শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিকে 'অযৌক্তিক' বললেন শিক্ষা উপমন্ত্রী

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ছবির উৎস, ARIFUL HASAN SHUVO

ছবির ক্যাপশান, দিন দশেক ধরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে 'অযৌক্তিক' বলে বর্ণনা করে বলেছেন, এমন দাবি সম্পর্কে রাষ্ট্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়।

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগের দাবিতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত কয়েকদিন ধরে যে আন্দোলন করছেন - সে ব্যাপারেই বিবিসি বাংলার কাছে এমন বক্তব্য দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী।

যা বললেন উপমন্ত্রী

মি. চৌধুরী বলেছেন, "অতি উৎসাহী হয়ে অযৌক্তিক দাবি যদি উপস্থাপিত হয় এবং কোন অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ ব্যতীত, এমন অযৌক্তিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কোন তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয়া রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়।"

তিনি বলেন, "মন্ত্রী মহোদয়ের পর্যায় থেকে আলোচনা করা হচ্ছে। সেই আলোচনার পর আমরা যেটা বুঝতে পারছি এখানে ইগো সমস্যা বেশি, বাস্তব সমস্যার চেয়ে।"

উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সিলেটে অবস্থিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করছেন ।

শনিবার রাতে শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনির সাথে আলোচনার পর আজ শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন।

"সবাইকে আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে"

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, "আচার্য নিয়োগকৃত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যকে চাইলেই সরিয়ে দেয়া যায় না। সবাইকে একটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।"

"সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সঠিকভাবে উপস্থাপন করলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। কিন্তু কোন অর্থনৈতিক বিষয়ে কোন অভিযোগ তারা তুলতে পারেনি।"

উপমন্ত্রী বলেন, "কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ব্যতীত আমরা তো তাকে বাদ দিতে পারি না। যেভাবে সমাধান চাওয়া হচ্ছে যে ভিসিকে এখনই চলে যেতে হবে - সেটা কাম্য নয়।"

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ছবির উৎস, ARIFUL HASAN SHUVO

ছবির ক্যাপশান, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের 'একেবারেই অনমনীয়' উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, "একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার বিষয় আছে। চাইলেই একজন উপাচার্যকে চলে যেতে বলতে পারি না। এই আন্দোলন করা সমীচীন নয়। এটা বুঝতে হবে।"

"এই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। বারবার আলোচনার পরও তারা যদি সঠিক পথে না আসে তাহলে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"

কিভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সমাধানের উপায় তো এটা নয় যে তারা যা চায় তাই আমরা করবো। তিনি শিক্ষার্থীদের অধীনে চাকরী করেন না। সেকি শিক্ষার্থীদের ইচ্ছামতো চলে যাবে?"

আন্দোলন কিভাবে এই পর্যায়ে এলো?

ছাত্রীদের একটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রভোস্টের দুর্ব্যবহার এবং হলে বিছানা সংকট ও খাওয়ার সমস্যা সমাধানের দাবিতে দিন দশেক আগে শুধু ওই হলের ছাত্রীদের যে আন্দোলন শুরু হয় তা দুদিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়।

ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।

ছবির উৎস, ARIFUL HASAN SHUVO

ছবির ক্যাপশান, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের বেধড়ক পিটুনির থেকে আন্দোলন ব্যাপক জোরালো নেয়।

ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়া ছাত্রীদের উপর ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে।

গত ১৬ইজানুয়ারি শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের বেধড়ক পিটুনি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনা ঘটার পর থেকে আন্দোলন ব্যাপক জোরালো রূপ নেয়। উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি।

আন্দোলন সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলো ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সেটিও মেনে নেয়নি শিক্ষার্থীরা।

এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ বেশ কয়েকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।

পাঁচদিন ধরে আমরণ অনশন করছেন আন্দোলনকারীদের একাংশ। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সর্বশেষ গতরাতে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনির সাথে শিক্ষার্থীদের আলোচনা হয়েছে কিন্তু তাতেও কোন সমাধান আসেনি।

আন্দোলন শিক্ষার্থীদের একজন বলেছেন, "যে আমাদের সর্বোচ্চ অভিভাবক, তার কাছে আমরা সমস্যার সমাধানের জন্য গিয়েছি, সে যদি আমাদের পুলিশের মার খাওয়ায়, গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ফোটে, এরকম কারো অধীনে কি আপনি থাকতে চাইবেন? আমরা তাকে ভিসি হিসেবে চাই না।"

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

ছবির উৎস, SUST WEBSITE

ছবির ক্যাপশান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের অনেকদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ

শিক্ষার্থীদের অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনেকদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এর সাথে যুক্ত হয়েছে।

স্থাপত্য বিভাগের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলছিলেন, "ক্যাম্পাস থেকে টং দোকানগুলো সব তুলে দেয়া হয়েছে। এখন আমাদের খাওয়ার জায়গা নেই। একটু চা খেতে হলেও রিক্সা ভাড়া দিয়ে ক্যাম্পাসের গেটে যেতে হয়। আর টং-এর প্রতি আমাদের যে আবেগ, ক্যাম্পাসে আড্ডা সময় কাটানোর আর তো কিছু নেই। আমরা কয়জন ফুডকোর্টের খাবার খাওয়ার সামর্থ্য রাখি? ওখানে খাবারের অনেক দাম।"

"সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করতে দেয়া হয় না। বলা হয় ক্যাম্পাসে উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু উন্নয়ন মানে কি আসলে খালি বিল্ডিং বানানো? শিক্ষার্থী বান্ধব, তরুণদের উপযোগী পরিবেশ উনি নিশ্চিত করতে পারছেন না", বলছিলেন এই শিক্ষার্থী।

বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে ক্যাম্পাসে উপাচার্যের পক্ষে ও বিপক্ষের শিক্ষকদের বিভেদও এর সাথে যুক্ত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান এবং ছাত্র কল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক জহির উদ্দিন আহমদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, সমস্যা সমাধানে কি করছেন তারা।

তিনি বলেছেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি মিটিং-এ বসেছে। কি করলীয় তার দিকনির্দেশনাটা এখান থেকে নেয়া হবে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্বটা নিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে চেষ্টার কোন ত্রুটি হচ্ছে না। বিভিন্নভাবে তাদের নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেছি। এরা কোন কথাই শুনছে না। একজনের পর একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে, সেটা দেখতে ভালো লাগছে না।"

বিবিসি বাংলায় আজকের আরো খবর: