দ্রব্যমূল্য: 'ফকিন্নির বাজার' আর টিসিবির ট্রাকের লাইনে কম রোজগেরেদের ভিড়

- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে কিছু অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েই চলেছে, এবং যাদের সীমিত আয় তারা বলছেন সংসার চালাতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি ডাল এবং ভোজ্যতেলের মূল্য আরেক দফা বেড়েছে। এর সঙ্গে সবজির দামও চড়া।
'ইনকাম সব বাজারেই চইলা যাইতেছে'
ঢাকার ফার্মগেট মনিপুরী পাড়ায় একটি ছাত্রী হোস্টেলে গত ১৫ বছর ধরে রান্নার কাজ করেন সালমা বেগম।
তার স্বামী বেকার। ছেলে-মেয়ে আর বৃদ্ধ মাসহ মোট ছয়জনের সংসার চলে তার একার রোজগারে।
তবে করোনাভাইরাসের কারণে হোস্টেল বন্ধ থাকায় তিনিও প্রায় বেকার হয়ে গিয়েছিলেন। খরচ সামলাতে না পেরে ছেলেকে শিক্ষানবিশ হিসেবে দিয়েছেন এক ট্রাক চালকের সঙ্গে।
বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, সব কিছুর দাম বাড়ায় সংসার খরচে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।
তিনি বলছিলেন, "যে কর্ম করতেছি সেখানে ১০ হাজার টাকা বেতন। ওই টাকার মধ্যে খাওয়া খরচ, বাচ্চাদের খরচ, তেল-সাবান সব কিছু। এখন খালি খরচ বাড়তেছে, কিন্তু বেতন তো বাড়তেছে না।"

"এখন আমার তো ইনকাম সব বাজারেই চইলা যাইতেছে। বাচ্চারা খাইব কী, ওগো ভবিষ্যৎ কী? আর লেখাপড়াই বা কেমনে চালু রাখুম?" তিনি প্রশ্ন তোলেন।
"যেইভাবে পারি দুইটা টাকা সেইভ করার চেষ্টা করতাছি, নাইলে তো আর পারতেছি না" - বলেন সালমা বেগম।
'ফকিন্নির বাজার'
ঢাকার তেজকুনি পাড়ায় খেলাঘর মাঠের পাশে ছোট্ট একটা কাঁচা বাজার। এখানে সব বিক্রেতা নারী।
এ বাজারের বিশেষত্ব হচ্ছে, এখানে চাল বাদে অন্য সব খাদ্যপণ্য মানে ডাল-তেল-আটা-চিনি-লবণ-মসলা-শুটকি-শাকসবজি-ডিম---সব কিছু খুব কম পরিমাণে বিক্রি হয়।
এজন্য নিজের কর্মস্থল এবং বাড়ি থেকে অনেকটা পথ হেঁটে এসেও বাজার করেন অনেকে। কারণ এখানে জিনিস কেনা যায় অল্প পরিমাণে, দামও কিছুটা কম পড়ে।
এমনকি এখানে পলিথিনের প্যাকেটে করে ১০ টাকার সয়াবিন তেলও কিনতে পারবেন যে কেউ।
স্থানীয় লোকেদের কাছে এটি পরিচিত 'ফকিন্নির বাজার' নামে। এই বাজারটির মূল ক্রেতা নিম্ন আয়ের মানুষজন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সব জিনিসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়, দাম ১০ টাকা ঠিক রেখে বিক্রেতারা পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। সেজন্য বাজার করতে আসা ক্রেতারা খুবই অসন্তুষ্ট।

আশেপাশের এলাকার দিন মজুর, গৃহকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, রিক্সা ও ভ্যানচালক এমন কম আয়ের মানুষজন সামর্থ্য অনুযায়ী জিনিসপত্র কিনতে পারেন বলে সারাদিন এখানে ভিড় থাকে।
কিন্তু কাজলী বেগম নামে একজন বিক্রেতা বলছিলেন, সম্প্রতি এখানে ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে।
তিনি বলছিলেন, "আগে যেখানে দিনে ২০ কেজি জিনিস বেচতাম এখন বেচি ১০ কেজি। যে এক কেজি নিত সে এখন আধা কেজি নেয়। কারণ দাম বেড়ে গেছে। মানুষও অত আসতেছে না কয়দিন ধইরা।"
টিসিবির গাড়ির পেছনে ভিড়
বাংলাদেশে গত মাস দুয়েক ধরে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। চাল-ডাল-ভোজ্যতেল-পেঁয়াজের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। এর মধ্যে গত সপ্তাহে বেড়েছে মসুর ডালের দাম। চলতি সপ্তাহেই আরেক দফা বেড়েছে সয়াবিনের দাম।

নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী এখন খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ১৪৩ টাকা, বোতলজাত সয়াবিন তেল এক লিটার ১৬৮টাকা।
সেই সঙ্গে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা শীতের নতুন সবজিসহ প্রায় প্রতিটি শাকসবজির দামও বেশি।
খাদ্যপণ্যের এই দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে কেমন প্রভাব পড়েছে - তা বোঝা যায় যখন দেখা যায় ঢাকায় বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির ট্রাকের পেছনে ভিড় করছেন বহু মানুষ।
আর এই ভিড় প্রতিদিনই বাড়ছে। কারণ টিসিবি ট্রাকে করে সরকার ভর্তুকি দিয়ে বাজারের চেয়ে কম দামে পণ্য বেচে।
ভর্তুকি দেয়া দামে চাল-ডাল-আটা-চিনি-তেল কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন বহু মানুষ।

বসিলায় টিসিবি ট্রাকের পেছনে লাইনে দাঁড়ানো ইতি বেগম বলছিলেন, সকাল নয়টায় আসে ট্রাক আর সাড়ে নয়টা থেকে বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু সকাল সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি এবং তার ননদ।
তিনি বলছিলেন, "আমগো ইনকাম যদি ৪০০ টাকা হয় আর বাজারে গিয়া ৬০০ টাকা খরচ হয়, তাহলে কেমনে হয়? এইজন্য এইহানে আহি।"
ইতির পেছনে দাঁড়ানো আরেকজন মহিলা বলেছেন, "চাইল দোকানে ৫০ টাকা কইরা কিনা লাগে, কিন্তু এখানে ৩০ টাকায় কিনি। আটা বেচে ২৫ টাকায়, এই আটাই দোকানে গেলে ৩৫ টাকায় কিনতে হয়।"
নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তও আসছে লাইনে
বৃহস্পতিবার সকালে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের মুখে আরেকটি টিসিবি ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষ মিলে প্রায় শ'দুয়েক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সেখানে কেবল নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষজন নন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের কয়েকজনকেও দেখা গেল লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post
ঢাকার একটি সরকারী কলেজের একজন ছাত্রী এসেছেন পরিবারের জন্য চাল আর আটা নেয়ার জন্য।
পোশাক আর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে আলাপচারিতা চালাতে দেখে বোঝা যাচ্ছিল এ লাইনে দাঁড়ানো হয়ত তার জন্য খুব সহজ ছিল না।
তিনি বলছিলেন, অবসরপ্রাপ্ত বাবার পেনশনের আয়ে চলা সংসারের চাপ কিছুটা কমাতে তিনি এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, "আমাদের জন্য অত টাকা দিয়ে শাক-সবজি মাছ-তরকারি খাওয়া খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার আমরা খুব কষ্টে আছি—এত দামের জন্য। সবকিছুর দাম বাড়ছে কিন্তু আয় বাড়তেছে না। বাধ্য হয়ে এখানে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে।"

নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে এর প্রভাব সব শ্রেণীর লোকের ওপরই পড়ে, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি মূলত কম আয়ের লোকেদেরই বেশি ভোগায় বলে বলছিলেন লাইনে জড়ো হওয়া মানুষেরা।
এখানেই একাধিক নারী-পুরুষ বলেছেন, সংসারের খরচ কমাতে মাছ-মাংস কেনা কিংবা শখের খাবার কেনা কমিয়ে দিয়েছেন তারা।
কিন্তু আপাতত দিন পার করাই মুখ্য এদের অনেকের কাছে, যারা বলছিলেন, দাম কমাতে সরকারের হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।








