সিলেটে ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে একই ব্যক্তির লাশ দুইবার শনাক্ত

ছবির উৎস, Getty Images
সাতই মার্চ দুপুরে সিলেটের জৈন্তাপুরের ঘাঠেরচটি গ্রাম সংলগ্ন হাওড় এলাকার পুকুরে একটি লাশ ভাসতে দেখে এলাকার লোক পুলিশে খবর দেয়।
পুলিশের সাথে পরিবারের লোকেরাও আসেন, তারা শনাক্ত করেন এটি ৫ই মার্চ থেকে নিখোঁজ থাকা ডালিম আহমেদ।
এরপর অপরাধের ঘটনাস্থল খুঁজতে খুঁজতে ঘাঠেরচটি গ্রামেরই এক মসজিদের কাছ থেকে পুলিশ অর্ধেক মাটিচাপা দেয়া আরেক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে।
মৃতদেহের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে পুলিশ শনাক্ত করে ওই ব্যক্তি নিখোঁজ ডালিম আহমেদ। এবারও পরিবার সায় দেয়, নিশ্চিত করে মৃতদেহটি তাদের ছেলের।
দুইটি মরদেহকে একই ব্যক্তির হিসেবে শনাক্ত করায় এনিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
প্রশ্ন ওঠে, যদি পরেরজন আসলেই ডালিম আহমেদ হন, তাহলে প্রথমজন কে? আর পরিবার কেন দুইজনকেই শনাক্ত করলো?
ঘটনা কী হয়েছিল?
ডালিম আহমেদ পেশায় একজন নির্মাণ শ্রমিক, তিনি রড-মিস্ত্রীর কাজ করেন।
সর্বশেষ তিনি ঘাঠেরচটি গ্রামের হামযা মসজিদের পাশে একটি স্থাপনায় কাজ করছিলেন।
রাতের শিফটে কাজ করার জন্য ৫ই মার্চ বিকালে বেরিয়ে যান ডালিম আহমেদ।
তার বাবা মোঃ বাচ্চু মিয়া বলেছেন, রাতে কাজ থাকলে ছেলে ভোরের আলো ফোটার পরই বাড়ি আসে, কিন্তু ৬ তারিখ সকালে আসেনি।
তিনি তখন ছেলের কাজের জায়গায় খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন রাত আটটার দিকে একটি টেলিফোন পেয়ে ছেলে বেরিয়ে গিয়েছিল কর্মস্থল থেকে। এরপর আর ফেরেননি।

ছবির উৎস, Getty Images
ছয়ই মার্চ মি. মিয়া জৈন্তাপুর থানায় একটি জিডি করেন।
পরেরদিন ৭ই মার্চ দুপুরের পর ঘাঠেরচটির বাড়ির কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে চিকনাগুল হাওড় এলাকায় এক পুকুরে প্রায় বিকৃত, পা বাধা, ভাসমান একটি মরদেহ দেখতে পেয়ে এলাকার মানুষজন পুলিশে খবর দেন।
পুলিশের সাথে সাথে ডালিম আহমেদ পরিবারও খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।
পুলিশ বলছে, ভাসতে থাকা মৃতদেহটি পচে ফুলে উঠেছিল।
কিন্তু তবু সেই মৃতদেহকে নিজেদের সন্তান বলে শনাক্ত করেছিলেন ডালিম মিয়ার মা-বাবা।
জৈন্তাপুর থানার উপ-পরিদর্শক এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাজী শাহেদ বলছিলেন, উদ্ধারের পর সুরতহাল করে ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মি. শাহেদ বলেছেন, পুকুরে পাওয়া মৃতদেহটি দেখে তাদের কাছে অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড বলে মনে হয়েছিল।
সে কারণে তারা ঘটনা কোথায় ঘটেছে সেই খোঁজ শুরু করেন।
ততক্ষণে মধ্যরাত পেরিয়ে যায়।
প্রথম লাশ পাওয়ার প্রায় ১০ ঘণ্টা পর, আটই মার্চ রাত দুইটার সময় স্থানীয় মানুষের সাহায্যে পুলিশ অর্ধেক মাটিচাপা দেয়া এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে।
এই মরদেহটির গলা মাথা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন, পেটে ও হাতে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। মুখ তত বিকৃত নয়।
এবারও পরিবারের সদস্যরা লাশটি ডালিম আহমেদের বলে নিশ্চিত করেন।
কিন্তু এবার পুলিশ আর পরিবারের শনাক্তকরণেই থেমে যায়নি।
মৃতদেহের আঙ্গুলের ছাপ পুলিশ শনাক্ত করে ওই ব্যক্তিই নিখোঁজ ডালিম আহমেদ।
দ্বিতীয় লাশও ডালিম আহমেদের হলে প্রথমজন কে ছিলেন?
একই নামে দুই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার নিয়ে জৈন্তাপুরে গত কয়েকদিন বেশ আলোচনা চলছে।
প্রায় প্রতিদিনই ঘটনা জানতে আশপাশের গ্রাম ও ইউনিয়ন থেকে ডালিম আহমেদের বাড়িতে আসছে লোকজন।
তাদের জিজ্ঞাসা দ্বিতীয় ব্যক্তি ডালিম আহমেদ হলে প্রথমজন কে ছিলেন?
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
ডালিম আহমেদের বাবা বাচ্চু মিয়া বলেছেন, তারা যখন ঘটনাস্থলে পুকুরে লাশটি উল্টো হয়ে ছিল, তাতে ছেলেটির শরীর দেখে তার ছেলের মতই মনে হয়েছিল।
এছাড়া সেসময়ে অন্য কেউ নিখোঁজ ছিল এমন তথ্যও তারা শোনেননি।
ফলে তারা ধরে নিয়েছিলেন লাশটি তার ছেলের।
পুলিশ কর্মকর্তা কাজী শাহেদ জানিয়েছেন, পুকুরে পাওয়া লাশটির শরীর বিকৃত থাকায় হয়ত শনাক্তে ভুল করেছিল পরিবার।
কিন্তু পুকুরে পাওয়া লাশের ময়নাতদন্ত করে পুলিশ বলছে সেটি কার তা চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
মি. শাহেদ বলেন, পুকুরে পাওয়া লাশটি যে ব্যক্তির তার নাম শম্ভু দেবনাথ।
তিনিও ৪ঠা মার্চ থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
ঘাঠেরচটির পাশের গ্রাম বটেশ্বরেই বাড়ি শম্ভু দেবনাথের।
তার পরিবারের দেয়া একটি সেলফির সাথে পুকুরে ভাসতে থাকা মরদেহের পোশাক হুবহু মিলে যাওয়া দেখে পরিবার নিশ্চিত করেছে সেটি শম্ভুর মরদেহ।
তবে শম্ভুর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
কিন্তু এটিও স্বাভাবিক বা দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছিল না। মরদেহের পা বাধা ছিল এবং শরীরে আঘাত ছিল বলে পুলিশ বলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এখন দুইটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কিন্তু একদিনের ব্যবধানে পাশাপাশি দুইটি গ্রাম থেকে দুইজন যুবক নিখোঁজ হওয়া এবং কাছাকাছি সময়ে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে পুলিশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দুইয়ের মধ্যে কোন সংযোগ আছে কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বুধবার বিকেলে ডালিম আহমেদের মরদেহ দাফন করা হয়েছে।








