রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, ধস পুঁজিবাজারে

ছবির উৎস, Getty Images
ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের ফল হিসেবে সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল এবং গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। আর এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধাক্কার কারণ হতে পারে এমন আশংকা থেকে পুঁজিবাজারে ধস নেমেছে।
সোমবার অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি মূল্য প্রায় ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। আর পরের দিনের হোলসেল গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে এমন ইঙ্গিতে বিভিন্ন দেশ নিজের নিজের সরবরাহ বাড়াতে পারে এমন খবরের পর এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটলো।
এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বাড়বে বলে বিশ্লেষকেরা আগেই সতর্ক করেছিলেন। আর এই সংকটের ছাপ পড়েছে পুঁজিবাজারেও।
ফ্রান্স এবং জার্মানির প্রধান পুঁজিবাজারে দিনের শুরুতে চার শতাংশ পতন হয়, আর যুক্তরাজ্যের ফাইনান্সিয়াল টাইমস স্টক এক্সচেঞ্জ বা এফটিএসই সূচকের পতন হয় দুই শতাংশের বেশি। এশিয়ার পুঁজিবাজারেও পতন হয়েছে।
স্বর্ণের বাজার, যুদ্ধ বা সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা যা সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করেন, আউন্স প্রতি তার দাম দুই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। প্রায় ১৮ মাস পর স্বর্ণের দাম এত বাড়লো।
পেট্রল এবং ডিজেলের দাম ইতিমধ্যেই রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পোর্টল্যান্ড ফুয়েলের প্রধান, জেমস স্পেনসার সোমবার বিবিসিকে বলেছেন, শীঘ্রই আরো ১২ শতাংশ বাড়তে যাচ্ছে দাম।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেছেন, বাইডেন প্রশাসন এবং মিত্ররা রাশিয়ার তেল সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, রুশ তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবার জন্য আইনগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।
সেই সাথে ইউক্রেনে রাশিয়া অভিযান চালানোর প্রতিক্রিয়ায় এ সপ্তাহেই কংগ্রেস ইউক্রেনকে ১০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেবার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতে যাচ্ছে।
এক চিঠিতে মিজ পেলোসি বলেছেন, "রাশিয়াকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করার জন্য শক্ত আইন খতিয়ে দেখছে হাউজ।"
এই মন্তব্য এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হোয়াইট হাউজ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার যে প্রভাব পড়বে
রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আসলে সেটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে।

ছবির উৎস, Getty Images
তেলের বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভ্যানডা ইনসাইটসের ভানদানা হারি বলেছেন, "রাশিয়ার তেল আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র হয়ত সহজে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে, কিন্তু ইউরোপ সেটি করতে পারবে না।
আশংকার কথা হচ্ছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে পুতিন ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে, যা পুরো ঐ মহাদেশের মূল জ্বালানির উৎস।"
বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের ব্যারেল প্রতি দাম গত সপ্তাহে ২০ শতাংশ বেড়েছে।
এর মূল কারণ এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবারহে ঘাটতি দেখা দেবে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে গৃহস্থালির অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
রোববার আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পগুলোতে পেট্রলের দাম ১১ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা ২০০৮ সালের জুলাই মাসের পর সর্বোচ্চ।
যুক্তরাজ্যেও পেট্রল এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে, এখন পেট্রল গড়ে লিটার প্রতি এক পাউন্ড ৫৩ পেনি এবং প্রতি লিটার ডিজেল এক পাউন্ড ৫৭ পেনিতে বিক্রি হচ্ছে।
কিন্তু পোর্টল্যান্ড ফুয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মি. স্পেনসার বলছেন, খারাপ খবর আরো আসছে এবং দাম আরো বাড়বে।
"আমরা যদি বাড়তি সরবরাহ পাইও তাহলেও দ্রুত কিছু হবে না," বিবিসিকে বলেছেন তিনি, "হতে পারে যে দাম লিটারে এক পাউন্ড ৭০ পেনি থেকে ৭৫ পেনিতে গিয়ে ঠেকবে।"
তিনি আরো বলেন যে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যারা ব্যক্তিগত গাড়ি চালাতেন তারা খরচ কমাতে পারবেন। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাদের কোন বিকল্প থাকবে না । তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হবে বলে বলছেন মি. স্পেনসার।
এদিকে, এই সংকটের মধ্যে গ্যাসের দামও বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যে জ্বালানির পেছনে ভোক্তাদের বার্ষিক খরচ ৩০০০ পাউন্ড পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
বিকল্প কী হতে পারে?
গত কয়েকদিনে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে এমন আশংকার কারণে ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
রোববার জ্বালানি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান শেল ইউক্রেনে অভিযান চালানোর পরেও রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দিয়েছে।
বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ছাড়কৃত দামে জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন ছিল।
তবে শুক্রবারে রাশিয়ার কাছ থেকে এক কার্গো অপরিশোধিত তেল কিনেছে বলে নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তার "আর কোন উপায় ছিল না।"
যদিও এ সিদ্ধান্তের জন্য শেলকে বিস্তর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা টুইটারে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, "রাশিয়ার তেলে আপনারা ইউক্রেনিয়ানদের রক্তের গন্ধ পান না?"
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাশিয়ার তেলের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার কারণে বিকল্প সরবারহ খুঁজে বের করার ওপরও চাপ বাড়ছে।
ধারণা করা হচ্ছে এ সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে তেলের উৎপাদন বাড়াতে চাপ দিতে যাচ্ছে। আর ইরানের পরমাণু বিষয়ে একটি চুক্তি হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, আর তা হলে তেল রপ্তানিতে ইরানের কোন বাধা থাকবে না।
কিন্তু চুক্তির বিষয়ে বাধা হচ্ছে, রাশিয়া আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিশ্চয়তা চেয়েছে যেন নিষেধাজ্ঞার ফলে তেহরানের সাথে তার ব্যবসাবাণিজ্যে প্রভাব না পড়ে।
বিশ্বের বড় বড় ব্রান্ডগুলো একের পর এক রাশিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে থাকার প্রেক্ষাপটেই তা করে রাশিয়া।
সর্বশেষ ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটক রাশিয়ায় লাইভস্ট্রিমিং বন্ধ এবং রাশিয়া থেকে আসা নতুন কন্টেন্টের সম্প্রচার করবেনা বলে জানায়।
এদিকে, স্ট্রিমিংয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্সও রাশিয়ায় তাদের সেবা বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এর আগে ভিসা এবং মাস্টারকার্ড রাশিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেয়।








