শাবিপ্রবি: উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে চলমান অনশন ভেঙেছেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীরা

ছবির উৎস, Yahya Maruf
উপচার্যের পদত্যাগ সহ নানা দাবিতে টানা আটদিনের অনশন ভেঙেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে অনশনরত শিক্ষার্থীদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক।
এর আগে হাসপাতালে ভর্তি অনশনরত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়।
অনশন ভাঙ্গলেও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের একজন নাফিসা আঞ্জুম ইমু।
অনশন ভাঙানোর পর লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ''আমি এইখানে আসার আগে আমার সাথে সরকারের অনেক উচ্চ পর্যায় থেকে কথা বলেছে। আমি তাদের সাথে কথা বলে এখানে এসেছি। আমি তাদের অনুরোধ করবো, আমাকে যে কথাগুলো তারা দিয়েছেন, সেই কথাগুলো যেন রক্ষা করেন।''
গ্রেপ্তার সাবেক শিক্ষার্থীদের মু্ক্তি দেয়া এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রত্যাহার করার জন্যও তিনি আহ্বান জানান।
এর আগে বুধবার সকালে নাফিসা আঞ্জুম ইমু বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, গতকাল রাতে ঢাকা থেকে জাফর স্যার (মুহম্মদ জাফর ইকবাল) এসে বলার পর, স্যারের কথা আমরা কেউ ফেলতে পারিনি। স্যারের কথা তো আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি, ভরসা করি। স্যারের কথায় সবাই আশ্বস্ত হয়েছে যে, অনশন ভাঙ্গবে।
আজ ভোররাতে ঢাকা থেকে সিলেটে গিয়ে পৌঁছান মি. ইকবাল। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। সম্প্রতি তিনি অবসরে গেছেন। সেই সময় তার সঙ্গে তার স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক ছিলেন। ড. হকও চাকরি থেকে অবসরে গেছেন।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষকও।
নাফিসা আঞ্জুম ইমু সকালে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, অনশনকারীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সবাই একসঙ্গে অনশন করতে শুরু করেছিলেন, তাই অনশনও একসঙ্গে ভাঙবেন। এই কারণে হাসপাতালে যারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তারাও ক্যাম্পাসে আসবেন। তারপর সবাই মিলে অনশন ভাঙবেন।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Yahya Maruf
মুহম্মদ জাফর ইকবাল আন্দোলনকারীদের কী বলেছেন?
ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে প্রফেসর ইকবাল যেসব কথা বলেন, তার ভিডিও বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচার করা হয়েছে।
ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রফেসর ইকবালকে বলতে দেখা যায়, ''তোমরা যেটা করেছো, সেটার কোন তুলনা নাই। যে আন্দোলনটা করেছো, বাংলাদেশের প্রতিটা ইয়াং ছেলেপেলে তোমাদের সঙ্গে আছে।''
পরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথেও কথা বলেন প্রফেসর ইকবাল। পুলিশের আইজিপির সঙ্গে তার পরিচয় আছে জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ''আমি আপনাদের মাধ্যমে ওনাকে বলতে চাই, আপনারা এটা করবেন না। প্লিজ বাংলাদেশে যত বড় কিছু হয়েছে সব ছাত্ররা করেছে। ছাত্রদের বিশ্বাস করেন, আর যাই করুন, পুলিশ দিয়ে ছাত্রদের পিটাবেন না। যা করেছেন সেটা অনেক বড় সর্বনাশ হয়েছে।''
''আমার ছাত্ররা গুলি করেছে, একটা ছবি দেখান। সবার কাছে তো স্মার্টফোন থাকে।'' তিনি বলছেন।
''তোমরা টের পাচ্ছ না তোমরা কী করেছো? বাংলাদেশের ৩৪টা ইউনিভার্সিটির ৩৪ জন ভাইস চ্যান্সেলর বলেছেন, এই ভিসি যদি পদত্যাগ করে, তাহলে তারাও পদত্যাগ করবেন। আমার খুবই শখ, জিনিসটা দেখতে, আমার দেশে এমন ভাইস চ্যান্সেলর আছেন, যারা অন্যের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে নিজেরা পদত্যাগ করবেন। কিন্তু আমার ধারণা, সেই শখ সহজে মিটবে না। কিন্তু কি জন্য তারা বলেছেন? কারণ তাদের ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে।''
সেই সময় তিনি ছাত্রদের ১০ হাজার টাকা দিয়ে বলেন, আমি দেখতে চাই, সিআইডি এসে এখন আমাকেও গ্রেপ্তার করুক।
মঙ্গলবারই পুলিশ শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ জন সাবেক শিক্ষার্থীকে আটক করে আন্দোলনকারীদের অর্থ সহায়তা দেবার অভিযোগে।

ছবির উৎস, ARIFUL HASAN SHUVO
যেভাবে আন্দোলনের সূত্রপাত
গত বুধবার বেলা তিনটা থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ছাত্রীদের একটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রভোস্টের দুর্ব্যবহার এবং হলে বিছানা সংকট ও খাওয়ার সমস্যা সমাধানের দাবিতে দিন দশেক আগে শুধু ওই হলের ছাত্রীদের যে আন্দোলন শুরু হয় তা দুদিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়।
ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়া ছাত্রীদের উপর ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে।
গত ১৬ই জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের পিটুনি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনা ঘটার পর থেকে আন্দোলন জোরদার হয়। উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি।
আন্দোলন সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলো ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সেটিও মেনে নেয়নি শিক্ষার্থীরা।
এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ বেশ কয়েকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
এসব ব্যাপারে উপাচার্যের কোন বক্তব্য অবশ্য পাওয়া যায়নি।
তবে উপাচার্যের পদত্যাগ চেয়ে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে 'অযৌক্তিক' বর্ণনা করে বাংলাদেশের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, এমন দাবি সম্পর্কে রাষ্ট্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়।








