দ্রব্যমূল্য: মূল্যস্ফীতিতে টালমাটাল বিশ্ব, বাংলাদেশ খাপ খাওয়াচ্ছে কীভাবে

চাল, তেল, চিনিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চাল, তেল, চিনিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত অগ্রসরমান দেশ শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি অনেকদিন ধরেই টালমাটাল। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করতে পেরে দেশটি নিজেকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করেছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননে সরকার নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। গভীর সংকট হাতছানি দিচ্ছে এ অঞ্চলের আরেক দেশ নেপালকেও। তবে সেরকম সংকটে না পড়লেও বাংলাদেশের মানুষ হিমশিম খাচ্ছে দ্রব্যমূল্যের নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতিতে।

গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় চাপে পড়েছে গরীব মানুষ আর এ অবস্থায় তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে শুধু বাংলাদেশই নয়, গত এক যুগের মধ্যে পুরো বিশ্বই এখন সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সামনে আছে।

আর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে প্রধানত করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানী তেলের উচ্চমূল্য, পরিবহন খরচ ব্যাপক বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।

আর এসবের ব্যাপক প্রভাবে গরম হয়ে গেছে বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজার। স্বল্পমূল্যে দ্রব্য পেতে টিসিবির ট্রাকের সামনে বেড়েছে ভিড়।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে - স্থানীয় বাজারে কেরোসিন, ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি এবং কোভিডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা দেয়ার কারণে।

আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব তো আছেই। যদিও এটি কীভাবে কতদিন অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে তা এখনো অজানা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান, ইটালি থেকে জার্মানি - দেশে দেশ জিনিসপত্রের দাম লাগাম ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান, ইটালি থেকে জার্মানি - দেশে দেশ জিনিসপত্রের দাম লাগাম ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সবকিছু মিলিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসেবে ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ থাকবে আর তাদের মতে এটিই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্য ও দেশে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।

"মানুষ পণ্য ব্যবহার কমিয়েছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি কম ব্যবহার করছে। গরীব মানুষ হয়তো কম খেতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি শিশু খাদ্য নিয়েও সংকটে পড়েছে বহু মানুষ," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি কী, কেন বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম, কতটা বেড়েছে

গৃহিনী লাবনী আহমেদ সিদ্ধেশ্বরীর অধিবাসী। তার দাবি ঠিক এক বছর আগেও তার বাজার খরচ ছিলো এখনকার অর্ধেক।

"গরুর মাংসের দাম একশ টাকা বেড়েছে। সয়াবিনের কী অবস্থা সেটাই তো সবাই জানে। বাজারে এমন কোন পণ্য নাই যেটার দাম বাড়েনি। সেই বাড়াটাও ১/২ টাকা না। কোনটি প্রায় দ্বিগুণ," দাম বাড়ার প্রসঙ্গে বলছিলেন তিনি।

আর এভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়াই হলো মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ বেশি টাকা দিয়ে এখন পণ্য বা সেবা কিনতে হচ্ছে।

বাজারে যখন মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায় কিন্তু পণ্য বা সেবার পরিমাণ একই থাকে তখনই মূল্যস্ফীতি হয়। আর এই মুদ্রাস্ফীতির ফলেই মূল্যস্ফীতি হয়ে থাকে।

আয় আর ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমসিম খাচ্ছেন বহু মানুষ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আয় আর ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমসিম খাচ্ছেন বহু মানুষ

বেসরকারি চাকুরীজীবি ফারজানা হোসেন বলছেন, করোনার কারণে তাদের বেতন কমেছিলো এবং সেটি সমন্বয় হবার আগে হু হু করে বেড়ে গেছে দ্রব্যমূল্য।

"কেমন যে অবস্থা সেটা বলে বোঝাতে পারবো না। সবাই মনে করে ভালো অবস্থা আমাদের। কিন্তু খরচ কুলাতে পারি না। নিজেরা তো ট্রাকের লাইনে দাঁড়াতে পারি না। তাই গত মাসেও কাজের মেয়েকে দিয়ে টিসিবির ট্রাক থেকে তেলসহ কয়েকটি পণ্য আনিয়েছি," বলছিলেন তিনি।

জিনিসপত্রের দাম বাড়ার এই চিত্র এখন বৈশ্বিক ট্রেন্ড। ফোর্বসের মত সাময়িকীগুলো বলছে, ১৯৮০'র দশকের শুরুর দিকের পর এই প্রথম এত দ্রুতগতিতে বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম, আর তাদের ধারণা মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি সহসাই কমার সম্ভাবনা কম।

আর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় মার্চ মাসে বিশ্বে খাবারের উচ্চমূল্য নতুন রেকর্ড গড়েছে।

মূল্যস্ফীতি কোন দেশে কেমন, কবে কমবে

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে সব খাদ্য পণ্যের দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

করোনা আর যুদ্ধের প্রভাবে উন্নত বা গরীব কোন দেশই এখন আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরে নেই।

কোভিডে নাগরিকদের বড় ধরণের প্রণোদনা দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ার রেকর্ড গড়েছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে সাত শতাংশে ঠেকেছে।

আর ব্রিটেনে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিক্ষোভও করেছে মানুষ। ইউরোজোনে যে উনিশটি দেশে ইউরো মুদ্রা ব্যবহার করা হয় সেসব দেশে এই জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিলো পাঁচ শতাংশের বেশি, যা ২৩ বছর আগে ইউরো চালুর পর সর্বোচ্চ।

