খাদ্য মূল্যস্ফীতি: চাল-ডাল-তেলসহ ৫ টি পণ্যের দাম গত ৫ বছরে যেভাবে বেড়েছে

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অনেকবার অসন্তোষ দেখা গেছে। আর সাম্প্রতিক কয়েক মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে খরচ সামলাতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষেরা।
যদিও সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, খাদ্যে মূল্যস্ফীতি গত পাঁচ বছর ধরে গড়ে সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি আছে।
বিবিসি বাংলা নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য হিসেবে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি এবং ব্রয়লার মুরগিকে সূচক ধরে গত ৫ বছরের গড় মূল্যের একটি হিসাব করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির গড় তথ্য বাজারে প্রধান খাদ্যপণ্যের দামের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
Inflation rate
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতির যে বার্ষিক হার, তার সঙ্গে বাজারে খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা মেলে না।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি বনাম বাজারের হালচাল
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতির বার্ষিক হারে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল গড়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশের কিছুটা বেশি (৫.৬৬%)।
এখন ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশের ওপরে থাকা মানে হচ্ছে, ২০১৬ সালে যে খাদ্যপণ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০১৭ সালে সেই একই পণ্য কিনতে ১০৫ টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে।
চাল
Rice price hike
অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ দেশের বাজার মনিটর করে তথ্য সংগ্রহ করে।
তাদের দেয়া তথ্য বলছে, ঢাকার বাজারে ৫ ধরণের চাল বেশি বিক্রি হয়-মিনিকেট, নাজিরশাইল, আমন পাইজাম, পারিজা বা স্বর্ণা, বিআর ১১ বা বিআর ৮।
এর মধ্যে মিনিকেটের দাম সবচেয়ে বেশি, আর বিআর ১১ বা বিআর ৮ জাতের চালের দাম সবচেয়ে কম।
এখানে বাজারে সর্বনিম্ন দামে বিক্রি হওয়া চালের দাম ধরে বিবিসি হিসাব করেছে।
দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে বিআর ১১ বা বিআর ৮ চালের কেজি ছিল ৪৩ টাকা ৮০ পয়সা, সেটি ২০২১ সালে এসে হয়েছে প্রতি কেজি ৫৫ টাকা।
গত ৫ বছরের মধ্যে ২০১৯ সালে শুধুমাত্র দাম কিছুটা কমেছিল এবং ২০২১ সালে এসে এক বছরে দামের সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে।
ডাল
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ডালের দাম গত কয়েক বছরে বেশ স্থিতিশীল দেখা গেছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরণের ডাল খাওয়া হয়, এর মধ্যে শহরের মানুষ বেশি খায় মসুর ডাল।
বাজারে দেশি এবং বিদেশি, যা মূলত ভারত থেকে আমদানি হয়, এই দুই ধরণের মসুর ডাল পাওয়া যায়। দামে কিছুটা সস্তা বলে বিদেশি মসুর ডালের বিক্রি বেশি হয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
বিবিসি এখানে বিদেশি মসুর ডালের দামকে সূচক হিসেবে গণনা করেছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে যে ডাল প্রায় ৯১ টাকা কেজিতে বিক্রি হত, সেটি ২০২১ সালে ৯৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
Pulses price hike
সয়াবিন তেল
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশে রোজগার অনুযায়ী মানুষ তেল বেছে নেন। যেমন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে সয়াবিন তেলের ব্যবহার বেশি।
এর মধ্যে সয়াবিন তেল আবার বোতলজাত এবং খোলা অবস্থায় দুইভাবেই বিক্রি হয়।
যদিও ঢাকার পাইকারি বাজারের বিক্রেতারা বলেছেন, বোতলজাত তেলের বিক্রিই বেশি হয়।
Soybean oil price hike
২০১৭ সালে সয়াবিন তেলের কেজি প্রতি দাম ছিল ১০৫ টাকা ৯৬ পয়সা, কিন্তু ২০২১ সালে তার দাম দাঁড়িয়েছে ১৬৫ টাকা কেজি। এই ৫ টি পণ্যের মধ্যে সয়াবিন তেলের দামই গত পাঁচ বছরে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
সেই দাম এখন আরো বাড়াতে চান ব্যবসায়ীরা।
চিনি
চিনির ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলক কম ছিল।
২০১৭ সালে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ৬৭ টাকা ১৬ পয়সা দরে, কিন্তু ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য বলছে, সেটি ৭৮ টাকা প্রতি কেজি হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল।
Sugar oil price hike
ব্রয়লার মুরগি
একটি প্রাণীজ প্রোটিন খাবার হিসেবে মুরগিকে ধরা হয়েছে।
বাজারে যত ধরণের মুরগি পাওয়া যায়, তার মধ্যে ব্রয়লার মুরগি দামে কম বলে বাজারে বেশি বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
সে কারণে বাজারে সবচেয়ে কম দামের হিসাবেই তৈরি করা হয়েছে এই হিসাব। দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে এক কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৬১ টাকা ৮২ পয়সা, একই মুরগি ২০২১ সালে প্রতি কেজি ২১০ টাকায়।
এই যে দামের ফারাক তার প্রতিফলন সরকারি পরিসংখ্যানে তেমন দেখা যায় না।
chicken price hike
গত তিন বছরে দাম বেড়েছে বেশি
এসব খাদ্যপণ্যের মধ্যে সয়াবিন তেল পুরোপুরিই আমদানি নির্ভর। অন্যান্য পণ্য আমদানি যেমন করা হয়, তেমনি দেশেও উৎপাদন রয়েছে।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশনের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের গড় দাম ২০১৯ সালে আগের দুই বছরের তুলনায় বেশ খানিকটাই কম ছিল, কিন্তু ২০২০ সাল থেকে সেটা আবার বাড়তে শুরু করে।
২০২১ সালে বেশ উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা ২০২২ সালের প্রথম কয়েক মাসেও অব্যাহত রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, খাদ্যপণ্যে গড় মূল্যস্ফীতির হার যখন সাড়ে ৫ শতাংশের মত, তখন নির্দিষ্ট খাদ্য যেমন চাল, ডাল বা সয়াবিন তেলে মূল্যস্ফীতির হার এর চেয়ে বেশি কেন?
