মুক্তিযুদ্ধের পর যেভাবে বাংলাদেশের বন্দর সচল করেছিল রাশিয়ার নাবিকরা

ছবির উৎস, Embassy of Russia in Bangladesh
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পরেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ জটিল এক সমস্যার মুখোমুখি হয়।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটিতে আমদানি-রপ্তানি শুরু করা দরকার। কিন্তু চট্টগ্রাম ও চালনা (এখনকার মোংলা) বন্দর চালু করা যাচ্ছিল না, কারণ পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য মাইন ফেলে রেখেছে।
মাইন ছাড়াও গেরিলা বাহিনীর অভিযান ও ভারতের হামলায় ডুবে যাওয়া ছোট-বড় অসংখ্য জাহাজ কর্ণফুলী নদীর মোহনায় ডুবে ছিল। ফলে বন্দরে কোন জাহাজ ভেড়ানো যাচ্ছিল না।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে নৌপথে আমদানি-রপ্তানি চালু করতে না পারায় ব্যবসা-বাণিজ্য আটকে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বিবিসি বাংলার মোয়াজ্জেম হোসেনকে বলেছেন, ''চিটাগাং পোর্ট তখন বন্ধ, কারণ পাকিস্তানিরা মাইন ফেলে রেখেছে। সেটাকে ডি-মাইন (মাইন মুক্ত) করতে হবে। আমাদের সব ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। সেটা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।''
"আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তখন পুরোপুরি বন্ধ, কারণ বন্দর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, আপনি জাতিসংঘের সাথে আলাপ করুন। তিনি চাননি বন্দর মাইন মুক্ত করার কাজে কোন বৃহৎ শক্তি জড়িত হোক। কারণ দেশের নিরাপত্তা নিয়ে তার মধ্যে উদ্বেগ ছিল," বলছিলেন নুরুল ইসলাম।

ছবির উৎস, Embassy of Russia in Bangladesh
কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর মাইন মুক্ত করার কাজে জাতিসংঘের সাহায্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের সহায়তা চাওয়া হলে তারা জানায়, যেহেতু সংস্থাটি অনুদান নিয়ে চলে, তাই অর্থ সংগ্রহ, সরঞ্জাম সংগ্রহ ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সময় লাগবে।
তবে এ ব্যাপারে সাহায্য এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকেই।
প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ''ওরা (সোভিয়েত ইউনিয়ন) এই ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। বললো, তোমরা কেন চট্টগ্রাম বন্দর চালু করছো না, তোমাদের তো ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। ''
''উনি (শেখ মুজিবুর রহমান) কিন্তু সেটায় তাড়াতাড়ি রাজি হননি। কারণ বিগ পাওয়ার, কি করে না করে। উনি জাতিসংঘের সহায়তার জন্য চেষ্টা করতে বললেন। আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে একটু সময় নিলাম। ''
এরপর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান যখন মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় সফরে যান, তখন আবার এই প্রসঙ্গটি ওঠে।
অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলছিলেন, "বঙ্গবন্ধু যখন তার প্রথম সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নে গেলেন, তখন আমি সাথে ছিলাম। তখন ওরা বললো, কি ব্যাপার, তোমরা এটা চাইছো না। তোমাদের তো পোর্ট চলছে না। আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম, কি করবো?
''তিনি বললেন, একটু সময় চান। নিউইয়র্কে (জাতিসংঘে) আবার ফোন করেন। ওরা (জাতিসংঘের কর্মকর্তারা) বললো, কোন মতে বন্দোবস্ত করতে পারছি না, টাকা-পয়সা নেই। তোমাদের অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে, না হলে আমাদের সময় দিতে হবে। সময় দিলে তো আমাদের পোর্ট চলবে না। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর কথা মতো রাজি হলাম, তোমরা করো।''
এরপর দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই মাসেই একটি প্রতিনিধি দল পাঠায় রাশিয়া।
''এরপর ভ্লাদিভস্তক থেকে ওরা বিরাট দল পাঠালো চট্টগ্রামে। কাজটা ওরা বেশ দ্রুতই শেষ করেছিল", বলছিলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম।
ওই অভিযানে ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছে ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাস। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭২ সালের ২১শে মার্চ সোভিয়েত নৌবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে।
ভাইস অ্যাডমিরাল সের্গেই যুয়েঙ্কোর নেতৃত্বে এক হাজার নাবিকের একটি বিশেষ টাস্কফোর্স মাইন অপসারণের কাজ শুরু করে। ওই অভিযানে অংশ নিয়েছিল ২৪টি জাহাজ।

ছবির উৎস, Embassy of Russia in Bangladesh
এসব জাহাজের মধ্যে ছিল ভাসমান ওয়ার্কশপ, মাইন সুইপার, দ্রুতগামী নৌকা, সমুদ্রগামী টাগ, একটি ট্যাঙ্কার, একটি এএইচটিএস জাহাজ, একটি ক্রেনবাহী বার্জ, একটি হাইড্রোগ্রাফিক সাউন্ডিং সিস্টেম সম্বলিত জাহাজ, ক্রুদের বহনকারী জাহাজ, স্টর্ম বোট, মোবাইল ডাইভিং স্টেশন এবং একটি ভাসমান গুদাম৷
তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনী বঙ্গোপসাগর থেকে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছিল এপ্রিল মাসে। যদিও জুলাই মাসের মধ্যে জাহাজ চলাচলের একটি প্রণালি বের করে ফেলেছিল টাস্কফোর্স, কিন্তু মাইন এবং ডুবে থাকা জাহাজ অপসারণ করে পুরো কাজ শেষ করতে বিশেষ টাস্কফোর্সের সময় লেগেছিল ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত।
ঢাকায় রুশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া ২৬টি জাহাজ উদ্ধার করে এই টাস্কফোর্স। তার মধ্যে যুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া জাহাজ যেমন রয়েছে, তেমনি উনিশ শতকে ডুবে যাওয়া জাহাজও পাওয়া গেছে।
ওই অভিযানে কাজ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ইউরি রেডকিন নামের রাশিয়ার একজন নাবিক। তাকে পতেঙ্গায় বাংলাদেশ ন্যাভাল অ্যাকাডেমিকে কবর দেয়া হয়, যে জায়গাটি রেডকিন পয়েন্ট নামে পরিচিত।
ভাইস অ্যাডমিরাল সের্গেই যুয়েঙ্কো এবং তার দলকে ২০১২ সালের ২৭ মার্চ 'মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধু' হিসাবে সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।








