মানিকগঞ্জ হত্যাকাণ্ড: ঋণগ্রস্ত এবং হতাশ এই আসামীর পরিবারটি কেমন ছিল?

ছবির উৎস, Bangladesh Police
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
মানিকগঞ্জ জেলায় এক সঙ্গে একই পরিবারের তিন নারী হত্যাকাণ্ডের এমন ঘটনা কখনো ঘটেছে বলে শোনেননি এলাকাবাসী।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এবং হত্যাকাণ্ডের দায়ে গ্রেফতার পরিবারটির কর্তা আসাদুজ্জামান সম্পর্কে এখনো বিস্ময় কাটেনি এলাকাবাসীর।
ঘটনাস্থল ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের আঙ্গুরপাড়া গ্রামে কাজ করেন গ্রাম পুলিশ মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন।
"ওনাকে (অভিযুক্ত) আমি দেখতাম বেশ হাসিখুশি ছিল। পুরো পরিবারকে আমি চিনতাম। মেয়ে দুটো পড়াশুনায় ভাল ছিল,'' মি. হোসেন বলেন।
''ওনার ওয়াইফ বেশ সামাজিক ছিল। কারো কোন বিপদ হলে সাহায্যের জন্য সবসময় চলে যেত। কখনো কারো সাথে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে এমনও শুনিনি।"
পরিবার কর্তা আসামী
রবিবার সকালে নিজেদের ঘর থেকে মা লাভলী আক্তার, দুই মেয়ে ছোঁয়া এবং কথা আক্তার, এই তিনজনের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ।
অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান পেশায় একজন পল্লী দন্তচিকিৎসক। তিনি সোমবার বিচারকের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ তাদের তদন্ত সম্পন্ন করে আসাদুজ্জামানকে আসামী করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।

ছবির উৎস, Manikganj Police
আসাদুজ্জামানের বর্ণনা
পুলিশ বলছে, হত্যার সময় প্রথমে মাথায় আঘাত করে তিনজনকে দুর্বল করে ফেলা হয়, তারপর মুখে বালিশ চাপা দেয়া হয় এবং একদম শেষে জবাই করা হয়।
এই বর্ণনা আসাদুজ্জামান রুবেল নিজেই গতকাল গ্রেফতারের পর পুলিশকে দিয়েছেন।
"আমার যত বয়স, আর গ্রাম পুলিশে চাকরি করি যত বছর, এমন ঘটনা কখনো শুনিনি,'' বলছিলেন আমজাদ হোসেন।
''তাও আবার একসাথে মা ও দুই মেয়ে তিনজনকে এইভাবে খুন। পুরো জেলা থেকে বহু লোক এসেছিল গতকাল।"
প্রেম করে বিয়ে
তিনি জানিয়েছেন, আসাদুজ্জামান এবং লাভলী আক্তার প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন বছর কুড়ি আগে। সেসময় আর এক গ্রামে তাদের বাড়ি ছিল পাশাপাশি। দুর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন তারা।
তাদের দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে ১৬ বছর বয়সী ছোঁয়া এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। আর ছোট মেয়ে ১২ বছর বয়সী কথা পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল।

ছবির উৎস, Manikganj Police
আমজাদ হোসেন বলছেন, বিয়ের পর থেকে আসাদুজ্জামান এই গ্রামেই থাকেন।
''সেটার কারণ তার নিজের বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ ছিল। তার পরিবার প্রেমের বিয়ে মেনে নেয়নি,'' মি. হোসেন বলেন।
''বড় মেয়ে হওয়ার পর একবার সে স্ত্রীকে নিয়ে বাবার বাড়ি গিয়েছিল কিন্তু তখন তাকে বের করে দেয়া হয়। এরপর থেকে বাবার বাড়ির সাথে তার সম্পর্ক আছে বলে শুনিনি।
''তার শ্বশুর মেয়েকে কিছু জমি লিখে দিয়েছেন। সেখানে একটা টিনের ঘর তুলেছিলেন। সেখানেই থাকতেন," তিনি বলেন।
ঋণগ্রস্ত এবং হতাশ
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের দায়ে গ্রেফতারকৃত দন্তচিকিৎসক বড় ধরনের ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং সে নিয়ে বেশ হতাশার মধ্যে ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, "সে (অভিযুক্ত) বেশ বিলাসী জীবনযাপন পছন্দ করতো। দামি কাপড়চোপড়, মোবাইল ফোন ব্যাবহার করতো। চেহারাও নায়কের মতো। সবসময় ফেসবুকে ছবি দিত।
"স্ত্রী, মেয়েদেরও সুন্দর কাপড় কিনে দিত। দেখলে মনে হতো অনেক টাকার মালিক। বোঝা যেত না যে ওনার টাকা পয়সার সমস্যা আছে বা ঋণ আছে। পরিবারের বাইরে কারো সাথে তেমন একটা সময় কাটাতো না।"

ছবির উৎস, Getty Images
মানসিক অসুখ?
গ্রেফতারের পর তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে মনে হয়েছে, এমনটাই জানিয়েছেন এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কর্মকর্তা ঘিওর থানার উপ-পরিদর্শক বেলাল হোসেন।
আগে থেকেই কোন মানসিক সমস্যা ছিল কি না সেব্যাপারে কিছু জানাতে পারেননি তিনি।
"আমাদের উনি বলেছে দশ লাখের মতো ঋণ হয়ে গিয়েছিল ওনার। এলাকাবাসী বলেছে আরো অনেক বেশি হবে,'' বেলাল হোসেন বলেন।
''দাঁতের ডাক্তারি ভাল যাচ্ছিল না। উনি ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন কয়েকবার। যেটাই চেষ্টা করেছেন লস হয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছেন,'' তিনি বলেন।
ঋণের দায় থেকে পরিবারকে বাঁচাতে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন। তবে এর পেছনে অন্য কিছু আছে কি না সে ব্যাপারে তদন্ত চলছে।
''ওনাকে কোন পাওনাদার চাপ দিচ্ছিল কিনা সেটাও জানার চেষ্টা করছি," বেলাল হোসেন বলেন।

ছবির উৎস, Courtesy: Bangladesh Police
গেঞ্জি বদলে পাঞ্জাবি
হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান পরনের গেঞ্জি বদলে সাদা পাঞ্জাবি পরে ঘর থেকে বের হয়ে যান। যাওয়ার আগে শিকল দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রেখে যান।
ভোর তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটার কোন এক সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, পুলিশের কাছে এমনটাই বলেছেন অভিযুক্ত এই দন্ত চিকিৎসক।
মরদেহ উদ্ধারের সময় তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি এই কারণে প্রথম সন্দেহের তীর তার দিকেই গিয়েছিল।
রবিবার মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সেসময় তিনি রাস্তার পাশে শুয়েছিলেন বলে তার গ্রামবাসীদের একজন দেখতে পান। এরপর গ্রামের লোকজন পুলিশকে খবর দেয়।
এই ঘটনায় বাদী হয়ে হত্যাকাণ্ডের মামলা করেছেন অভিযুক্তের শ্বশুর।








