটির মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

বিএনপি বলছে যে, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে তারা একটি যুগপৎ আন্দোলনে যেতে চায়। যার মূল দাবি হচ্ছে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, এরইমধ্যে কয়েকটি দল তাদের সাথে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে সমর্থন দিয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে গনতন্ত্র মঞ্চ।

এছাড়া বিএনপির আগের জোটবদ্ধ দলগুলোও একসাথে সরকার পতনের আন্দোলনে যাওয়ার পক্ষে সমর্থন দিয়েছে বলে জানা যায়।

মিজ রহমান বলেন, যারা(রাজনৈতিক দল) তাদের(বিএনপির) সাথে আসতে চায় তাদের সবাইকেই ঐক্যবদ্ধ করতে চায় বিএনপি।

তিনি বলেন, “আমরা পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। এখানে ছোট-বড় বলে কোন কথা নাই। এখানে আমরা কেউ কারো নির্বাচনী জোট না। এটা যুগপৎ আন্দোলন।”

“হ্যাঁ, তারা যদি আন্দোলনে সফল হয় তাহলে তারা নির্বাচনে দাঁড়াবে, এখানে তো কারো কোন আপত্তি নাই,” বলেন তিনি।

ছোট দলগুলোকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করতে চায় বিএনপি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ছোট দলগুলোকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করতে চায় বিএনপি

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এই নেতা বলেন, যেসব দলকে ছোট বা বড় বলা হচ্ছে তাদেরও মেধা-মনন, বুদ্ধিমত্তা ও আদর্শ রয়েছে। তাদের খুব বেশি সাফল্য না থাকলেও তাদের একটা শক্তি আছে বলে মনে করে বিএনপি। আর সেজন্যই আন্দোলনে জোটবদ্ধ হতে আগ্রহী তারা।

তিনি বলেন, “এই জনগণের শক্তিই কিন্তু আমাদের শক্তি, এই জন্যই এই যুগপৎ আন্দোলন।”

তাঁর মতে, যে কোন আন্দোলনে যখন পুরো জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে সেখানে ফলটা অনেক বেশি আসে।

তিনি বলেন, বিএনপি একক দল হিসেবে যে আন্দোলন করছে সেটি বড় দল হিসেবে করছে। কিন্তু ছোট অনেক দলও রয়েছে যারাও আন্দোলন করছে।

“অন্যেরা তো আন্দোলন করছে, কথা বলছে, তাদের কথাগুলো কেন থাকবে না মাঠে?”

‘এক প্ল্যাটফর্ম’

চৌদ্দ দলীয় জোটের অধীনেই ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এই জয়ের পর আওয়ামীলীগ শরিক দলগুলোর কাউকেই মন্ত্রীসভায় রাখেনি।

এছাড়া শরিকদলগুলোর সাথে আওয়ামী লীগের দূরত্ব তৈরি হয়েছি বলেও গুঞ্জন ছিল।

এবিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, ২০২২ সাল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বছর ছিল।

মাহবুবুল আলম হানিফ

ছবির উৎস, মাহবুবুল আলম হানিফের ফেসবুক

ছবির ক্যাপশান, মাহবুবুল আলম হানিফ

তিনি বলেন, সংগঠন ঢেলে সাজানো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছোট দলগুলোর সাথে নিয়মিত বৈঠক হয়নি। তবে তার মানে এই নয় যে, তাদের ডাকা হচ্ছে না বা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

ছোট দলগুলোর সাথে জোট গড়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগ তাদের মতাদর্শকেই প্রাধান্য দেয় বলে জানান এই নেতা।

মি. আলম বলেন, আওয়ামীলীগ যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল তাই দেশ গড়ার স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের কোন রাজনৈতিক দল যদি সরকারের সাথে কাজ করতে চায়, সরকারের পাশে থেকে সহায়তা করতে চায় তাহলে তাদের জন্য সব সময় দুয়ার খোলা।

তিনি বলেন, “আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিরা একটা প্ল্যাটফর্মে থাকুক।”

জোটবদ্ধ হয় কেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময়ই ছোট দলগুলো কম-বেশি সক্রিয় ছিল।

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রবেশ করার পর, রাজনীতি অনেকটা জোট ভিত্তিক হয়ে গেছে বলে মনে করেন তারা। যদিও এদেশের রাজনীতি অনেকটা দ্বি-দলীয় বলেই ধারণা প্রচলিত রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, মূলত দুটি কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছোট দলগুলোর সক্রিয়তা এখনো আছে।

এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, রাজনৈতিক আদর্শিক কারণে যুথবদ্ধতা।

আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এক ধরণের রাজনৈতিক লভ্যাংশ কিভাবে নেয়া যায় সেটার দিকে দৃষ্টি দেয়া।

তবে জনসমর্থন না থাকায় এই ছোট দলগুলো একা কিছু করতে পারে না বলেও মনে করেন তিনি।

বিএনপি বলছে, সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার দলগুলো নিয়ে আন্দোলনে যাবে তারা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিএনপি বলছে, সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার দলগুলো নিয়ে আন্দোলনে যাবে তারা
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনি বলেন, রাজনীতিতে ছোট দলকে জোটে টানার বিষয়ে মতাদর্শিক বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এর মধ্যে বড় যে দলের সাথে মতাদর্শগত মিল থাকে ছোট দলগুলো সেখানেই ভেড়ে।

উদাহরণ হিসেবে মি. চক্রবর্তী বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে যে দলগুলো যুক্ত হয় তারা বেশিরভাগই মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ধারণ করে।

বিএনপির ক্ষেত্রেও তাদের মতাদর্শের সাথে মিল রয়েছে এমন দলগুলোই জোটে টানেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট দলগুলোর যে নেতা থাকেন, তাদের পপুলার সার্পোট বা জনগণের বিপুল সমর্থন না থাকলেও তাদের রাজনৈতিক একটা গ্রহণযোগ্যতা প্রায় সব জায়গাতেই থাকে।

এরা যখন কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে যুক্ত হন তখন সেই মতাদর্শ রাজনৈতিক পরিসরে বিকশিত করার এক ধরণের চেষ্টা তাদের থাকে। যা বড় দলগুলো পছন্দ করে।

এছাড়া এখানে ক্ষমতা বন্টন বা পাওয়ার শেয়ারিংয়ের বিষয় থাকে বলেও মনে করেন অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, এটা বাংলাদেশের নির্বাচনে একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “ছোট-খাট দলগুলোকে যদি দুই-একটি কন্সটিটুয়েন্সির সিট-টিট দিয়ে বাগে আনা যায় বা সাথে রাখা যায়, সেক্ষেত্রে এরাও যে খুব বেশি মেইনস্ট্রিম(মূল ধারার) দলের বিরুদ্ধে বিরোধিতা করে না, সেটাও আমরা গত এক-দুই দশকে দেখেছি।”

বিশ্লেষকরা বলেছেন, এ ধরণের ছোটদলগুলো খুব বেশি সক্রিয় হয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসা শুরু হলে। ২০২৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২২ সালেই এ ধরণের রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় হতে শুরু করেছে বলে জানান তারা।

শেখ হাসিনা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আওয়ামী লীগের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

‘রাজনৈতিক খেলা’?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় দলগুলো ছোট দলগুলোকে জোটবদ্ধ করে নিজেদের পক্ষে টানে নানা কারণে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, নিজেদের বিরোধিতা কমিয়ে আনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ছোট দলগুলো অনেক সময় বড় দলগুলোর কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে গেলে সমালোচনা করে।

এছাড়া এই দলগুলোর খুব বেশি পপুলার সাপোর্ট না থাকলেও এই ব্যক্তিবর্গকে সবাই কমবেশি চেনেন, তাদের কথাবার্তা জনগণ শোনেন, তাই বড় দলগুলো মনে করে যে, এদের যদি একটি-দুটি সিট দিয়ে যদি এই দলগুলোকে সঙ্গে রাখা যায় তো থাকলো।

“এরা বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি না করে বরং সঙ্গে থেকেই যদি আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ সার্ভ করতে পারে তাহলে কেন নয়?”

মি. চক্রবর্তী বলেন, ক্ষমতাসীন বড় দলগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে গিয়ে গণনীতি তৈরি করতে বাধ্য হয়। তখন ছোট দলের অনেক নেতা সমালোচনা করে।

এই সমালোচনা যাতে না আসে তার জন্যও অনেক সময় বড় দলগুলো ছোটদলগুলোকে জোটে জায়গা দিয়ে চুপ রাখতে চায়।

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাচনে জয়ের পর বড় দলগুলো ছোট দলগুলোর খুব একটি খোঁজ রাখে না। কয়েক বছর পর ক্ষমতাসীন দলের এমন অবজ্ঞার পর ছোটদলগুলো একত্রিত হয়ে আবার সমালোচনা শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে আবার বড়দলগুলো তাদের জোটে টানে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

মি. চক্রবর্তী বলেন, “এ ধরণের খেলা আসলে চলেই রাজনীতিতে।”