ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ: শান্তিবাদী নীতি থেকে সরে আসার পরও কেন জার্মানি এত দ্বিধা-দ্বন্দ্বে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ড্যামিয়েন ম্যাকগিনেস
- Role, বিবিসি নিউজ, বার্লিন
জার্মান জাতি নাকি অবসর পেলেই তাদের ঐতিহাসিক ভুলের জন্য অনুতাপ করে সময় কাটায়। তবে সেই মানদণ্ডের বিচারেও রাশিয়ার ব্যাপারে বার্লিনের নীতি নিয়ে যে ধরণের আত্ম-সমালোচনা এখন চলছে, তাকে অসাধারণই বলতে হবে।
রাশিয়া যখন ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে অভিযান চালালো, তখন অনেক জার্মান রাজনীতিক প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছিলেন, তারা ভ্লাদিমির পুতিনকে ঠিকমত বুঝতে পারেননি। এমনকি জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক-ওয়াল্টার স্টাইনমায়ারও ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, মস্কোর সঙ্গে সেতু তৈরির জন্য বাণিজ্য এবং জ্বালানিকে ব্যবহার করা ভুল ছিল।
"তিরিশ বছর ধরে যে আমরা সংলাপ আর সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলাম, তা যে মোটেই কাজ করেনি, এটি ছিল তার এক তিক্ত স্বীকারোক্তি। সে কারণেই এখন আমরা ইউরোপীয় নিরাপত্তার এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছি", বলছেন মিস্টার স্টাইনমায়ারের মধ্য-বামপন্থী দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মুখপাত্র নিলস স্মিড।
রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযান শুরুর পর জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজ পার্লামেন্টে এক ভাষণ দেন, যেখানে তিনি এই নতুন যুগের নাম দিয়েছেন "যেইটেনওয়েন্ড"- যার আক্ষরিক মানে হচ্ছে 'বাঁক বদল।'
জার্মানির এই নতুন নীতির মানে হচ্ছে, তারা অস্ত্র রফতানির সব নিয়ম-নীতি বাতিল করেছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বিপুলভাবে বাড়িয়েছে এবং রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি বন্ধ করতে যাচ্ছে। রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত নর্ড স্ট্রিম টু গ্যাস পাইপলাইন এরই মধ্যে স্থগিত রাখা হয়েছে।
"অদূর ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে আর কোন সহযোগিতা হবে না। বরং এখন থেকে আমাদের নীতি হবে কীভাবে রাশিয়াকে আটকানো যায় এবং ঠেকানো যায়, এবং দরকার হলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা যায়", বলছিলেন মিস্টার স্মিড।
মাত্র সাত সপ্তাহ আগেও যে দলটি বিশ্বাস করতো, অতীতের নাৎসী অপরাধের কারণে জার্মানিকে যে ঐতিহাসিক অপরাধ-বোধ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, সে কারণে যে কোন মূল্যে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি বজায় রাখা তাদের নৈতিক দায়িত্ব, তাদের মুখে এরকম কট্টর আক্রমণাত্মক কথা-বার্তা বেশ অপ্রত্যাশিত।

ছবির উৎস, AFP
কিন্তু বার্লিনে ইউক্রেন যুদ্ধের আঁচ খুব কাছে বলেই মনে হবে। ইউক্রেনে গোলায় বিধ্বস্ত বাড়িঘর দেখে মনে হবে যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কোন জার্মান নগরী। এবং যে তিন লাখের বেশি ইউক্রেনিয়ান শরণার্থী জার্মানির ট্রেন স্টেশনগুলোতে এসে নেমেছে, যাদের বেশিরভাগই নারী এবং শিশু, তা অনেককে ১৯৪৫ সালে রুশ সৈন্যদের কাছ থেকে পালানোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
অন্যান্য খবর:
এমনকি জার্মানি নিজের ইতিহাসকে এতদিন যেভাবে দেখতো, সেখানেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেনে অভিযান চালানোর আগে পর্যন্ত এখানে মূলধারার মতটা ছিল, দুই জার্মানিকে এক করা সম্ভব হয়েছিল মস্কোর সঙ্গে চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডটের সংলাপের ফলে - যিনি নিজেও ছিলেন এই এসপিডি'র নেতা।
কিন্তু এখন এই বিতর্ক যেন পাল্টে গেছে। বলা হচ্ছে মিস্টার ব্রান্ডট এই কূটনীতি চালিয়েছেন পেছনে শক্ত সামরিক সমর্থন রেখে। তখন পশ্চিম জার্মানির প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল জিডিপির তিন শতাংশ।
জার্মানিকে যুদ্ধের যে ঐতিহাসিক অপরাধবোধ বয়ে বেড়াতে হয়, সেটার আলোচনাও যেন এখন আরও বেশি রেখে-ঢেকে করা হচ্ছে। যেমন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নাৎসী জার্মানি যেসব অপরাধ করেছিল, জার্মান সরকার ইউক্রেনে যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে সেসব কথা উল্লেখ করছিল। তবে এটা ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে। আর এখন ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters
"পুতিনের আমলে রাশিয়ার সরকারি নীতি ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিকে রুশ-জার্মান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করা", বলছেন মিস্টার স্মিড। এর ফলে জার্মান সমাজের একটা অংশ দেখতেই পায়নি যে ইউক্রেনিয়ানরাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছে, বলছেন তিনি।
নাৎসিদের হাতে ইউক্রেনিয়ানরাও যে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছে, এখন সেই সচেতনতা অনেক বেড়েছে। বার্লিনের কথাবার্তা নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। তবে অনেকের প্রশ্ন, কথা যত হচ্ছে, কাজ ততটা দ্রুত ঘটছে কীনা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কেবল ভালো ভালো কথার সমর্থনে সন্তুষ্ট নন। জার্মানি যে এখনো রাশিয়ার তেল আর গ্যাসের ওপর নির্ভর করে আছে, তিনি তার সমালোচনা করেছেন।
গত সপ্তাহে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মিস্টার জেলেনস্কি রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা বাবদ জার্মানি যে অর্থ দিচ্ছে তাকে 'ব্লাড মানি' বলে বর্ণনা করেছেন। জার্মানির প্রেসিডেন্ট স্টাইনমায়ার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফরের যে পরিকল্পনা করেছিলেন, সেটি শেষ মূহুর্তে বাতিল করা হয়েছে।
এই সফর কেন বাতিল হয়েছিল তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিছু ইউক্রেনিয়ান কর্মকর্তা দাবি করছেন, মিস্টার স্টাইনমায়ারের আমন্ত্রণ বাতিল করা হয়েছে, ব্যাপারটা এমন নয়।
তবে জার্মান রাজনীতিক এবং ভাষ্যকাররা এই বাতিল হওয়া সফরকে জার্মান প্রেসিডেন্টকে যে ইউক্রেন মোটেই বিশ্বাস করে না, তারই ইঙ্গিত বলে মনে করেন। কারণ অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের অধীনে মিস্টার স্টাইনমায়ার যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি বহু বছর ধরে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখার নীতি নিয়েছিলেন।
ব্রান্ডেনবার্গ গেট হচ্ছে আরেকটি 'ওয়েন্ড' এর প্রতীক, জার্মান ভাষায় এই শব্দ দিয়ে বোঝানো হয় দুই জার্মানির একত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে। তার কাছে একটি জায়গায় আমার সাক্ষাৎ হয় জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ক্লডিয়া মেজরের সঙ্গে। তিনি এই সংস্থার একজন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
"আমাদের মিত্ররা আমাদের দিকে তাকায়, তারপর প্রশ্ন করে, "বুঝলাম, তোমরা এখন "যেইটেনওয়েন্ড"-অর্থাৎ বাঁক-বদলের নীতি নিয়েছো, কিন্তু বাস্তবে আসলে কাজটা কি করছো?" বলছেন তিনি।
ক্লডিয়া মেজর বলেন, "নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে আমরা খুবই নরম অবস্থান নিয়েছি, অস্ত্র সরবরাহ করতে আমরা খুবই অনিচ্ছুক। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই ইউক্রেনিয়ানরা প্রশ্ন করছে, যেইটেনওয়েন্ডের মানে তাহলে কী? জার্মানি অর্থনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের মাঝখানে এক বিরাট শক্তি, আমরা যাই করি, তা একটা বিরাট পার্থক্য ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটা ভালোই হোক, বা মন্দই হোক।"
জার্মানি রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করবে বলে অঙ্গীকার করেছে, তবে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারির পরিবর্তে তারা এটা করতে চায় ধাপে-ধাপে। কারণ সরকারের যুক্তি হচ্ছে, হঠাৎ করে এটা করলে তা জার্মানিকে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ফেলে দেবে, হাজার হাজার মানুষ তাদের কাজ-কর্ম হারাবে।

ছবির উৎস, EPA
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিয়ানা ফিক্স বলছেন, জার্মানি নিজেই নিজের জন্য এই ফাঁদ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, "অন্যান্য দেশ, যারা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে প্রস্তুত, তাদের পক্ষে এটা মেনে নেয়া কঠিন, কারণ তারা তাদের জ্বালানী বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়ার প্রস্তুতি অনেক আগে নিয়ে রেখেছে।"
জার্মানিতে পরিবেশবাদী দল, গ্রীন পার্টি বহু বছর ধরেই বলে আসছিল জার্মানির উচিৎ জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানো। এখন সেই দলেরই একজন রাজনীতিক, অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট হাবেকের ওপর সেই দায়িত্ব পড়েছে।
আরও পড়ুন:
বার্লিন বলছে, ইউক্রেনকে সামরিক সমর্থন দেয়ার জন্য তারা যেরকম অস্ত্রেরই দরকার হোক, তা পাঠাবে। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, এক্ষেত্রে জার্মানির কিছু মন্ত্রণালয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রেও সরকারকে আরও দ্রুত আগানোর জন্য চাপ দিচ্ছে ক্ষমতাসীন জোটভুক্ত গ্রীন পার্টির একজন নেতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেরবক। তিনি ইউক্রেনকে ট্যাংক বা যুদ্ধবিমানের মতো ভারী অস্ত্রশস্ত্র দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে জার্মান চ্যান্সেলরকে যখনই এ নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তখনই মনে হচ্ছে যেন এর উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে তিনি তার দলের সমর্থন হারাতে পারেন বলে ভয়ে আছেন।
ওলাফ শোলৎজকে একদিকে তার নিজ দলের সমর্থন ধরে রাখতে হবে, একই সঙ্গে ত্রিদলীয় জোটের কোয়ালিশন সরকার দিয়ে দেশ চালাতে হবে। একই সঙ্গে রাতারাতি জার্মানির ঐতিহাসিক অপরাধবোধের দায় নেয়া শান্তিবাদী নীতি পাল্টাতে হবে।
তবে তার মিত্ররাও স্বীকার করছেন, মিস্টার শোলৎজকে আরও স্পষ্ট করে বলতে হবে আসলে এখন ঠিক কী ঘটছে। পার্লামেন্টে কেবল একটা ভাষণ আর কয়েকটা টেলিভিশন টক শোতে কথা বললেই সেটা যথেষ্ট নয়, বলছেন ক্লডিয়া মেজর।








