পরিবেশ: সিমেন্ট ব্লক দিয়ে বাড়ি তৈরিতে সুবিধা কোথায়?

ছবির উৎস, Getty Images
কাওসার বকুলের বাড়ি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নওগাঁর মান্দা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে।
সে এলাকায় কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত চারটি ইটভাটা আছে।
কাওসার বকুল জানালেন, সেখানে একটি ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসে মাঠের কয়েক বিঘা জমিতে ধানের শীষ নষ্ট হয়ে গেছে।
এতো গেল এক ধরণের ক্ষতি। ইটভাটার কারণে পরিবেশ ও কৃষির উপর যে নানামুখী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে সেটি এখন অনেকরই।
পরিবেশবাদী, স্থপতি এবং প্রকৌশলীরা বলছেন, ইটভাটার সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে লোকালয় রক্ষা করতে হলে কংক্রিটের তৈরি ব্লক দিয়ে বাড়ি বানানোর বিকল্প নেই।
ব্লক তৈরি হয় কিভাবে?
কৃষি জমির উপরিভাগ থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরি করা হয়। ফলে জমি উর্বরতা হারায়।
অন্যদিকে ব্লক নির্মাণ করতে প্রয়োজন পলিবালু। নদীর তলদেশ দিয়ে এই পলিবালু প্রবাহিত হয়। পলিবালু জমে নদীর গভীরতা কমে যায়। ফলে নৌপথ সচল রাখতে প্রতিবছর ড্রেজিং করতে হয়।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ৭০০ একর কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। এটি মোট চাষযোগ্য জমির এক শতাংশ। এই ৭০০ একর জমির শতকরা ৮০ ভাগ ব্যবহার হচ্ছে গ্রামে অপরিকল্পিত আবাসনের কারণে। এবং শতকরা ১৭ ভাগ পোড়ামাটির ইটভাটার কারণে।
সুতরাং কৃষি জমি এবং পরিবেশের উপর ইটভাটার প্রভাব মারাত্মক।
আরও পড়তে পারেন:
স্থপতি ও পরিবেশবাদী ইকবাল হাবিব বলেন, "এই ড্রেজিং-এর মাটি দিয়ে ব্লক তৈরি করা সম্ভব । আমাদের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে নদী ড্রেজিং করে মাটি ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।"
ড্রেজিং করে নদীর পাড়ে যখন পলিবালু ফেলা হয়, তখন সেটি আবারো নদীতে চলে যায়। ফলে।
ইকবাল হাবিব বলছেন, যেসব নদীতে ড্রেজিং এর কাজ হয়, সেগুলোর কাছাকাছি ব্লক তৈরির শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্লক সাধারণত দুই ধরণের হয়। একটি হচ্ছে সলিড ব্লক এবং আরেকটি হচ্ছে হলো ব্লক। হলো ব্লকের মাঝে ফাঁকা থাকে।
হলো ব্লক দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করলে ইটের তুলনায় ভবনের ওজনও কম হয়।
হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর তথ্য অনুযায়ী ড্রেজিং মাটির সাথে ১০ শতাংশ সিমেন্ট মিশিয়ে মেশিনে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্লক তৈরি হয়।
এছাড়া কংক্রিট হলো ব্লক তৈরি করা হয় ২০ শতাংশ সিমেন্ট এবং ৮০ শতাংশ বালু মিশিয়ে।
ব্লকের ব্যবহার হচ্ছে না কেন?
ইটভাটা পরিবেশ দূষণ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে অনেক ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলে নির্মাণ কাজের জন্য ইটের দামও বাড়ছে।
তারপরেও কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার হচ্ছে না কেন, সেটা জানা দরকার।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
ব্লক দিয়ে বাড়ি নির্মাণের বিষয়টি এখনো জনপ্রিয়তা পায়নি। শত বছর ধরে যেহেতু ইট দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ হয়ে আসছে সেজন্য ইটের উপর মানুষের আস্থা আছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ ব্লকের গুণাগুণ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বাংলাদেশের যত নির্মাণ কাজ হয় তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হয় সরকারি টাকায় ও সরকারি প্রকল্পে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য - এ চারটি প্রকৌশল দপ্তর সবচেয়ে বেশি নির্মাণ কাজ করে।
"সরকারি কাজে এই ব্লক ব্যবহার হচ্ছে না। এটার লাভজনক দিক তারা বিবেচনায় নিচ্ছে না।"
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সরকারি এ চারটি সংস্থা তাদের নির্মাণ কাজে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ব্যবহার করতো তাহলে অতি দ্রুত এই চিত্র বদলে যেতো।
ব্লকের দাম বেশি?
ব্লকের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েকটি বড় বড় নির্মাণ কোম্পানি ব্লক তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো মানের ব্লকের দামও বেশি।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, স্থানীয়ভাবে ছোট-ছোট আকারের ব্লক তৈরির প্ল্যান্ট গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে একটি উপজেলার চাহিদা পূরণ করা যায়।
এ ধরণের ছোট আকারের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য প্রথম দিকে সরকারের কিছু প্রণোদনার দরকার আছে।
ব্লক তৈরির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্ল্যান্ট হলে দামও কমে আসবে।
একটা কংক্রিট ব্লক পাঁচটা ইটের সমান। একটা কংক্রিট ব্লক তৈরিতে খরচ ৪০ টাকা। অন্যদিকে একটি ইটের দাম এখন কমপক্ষে নয় টাকা। স্থান বিশেষ ইটের দাম আরো বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্লকের তৈরি স্থাপনায় ইটের চেয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হয়।