মূল্যস্ফীতি হিসাবের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকেরা বলছেন, খাদ্যপণ্যে গড় মূল্যস্ফীতির হারের সাথে নির্দিষ্ট খাদ্য যেমন চাল, ডাল বা সয়াবিন তেলে মূল্যস্ফীতির হার আলাদা হবে, এর কারণ বাজারে যত রকম খাদ্যপণ্য পাওয়া যায় তার সম্মিলিত হিসাবের একটি গড় করা হয় বার্ষিক হিসাবে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও বাজারে যে হারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, তা পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া হিসাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন না অর্থনীতিবিদেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলছেন, পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০০৫-০৬ এর খানা জরিপে আয়-ব্যয়ের তথ্যের ভিত্তিতে কনজুমার প্রাইস ইনডেক্স তৈরি করে। তিনি বলছেন, "ফলে মূল্যস্ফীতির তথ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।"
"প্রকৃত খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিবিএসের দেয়া তথ্যের চেয়ে বেশি। বিবিএস মূল্যস্ফীতির তথ্য গণনায় ২০০৫ সালের ভিত্তি বছর বিবেচনায় নিচ্ছে। এ ভিত্তি বছরে খাদ্যপণ্যের ওপর কম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ এখন সরকারের হাতে ২০১৬ সালের খানা জরিপের নতুন তথ্য আছে," তিনি বলেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, যেকোন পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে একটা 'বেস ইয়ার' বা ভিত্তি বছর ধরা হয়, যা প্রতি ১০ বছর পর পর বদলানোর কথা।
"কারণ হচ্ছে, প্রতি ১০ বছরে মানুষের আয় এবং ব্যয়ের ধরণে পরিবর্তন আসে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে, ফলে তাদের ব্যয়ের ধরণ ও খাত বদলে যায়। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিলে অর্থনৈতিক কোন হিসাব ত্রুটিমুক্ত হয় না।"
আর এই হিসাবের কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে বাজারের দামে ফারাক হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
মি. হোসেন বলছেন, অর্থনীতির হিসাবে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি থাকবে, কিন্তু বাজারে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য যাতে নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে হয়।
আরো পড়তে পারেন:
কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা বলছেন, এক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, সরকার যখন বছরের অর্থনৈতিক হিসাব করে, তখন খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হিসাব করে না।
"এর কারণ হচ্ছে, খাদ্য উৎপাদন এবং সরবারহ প্রক্রিয়ার মধ্যে এমন অনেক বিষয় থাকে যার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যেমন এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা ধরুন।
যার ফল হিসেবে আমদানি করতে হয়, এমন প্রায় সব পণ্যের দামে তার ছাপ পড়বে। কিন্তু এখানে সরকারের আগে থেকে পরিকল্পনার সুযোগ কম।"
খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কেন সমস্যা?
অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি হলে সেটা সব সময় নেতিবাচক হবার কথা নয়। কারণ তাতে স্থানীয় কৃষিপণ্য উৎপাদক এবং এই সাপ্লাই চেইনের সবার আয় বাড়ার কথা।
এক্ষেত্রে সমস্যাটি হয় তখনই যদি অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ে।
কিন্তু বাংলাদেশে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংক্রান্ত কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, গত ৫ বছরে বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post
তিনি ব্যাখ্যা করছেন এভাবে, "মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়াটাই সমস্যা এখানে। সেটা বাড়েনি। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে দেশে মূল্যস্ফীতির যে হার তার সঙ্গে সংগতি রেখে মানুষের রোজগার বাড়েনি।
এমনকি সরকারি বা বেসরকারি চাকুরীজীবীদের ক্ষেত্রেও মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা হয় না বেতন দেবার ক্ষেত্রে।"
বিষয়টি অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি আরো খারাপ বলে মনে করেন অধ্যাপক হক।
"কারণ তাদের ওয়েজ বোর্ড নাই, ইনক্রিমেন্ট নাই, পেনশন বা প্রোভিডেন্ট ফান্ডের মত সুযোগসুবিধা যা সাধারণ চাকুরীজীবীরা পায় তা নেই।"










