অপারেশন জ্যাকপট: ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরানো প্রথম নৌ-কমান্ডো অভিযান

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির উৎস, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির ক্যাপশান, অপারেশ জ্যাকপটে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের একটি
    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌ-কমান্ডো বাহিনীর পরিচালিত প্রথম অভিযান ছিল 'অপারেশন জ্যাকপট'। ১৯৭১ সালের ১৬ই অগাস্ট প্রথম প্রহরে দেশের দুইটি সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম ও মোংলা, এবং দুইটি নদী বন্দর -- চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে একযোগে একই নামে পরিচালিত অপারেশনগুলো চালানো হয়েছিল।

অপারেশন জ্যাকপট ছিল একটি আত্মঘাতী অভিযান।

এই অভিযানকে মুক্তিযোদ্ধারা সফল অভিযান বলে বর্ণনা করেন, কারণ এই অপারেশনে পাকিস্তান ও আরও কয়েকটি দেশ থেকে আসা অস্ত্র, খাদ্য ও তেলবাহী ২৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল।

এ অভিযানে অংশগ্রহণকারী কোন গেরিলা শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েননি।

এছাড়া, বিদেশী জাহাজ ধ্বংস হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যখন সে খবর প্রকাশ পায়, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কোন যুদ্ধ হচ্ছে না বলে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রচারণা বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ কীভাবে হয়েছিল?

১৯৭১ সালের অগাস্টের ১৫ তারিখ রাতে অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এর পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল সেই বছরের মে মাসে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের একজন নেতা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। অপারেশন জ্যাকপটে চট্টগ্রাম বন্দরের অভিযান তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর উত্তম খেতাব লাভ করেছিলেন।

নিজের 'লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে' বইয়ে লিখেছেন মেজর রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, পাকিস্তানি বাহিনীর নৌযান ধ্বংস এবং নৌ-যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টির মাধ্যমে পাকিস্তানি সৈন্য চলাচল, সমর-সরঞ্জাম ও রসদ পরিবহন ব্যহত করা ছিল ওই অপারেশনের প্রধান লক্ষ্য।

সেই লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ২৩শে মে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহায়তায় ভাগিরথী নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশী স্মৃতিসৌধের পাশে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়।

এর সাংকেতিক নাম দেয়া হয়ে হয়েছিল 'সি-টু-পি'।

জুন মাসের প্রথম দিকে বিভিন্ন সেক্টর থেকে বাছাই করা স্বাস্থ্যবান ও ভালো সাঁতার জানেন এমন ৩০০ জনের একটি দল 'সি-টু-পি' ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির উৎস, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির ক্যাপশান, অপারেশ জ্যাকপটে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে ডুবে যাচ্ছে আরেকটি জাহাজ

দীর্ঘ সময় ঢেউ ও স্রোতের মধ্যে নদীতে অবস্থান করতে ও সাঁতার কাটতে পারার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেই সাথে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় শরীরে লিমপেট মাইন বেধে পানিতে চলাচল এবং সহজে বহনযোগ্য কার্যকর বিস্ফোরক বহন ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বিষয়ে।

জুলাই মাসের শেষদিকে প্রশিক্ষণ শেষ হয়। এরপর দিনক্ষণ নির্ধারণসহ হামলার পরিকল্পনা করা হয়।

মেজর রফিকুল ইসলাম আরও লিখেছেন, প্রশিক্ষণের বিষয়ে চূড়ান্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছিল - এমনকি সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে যার এলাকায় অপারেশন চালানো হবে, সেই এলাকার পরিকল্পনার ব্যাপারে কেবল তাকে জানানো হয়েছিল।

অভিযানটির নামকরণ করা হয় 'অপারেশন জ্যাকপট'।

পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে একই দিনে একই সময়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরের নদীবন্দরে হামলা চালানো হবে।

রেডিও সংকেতে হামলার নির্দেশনা

মোংলায় অপারেশন জ্যাকপট দলের সদস্য ছিলেন নৌ-কমান্ডো রফিকুল ইসলাম বাবলা।

পঞ্চাশ বছর আগের ওই অভিযান সম্পর্কে বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, প্রশিক্ষণের শুরুতে গেরিলা যোদ্ধাদের জানানো হয়েছিল যে এটি একটি আত্মঘাতী অপারেশন হবে।

অপারেশন সফল করতে প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর কাছ থেকে ছবিসহ একটি ফরমে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নেয়া হয়েছিল।

'লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে' বইয়ে মেজর রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, চারটি বন্দরে হামলা পরিচালনার জন্য চারটি ছোট দল গঠন করা হয়, যাদেরকে বাছাই করা হয়েছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে।

এসব দলের কমান্ডারদের জানানো হয়েছিল, রেডিওতে আকাশবানী কলকাতা স্টেশন থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে দুইটি বাংলা গানকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

তাদেরকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিও জানিয়ে দেয়া হয়।

গান দুটির প্রথমটি ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া 'আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান' -- এর অর্থ ছিল, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ পরিচালনা করতে হবে।