জ্বালানি এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় লন্ডনে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় লন্ডনে বিক্ষোভ

কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, এশিয়ার দেশগুলোও জর্জরিত একই সমস্যায়।

জাপানে যেখানে আশির দশকের মন্দার পর ধারাবাহিকভাবে জিনিসপত্রের দাম কমে আসছিলো বলে মূল্যস্ফীতি ছিল ঋণাত্মক, সেই দেশটিতেও গত ডিসেম্বরে প্রায় ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে।

আবার দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতে ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে ডিসেম্বরে সাড়ে পাঁচ শতাংশ পার হয়েছিলো।

আর পাকিস্তানে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১৩ শতাংশ এবং সেখানে খাদ্য-পণ্যের দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছিলো।

এর জের ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সেখানে উত্তাল হয়ে নানা সমীকরণে শেষ পর্যন্ত পতন হয়ে গেছে ইমরান খানের সরকারের।

আর বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন হলেও নানা সংস্থার হিসেবে এখন মূল্যস্ফীতি ছয় শতাংশের মতো।

বাংলাদেশ: মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য কেমন ছিলো, হয়েছে কেমন

দুই হাজার একুশ-বাইশ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার।

অথচ ফেব্রুয়ারিতেই মূল্যস্ফীতি ছিলো ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নিন্ম আয়ের মানুষদের হিমশিম খেতে হচ্ছে দ্রব্যমূল্য ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিন্ম আয়ের মানুষদের হিমশিম খেতে হচ্ছে দ্রব্যমূল্য ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১৭।

সরকারি এই সংস্থাটির হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে দেশের গ্রাম এলাকায় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশে উঠেছিলো।

তবে কবে এই পরিস্থিতি ঠিক হবে তা কারও ধারণায় নেই বরং বলা হচ্ছে এই বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বেশিই থাকবে।

তবে চূড়ান্ত পরিস্থিতি নির্ভর করবে ইউক্রেন যুদ্ধ কবে কিভাবে শেষ হয় তার ওপর।

কীভাবে মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার শেষে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

তিনি জানান:

  • সরকার ইতোমধ্যেই সয়াবিন তেল আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে
  • এক কোটি পরিবারের মধ্যে সুলভ মূল্যে পণ্য বিতরণ করছে।
  • রোজার আগে চারটি পণ্য এবং রোজায় মোট ছয়টি পণ্য টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
  • বাজারে অতিরিক্ত মুনাফা ঠেকাতে সক্রিয় করা হয়েছে ভোক্তা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থাকে।

সরকারের আশা রপ্তানি আয় বেড়ে কিছুটা হলে স্বস্তি আসবে অর্থনীতিতে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সরকারের আশা রপ্তানি আয় বেড়ে কিছুটা হলে স্বস্তি আসবে অর্থনীতিতে।

তবে সরকারকে স্বস্তি দিচ্ছে রপ্তানির ইতিবাচক ধারা। মার্চ মাসে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে ৪৭৬ কোটি ২২ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫৪ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে তিন হাজার ১৪২ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি।

এছাড়া প্রনোদনা দুই শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করায় সামনের দিনে রেমিটেন্স প্রবাহ আরও বাড়ার আশা করা হচ্ছে এবং সেটি হলে গ্রামীন জনপদে কিছুটা স্বস্তি আসবে।

যদিও অর্থনীতিবিদ গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, বৈশ্বিক বাজারের চেয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা বেশি।

"এখানে মজুদ করে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে এবং আরও নানা কায়দায় পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। সেটা বন্ধ করা হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

স্বল্পমূল্যে ছয়টি পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে খোলা বাজারে।
ছবির ক্যাপশান, স্বল্পমূল্যে ছয়টি পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে খোলা বাজারে।

দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ ঠেকাতে যা করা দরকার

অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন রোজার পরেও মানুষের স্বল্প মূল্যে পণ্যের চাহিদা থাকবে এবং সে কারণে এটা চালিয়ে যেতে হবে ও প্রয়োজনে পণ্যের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

এছাড়া সামনে বাজেট আসবে যেখানে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে।

"এখন গ্রামীণ বয়স্করা সহায়তা পাচ্ছে। শহরের গরীব বয়স্কদের এর আওতায় আনার দরকার। এছাড়া আরও বেশি সংখ্যক বয়স্ক ব্যক্তিকে এই কর্মসূচির আওতায় এনে সহায়তার পরিমাণও বাড়িয়ে দিতে হবে," বলছিলেন তিনি।

তবে মূল্যস্ফীতির ধকল কমাতে বাজার ব্যবস্থায় মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার যাতে করে মানুষ বাজারে যে দামে আসে সেই দামের চেয়ে বহুগুণ বেশি টাকা দিতে না হয়।

"পণ্য যে মূল্যে আনা হয় আর বাজারে যে মূল্যে থাকা উচিৎ সেটিই যেন থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মজুতদারি, পণ্য বন্দরে রেখে দেয়া, লোকাল মার্কেটে (স্থানীয় বাজার) চাঁদাবাজি, পুলিশী হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে দাম বেড়ে যাওয়া ঠেকালে মানুষ স্বস্তি পাবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: