বাংলাদেশের ইটভাটাগুলোয় এত শিশুকিশোর কাজ করছে কেন?

বাংলাদেশের ইটের ভাটাগুলোয় কাজ করে বহু শিশু-কিশোর শ্রমিক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের ইটের ভাটাগুলোয় কাজ করে বহু শিশু-কিশোর শ্রমিক
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

কুমিল্লায় একটি ইটভাটায় কয়লাবাহী ট্রাক উল্টে গিয়ে ১৩ জন ঘুমন্ত শ্রমিক নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটির পর অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা করেছেন স্বজনদের কয়েকজন।

তারা বলছেন, নিহত ১৩ জন শ্রমিকের বেশিরভাগই ছিল বড়জোর ১৫-১৬ বছর বয়সী কিশোর - যাদের সবাইকে নীলফামারির একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ঠিকাদারেরা নিয়ে এসেছিলেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, এই এলাকার প্রায় সাড়ে তিনশ' ইটভাটায় বিপুল পরিমাণে শিশু-কিশোর শ্রমিক কাজ করে।

বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকা থেকেও একই ধরণের অভিযোগ শোনা যায়। বিশেষ করে ইটের ভাটায় এত শিশু-কিশোর শ্রমিক কাজ করতে আসে কেন?

বাংলাদেশের আইনে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কোন প্রকার কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সবশেষ সংশোধিত শ্রম আইনে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে বলা হয়েছে। কিশোর শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ধরণ ও ঘন্টা নিয়ে আইনী বাধ্যবাধকতা থাকলেও - অনেক ইটের ভাটাতেই সেগুলো মানা হয়না বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ইটের ভাটায় উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা কাজ করতে আসে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ইটের ভাটায় উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা কাজ করতে আসে

নিহতদের একজন ১৬ বছর বয়েসী তরুণচন্দ্র রায়। তার বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার নিজপাড়া গ্রামে। তার কাকা হেরম্বচন্দ্র রায় বিবিসি বলছিলেন, গত কয়েক বছর ধরেই এ মৌসুমে কুমিল্লায় কাজ করতে যেতো তরুণ।

প্রাণে বেঁচে যাওয়া একজন শ্রমিক সঞ্জীবচন্দ্র রায়, যিনি তার তার বড় ভাইকে এ দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন। তিনি বলছিলেন, ঘুমন্ত শ্রমিকদের এত কাছে ট্রাক থেকে কয়লা নামানোর আগে তাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে দিলে হয়তো তাদের এভাবে মারা পড়তে হতো না। "আমাদের যদি ডাক দিতো তাহলে আমরা অবশ্যই বাঁচতাম। আমি পেশাব করতে না উঠলে অবশ্যই আমিও মারা যাইতাম হয়।"

নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯ জনের বয়স ১৫ থেকে ১৬ বছর এবং অনেকে স্কুল পড়ুয়া বলে জানান সঞ্জীব চন্দ্র রায়।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ইটভাটাগুলোয় শ্রম আইন মানা হচ্ছে না, এ অভিযোগ অনেকের

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইটভাটাগুলোয় শ্রম আইন মানা হচ্ছে না, এ অভিযোগ অনেকের

কুমিল্লায় স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বছরের এই সময়টায় ইটভাটাগুলোয় কাজ করতে প্রচুর মৌসুমী শ্রমিক আসেন উত্তরবঙ্গ থেকে। নিহতরা সবাই নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার।

স্থানীয় সাংবাদিক মাশুক আলতাফ চৌধুরী বলছিলেন, কিভাবে এখানে শিশু শ্রম ব্যবহৃত হয়।

"যে ঠিকাদাররা শ্রমিক সরবরাহ করে তাদের দৈনিক মজুরি তারা নির্ধারণ করে। মালিকের কাছ থেকে তারা যে অর্থ নেয় - শ্রমিকদের জন্য তারচেয়ে কম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। তারা একজন সর্দারের অধীনে কাজ করে এবং সর্দাররাও পারিশ্রমিকের কিছু অংশ নিয়ে নেয়" - জানান মি. চৌধুরী।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার নূরুল ইসলাম বলছিলেন তারা নিহতদের সবার বয়স এখনো নির্ধারণ করতে পারেন নি।

বাড়তি আয়ের জন্যই উত্তরবঙ্গ থেকে ইটভাটায় কাজ করতে আসেন এই শ্রমিকেরা

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, বাড়তি আয়ের জন্যই উত্তরবঙ্গ থেকে ইটভাটায় কাজ করতে আসেন এই শ্রমিকেরা

তিনি বলছেন, "প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে তাতে নিহত সকলের বয়স ১৮ থেকে ৩৫-এর মধ্যে ছিল। যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে তারা তিন দিনের মদ্যে আমাদের জানাবে।"

তবে বাংলাদেশ ইট প্রস্ততকারী মালিক সমিতির প্রেসিডেন্ট মিজানুর রহমান বাবুল ইটভাটায় কিশোর শ্রমিক ব্যবহারে বিষয়টি স্বীকার করে বলে, তারা এর পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছেন।

তার কথা - "শ্রমিকরাই তাদের কিশোর ছেলেদের নিয়ে আসে। তাদের কাজ দিতে মারা করলে তারা নিজেরাও কাজ করতে চায় না। বাচ্চারা একেবারেই কাজ করবে না এটা পুরোপুরি এখনো হয় নাই, আশা করছি অচিরেই হয়ে যাবে।"

হেরম্বচন্দ্র রায়ের মতো নিহতদের স্বজনরা এখন বলছেন, শিশুকিশোরদের কাজে পাঠানোর ব্যাপারে এখন দ্বিতীয়বার ভাববেন তারা।