ক্রিকেট: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের টেস্টে দুই দলের টপ অর্ডার যেভাবে পার্থক্য গড়ে দিল

পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৮ উইকেটে হেরে গেল বাংলাদেশ।

চট্টগ্রামে প্রথম টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের দেয়া ২০২ রানের লক্ষ্য সহজেই টপকে গেল পাকিস্তান।

একইসাথে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপও হার দিয়েই শুরু করলো বাংলাদেশ।

পাকিস্তান টপ অর্ডারেই এগিয়ে যায়, আর বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তানের দুই ওপেনার আবিদ আলী ও আব্দুল্লাহ শফিক ১৫১ রানের জুটি গড়ে কোনও বিঘ্ন ছাড়াই জয়ের পথ তৈরি করেন।

ক্রিকেট নিয়ে বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

এই দুজন ওপেনার প্রথম ইনিংসেও ১৪৬ রানের জুটি গড়েন।

যদিও পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে লিড নিতে পারেনি, কিন্তু দুই দলের টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানরাই পার্থক্য গড়ে দেন এই টেস্ট ম্যাচে।

যেমন, আবিদ আলী ও আব্দুল্লাহ শফিকের ১৫১ ও ১৪৬ রানের জুটির বিপরীতে বাংলাদেশের দুই ওপেনার সাইফ হাসান এবং সাদমান ইসলাম অনিক প্রথম ইনিংসে ১৯ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪ রানের জুটি গড়েন।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের এই টেস্ট দলের প্রথম ইনিংসে ৪৯ রানে পড়েছিল চার উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৫ রানের মধ্যেই চারজন ব্যাটসম্যান প্যাভিলিয়নে ফিরে যান।

কোনও প্রতিরোধই গড়তে পারেননি এই ব্যাটসম্যানরা।

বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষক তৌসিয়া ইসলাম বলছিলেন, "টিকে থাকার মতো ব্যাটিংটা দেখা যায়নি। মনে হয়েছে যেন রান করতে নেমেছেন ব্যাটসম্যানরা। টেস্ট ক্রিকেটে উইকেটে থাকলে রান এমনিই আসে, এটা সহজ ব্যাপার।"

তবে বাংলাদেশের খেলা দেখলে এটাকে কঠিন কাজই মনে হবে।

যেমন সাইফ হাসান দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৪ বল টিকেছিলেন, যেখানে প্রথম দুটি চার মারার সময়ই বল শূন্যে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।

টেস্ট ক্রিকেটে একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান যখন ব্যাটে বলে সংযোগের সময় নিয়ন্ত্রণ হারান সেটা চোখে পড়ে এবং ব্যাটসম্যানের টেকনিক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তখন।

সাইফ হাসান তার ১১ ইনিংসের টেস্ট ক্যারিয়ারে তিনবার ০ রান করে আউট হয়ে গেছেন, ২ বার ১০-এরও কম রান করেছেন।

১১ ইনিংসের ৮ বারই ক্যাচ তুলে দিয়ে আউট হয়েছেন সাইফ হাসান।

১, ২, ৩,৪- চারটি পজিশনেই সাইফকে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।

সাদমান ইসলাম অনিকের ধৈর্য্য ও টেস্ট খেলার মানসিকতা নিয়ে তার মেন্টররা প্রশংসা করে থাকেন কিন্তু এই টেস্টে তিনিও ছিলেন ব্যর্থ, দুই ইনিংসেই এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফিরেছেন তিনি।

দুটি ইনিংসেই বাংলাদেশের টপ অর্ডার, লেজের ব্যাটসম্যানদের মতোই ব্যর্থ।

বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়মিত অনুসরণ করেন এমন একজন ভক্ত শেখ মিনহাজ লিখেছেন, "বাংলাদেশ যেন ৬টি উইকেট কম নিয়েই খেলতে নামে।"

তিনি টপ অর্ডার ও লোয়ার অর্ডারের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

বল খেলার ধৈর্য্য নেই ব্যাটসম্যানদের

যেমন ভারতের কানপুরে গতকাল নিউজিল্যান্ড ভারতের বিপক্ষে একটি টেস্ট পুরো দিন ব্যাট করে ড্র করেছে। এই টেস্টের শেষ ইনিংসে নিউজিল্যান্ডের প্রথম চারজন ব্যাটসম্যানের তিনজনই ১০০ বা তার বেশি বল খেলেছেন।

টম লাথাম- ১৪৬, উইলিয়াম সমারভিল- ১১০, কেইন উইলিয়ামসন ১১২; খুব বেশি রান না করেই এই তিনজন ক্রিজে সময় কাটিয়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন টেস্টে।

শেষদিকে রাভিন্দ্রা রাচিনও ৯১ বল খেলেছেন, মাত্রই প্রথম টেস্ট খেলতে নামা নিউজিল্যান্ডের এই লোয়ার অর্ডারে নামা ক্রিকেটার যে ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলাদেশের শুরুর দিকে নামা ক্রিকেটারেরও দেখা যায় না।

তৌসিয়া ইসলামের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, "বলটা যখন নতুন থাকে তখন শাইন থাকে, এতে শাহীন বা হাসান আলীর মতো পেস বোলাররা বাড়তি সুবিধা পান। এই সময়টা ব্যাটে বলে সংযোগ হতে হয় দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী।"

"যদি কোনও শট খেলা হয় তবে পুরো শটটাই খেলতে হবে, অর্ধেক মননে শট খেললে সেটা ব্যাটের কানায় লেগে ফিল্ডারের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।"

মূলত বলের উজ্জ্বলতা নষ্ট করে মাঝের ওভারে ব্যাটসম্যানদের সুবিধাজনক জায়গায় নিয়ে আসাই কাজ টেস্ট ক্রিকেটের শুরুর দিকের ব্যাটসম্যানদের।

এদিক থেকে পুরোপুরি ব্যর্থ বাংলাদেশ।

আটজন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান নিয়েও ব্যর্থ বাংলাদেশ

বাংলাদেশের স্কোরকার্ড দেখলে মনে হবে, প্রায়ই টপ অর্ডারের বিপর্যয় সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকে মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা।

এমনকি দ্বিতীয় ইনিংসে দেখা গেছে ১১৫ ওভার কিপিং করেও ১০ ওভারের মধ্যেই লিটনের ব্যাট করতে নামার উপক্রম দেখা দেয়, ইয়াসির আলী রাব্বিকে তখন নামানো হয়।

মেহেদী হাসান মিরাজসহ মোট ৮ জন ব্যাটসম্যান নিয়ে একাদশ গড়েও বাংলাদেশ কোনও সুবিধা করতে পারেনি।

টেস্টেএখনো তামিম ইকবালই ভরসা

গত তিন বছরে বাংলাদেশ ছয়জন ব্যাটসম্যানকে টেস্ট ফরম্যাটে ওপেনিংয়ে খেলতে নেমেছে, এর মধ্যে তামিম ইকবালই বলার মতো পারফর্ম করেছেন, তিনি ৫২ গড়ে ১৫ ইনিংসে ৬টি ফিফটি এবং একটি শতক হাঁকিয়েছেন।

এছাড়া সাদমান ইসলাম অনিক ২৭, সাইফ হাসান ১৪, সৌম্য সরকার ১০ গড়ে ব্যাট করেছেন।

ইমরুল কায়েস ২ টেস্ট খেলে তুলেছেন ২১ রান এবং লিটন দাস ১ টেস্টে এক ইনিংসে ৯ রান তুলেছেন।

তবে লিটন দাস এই বছর বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান তুলেছেন।

ব্যাটিং পজিশন বদলেরর পর চলতি বছরই পাঁচটি ফিফটি ও পাকিস্তানের সাথে ক্যারিয়ারের প্রথম শতক তোলেন এই ব্যাটসম্যান।

বরং তুলনামূলক দুর্বল দল নিয়ে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাংলাদেশের মাটিতেই এই বছর সিরিজ জিতেছে এবং শ্রীলঙ্কার একটা তরুণ টেস্ট দল বাংলাদেশকে টেস্ট সিরিজে হারিয়ে দিয়েছে।