দ্বিতীয় গান ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া 'আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি' -- এই সংকেতের মানে ছিল আক্রমণের জন্য ঘাঁটি ত্যাগ কর।

অপারেশন জ্যাকপট ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে অভিযান

অপারেশন জ্যাকপটের চট্টগ্রাম বন্দরের অভিযানটি পরিচালিত হয় সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির উৎস, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির ক্যাপশান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নৌ-কমান্ডো সেকশনের একাংশ

তিনি তার বইয়ে লিখেছেন, জুলাই মাসের ২৮ তারিখে ভারতী বাহিনীর 'ডেলটা' সেক্টরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং-এর সাথে চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ-অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

এজন্য চট্টগ্রাম বন্দররে কর্মকাণ্ড এবং কর্ণফুলী নদীতে জাহাজ চলাচল সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। সেই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে চন্দ্রতিথি, আবহাওয়ার অবস্থা, বাতাসের বেগ, জোয়ার-ভাটার সময়, স্রোতের গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি তথ্য যুক্ত করা হয়।

চট্টগ্রামে বন্দরে অপারেশন চালানোর জন্য বাছাই করা হয়েছিল ৬০ জনের একটি দল।

মেজর রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিজন নৌকমান্ডোকে একটি করে 'লিমপেট মাইন', একটি ছুরি, একজোড়া সাঁতারের ফিন আর কিছু শুকনো খাবার দেয়া হয়। প্রতি তিনজনের জন্য একটি করে স্টেনগান এবং এই দলের নেতা আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীর জন্য ছিল একটি রেডিও।

রেডিওতে প্রথম গান বাজানোর মাধ্যমে সংকেত দেয়া হয় ১৪ই অগাস্ট, আর নির্ধারিত দ্বিতীয় গানটি বাজানো হয় ১৫ই অগাস্ট।

চট্টগ্রাম বন্দরে সেই সময়ে 'এম.ভি হরমুজ' এবং 'এম.ভি আল-আব্বাস' নামে দুটি জাহাজ নোঙর করা ছিল, যেগুলো বহন করছিলো পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র।

প্রথমটিতে ৯,৯১০ টন এবং দ্বিতীয়টিতে ১০,৪১৮ টন সমর-সম্ভার ছিল।

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে
ছবির ক্যাপশান, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বইয়ের প্রচ্ছদ

এছাড়া বন্দরের ফিস হারবার জেটির সামনে ৬,২৭৬ টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে 'ওরিয়েন্ট বার্জ' নামে আরেকটি জাহাজ অবস্থান করছিল। অন্যান্য জেটিতেও কিছু জাহাজ ও বার্জ, নেভাল জেটিতে দুইটি গানবোট এবং একটি বার্জ বাঁধা ছিল।

অপারেশনে সরাসরি অংশ নেন ৩১ জন কমান্ডো।

হামলা পরিচালনার প্রসঙ্গে মেজর রফিকুল ইসলাম লেখেন, ১৬ই আগস্ট প্রথম প্রহরে রাত একটায় নৌ-কমান্ডোরা যাত্রা শুরু করেন।

রাত সোয়া একটায় জাহাজের উদ্দেশ্যে সাঁতরানো শুরু করেন তারা, এবং দ্রুততার সাথে টার্গেট জাহাজের গায়ে মাইন লাগিয়ে সাঁতার কেটে সরে পরেন।

রাত ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর একে একে সবগুলো মাইন বিস্ফোরিত হয়। এ সফল অপারেশনের ফলে তিনটি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ পানিতে তলিয়ে যায়।

মোংলা বন্দরে অপারেশন

মোংলায় অপারেশন জ্যাকপট দলের একজন সদস্য নৌ-কমান্ডো রফিকুল ইসলাম বাবলা জানান, ১৩ই অগাস্ট ভারতীয় অংশের সুন্দরবন পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে ৬০ জনের একটি নৌ-কমান্ডো দল।

এরপর ১৫ই অগাস্ট রাত ১২টায় ৪৮ জন নৌ-কমান্ডো নৌকা নিয়ে মোংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।

নদীতে নেমে পথ প্রদর্শকের ভুলে নির্ধারিত সময়ে হামলা চালাতে ব্যর্থ হয় দলটি। ফলে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ভোর সাড়ে চারটার দিকে মোংলা বন্দরে অপারেশন শুরু হয়।

রফিকুল ইসলাম বাবলা আরও জানান, একেকটি দলে ছয়জন করে নৌ-কমান্ডো ছিলেন, এবং একেকটি দলের দায়িত্ব ছিল একটি করে জাহাজ ধ্বংস করা।

তাদেরকে বলা হয়, সাঁতরে দ্রুত লিমপেট মাইন জাহাজের তলদেশে লাগিয়ে কেটে পড়তে হবে।

মোংলা বন্দরে ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে বিকট শব্দ করে মাইন ফাটতে শুরু করেছিল।

এ অপারেশনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজ, একটি সোমালীয়, দুইটি চীনা, একটি জাপানি এবং একটি পাকিস্তানি জাহাজ, অর্থাৎ মোট ছয়টি অস্ত্র, খাদ্য এবং তেলবাহী বিদেশী জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছিল।

মোংলার অপারেশনে প্রায় ৩০ হাজার টন গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম পশুর নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

চাঁদপুর বন্দরে অভিযান

চাঁদপুরে অপারেশন সম্পর্কে বাংলাপিডিয়াতে বলা হয়েছে, এতে ১৮ জন নৌ-কমান্ডো অংশ নিয়েছিলেন।

এ গ্রুপের ১৮ জনকে তিন জন করে মোট ৬টি ছোট দলে ভাগ করা হয়।

অপারেশন জ্যাকপটে তলদেশ বিস্ফোরিত হওয়া একটি জাহাজ

ছবির উৎস, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির ক্যাপশান, অপারেশন জ্যাকপটে তলদেশ বিস্ফোরিত হওয়া একটি জাহাজ

বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলোতে লিমপেট মাইনের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুটি স্টিমার, গমবাহী একটি বড় জাহাজসহ কয়েকটি নৌযান ধ্বংস করা হয়।

নারায়ণগঞ্জে অভিযান

এ অপারেশনে মোট ২০ জন কমান্ডো অংশ নেন।

অগাস্টের ১৬ তারিখের প্রথম প্রহরে চালানো নারায়ণগঞ্জের অপারেশনে মোট চারটি জাহাজ ও বেশ কয়েকটি ছোট নৌযান বিস্ফোরণের মাধ্যমে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

একই সময়ে দাউদকান্দি নদীবন্দরেও হামলা চালানো হয়।

অপারেশন জ্যাকপটের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?

অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় নৌ-কমান্ডোরা একযোগে চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জ বন্দরে আক্রমণ করে পাকিস্তান বাহিনীর মোট ২৬টি পণ্য ও সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ ও গানবোট ডুবিয়ে দিয়েছিলেন।

মেজর রফিকুল ইসলাম তার লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বইয়ে লিখেছেন যে পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে একযোগে চালানো এসব হামলার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মারাত্মক।

তিনি জানান, হামলার পরপর আক্রান্ত জায়গাগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনী ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। সান্ধ্য আইন জারি করা হয় চট্টগ্রামে।

মুক্তিফৌজের সন্ধানে মোংলা, চাঁদপুর এবং চট্টগ্রামে হেলিকপ্টারে করে টহল শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নৌ-কমান্ডো সেকশন

ছবির উৎস, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবির ক্যাপশান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নৌ-কমান্ডো সেকশনের একাংশ

সব কটি জায়গায় নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।

তবে এসব প্রতিক্রিয়ার চেয়েও মারাত্মক একটি ফল হয়েছিল অপারেশন জ্যাকপটের, যার কারণে অনেকেই মনে করেন যে এ অপারেশন ছিল মুক্তিযুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডো অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব অনিল বরণ রায় বলেন যে অপারেশন জ্যাকপট সফলভাবে পরিচালনার কারণে যেমন বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে তা জায়গা করে নিয়েছিল, তেমনি জাহাজ চলাচলের ওপরও এর একটি প্রভাব পড়ে।

"এই অপারেশনের ফলে দুইটি লাভ হয়েছিল -- প্রথমটি হচ্ছে পণ্য ও অস্ত্র পরিবহণের প্রধান রুটটি যেহেতু ছিল নৌপথ, এই অভিযানের পর সেখানে একটি বড় বাধা আসলো। অনেক বিদেশী জাহাজ নিরাপত্তার কারণে আর চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে আসতে রাজি হচ্ছিল না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

আর দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটি হয়েছিল, তিনি যোগ করেন, যেহেতু অনেকগুলো বিদেশী জাহাজ ধ্বংস হয়েছিল, ফলে সে খবর ফলে ফারইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডসহ অনেকগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল।

"এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পাকিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতার একটি সংকট দেখা দেয়," বলেন অনিল বরণ রায়।

"মার্চে চালানো গণহত্যার কথা তো তারা অস্বীকার করেই আসছিল। উল্টো পাকিস্তান প্রচার করছিল, পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক, এখানে মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে না। কিন্তু অপারেশন জ্যাকপট পাকিস্তানের প্রচারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। ফলে এই অপারেশন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে।"

মুক্তিযুদ্ধে নৌ-অভিযানের সূত্রপাত হয়েছিল অপারেশন জ্যাকপটের মাধ্যমে।

এরপর নভেম্বর মাস পর্যন্ত আরও বেশ কিছু অভিযানে অন্তত ১২৬টি ছোট-বড় জাহাজ ধ্বংস করেছিলেন নৌ-কমান্ডোরা। তবে অপারেশন জ্যাকপটের পরপরই পাকিস্তানি বাহিনী সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর এবং প্রধান সেতুগুলোর সামনে-পেছনে বহু সংখ্যক তল্লাশি চৌকি বসিয়েছিল।

অনুমতি ছাড়া তখন নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, যা চলেছিল একেবারে ডিসেম্বরে প্রায় শেষ পর্যন্ত।