মাইলসের সঙ্গে গাইবেন না শাফিন আহমেদ, ব্যান্ডের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ

শাফিন আহমেদ।

ছবির উৎস, Shafin Ahmed Facebook page

ছবির ক্যাপশান, শাফিন আহমেদ।
    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের অন্যতম পপ ব্যান্ডদল মাইলসের ভোকাল গিটারিস্ট শাফিন আহমেদ এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এই দলটির সাথে সংগীত কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

একইসঙ্গে 'মাইলস' নাম ব্যবহার করে ব্যান্ডের সব কার্যক্রম স্থগিত চেয়েছেন তিনি।

শনিবার রাত ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজ থেকে এক ভিডিও বার্তায় এ ঘোষণা দেন মি. আহমেদ।

এর আগে, ২০১৭ সালের অক্টোবরেও তিনি একবার ব্যান্ডটি থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। এর কয়েকমাস পর দ্বন্দ্বের মীমাংসা শেষে ব্যান্ডে ফেরেন।

এছাড়া ২০১০ সালের শুরুর দিকেও একবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ব্যান্ড থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। যদিও কয়েকমাস পর আবারও মঞ্চে তাদের একসাথে পারফর্ম করতে দেখা যায়।

ব্যান্ডটি যেখানে ২০১৯ সালে তাদের ৪০ বছরের যাত্রা পূর্ণ করেছে, সেখানে নতুন করে এমন ঘোষণা আসায় ভক্তদের মধ্যে তা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মি. আহমেদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, গত তিন বছর ধরে ব্যান্ডের ব্যবসায়িক কিছু বিষয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

এ নিয়ে ব্যান্ডের অপর এক সদস্যের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

আরও পড়তে পারেন:

মাইলসের সদস্যরা।

ছবির উৎস, Miles

ছবির ক্যাপশান, মাইলসের সদস্যরা।

মাইলস ছাড়ার কথা বলেননি শাফিন আহমেদ

২০২০ সালে মহামারী আগ পর্যন্ত ব্যান্ডদলটি একসাথেই কাজ করলেও, মার্চের পর থেকে সংকট ঘনীভূত হতে থাকে।

পরে ২০২১ সালের জানুয়ারি এ ব্যাপারে ব্যান্ডকে লিখিত অভিযোগে মি আহমেদ জানান, বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাদের সাথে মিউজিক করবেন না।

এর মানে এই নয় যে মি. আহমেদ মাইলস ছেড়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেছেন, "ব্যান্ড ছাড়ার কথা আমি কোথাও বলিনি। আমি বলেছি ওদের সাথে আর মিউজিক করবো না। কারণ তাদের সাথে কাজ করে আমার শুধু ক্ষতি হচ্ছে।"

অবশ্য তিনি নিজ নামে সংগীত কার্যক্রম যেমন: কনসার্ট বা স্টেজ পারফর্মেন্স, রেকর্ডিং অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।

ব্যান্ডের অভ্যন্তরিন এসব সংকট নিরসনে ২০১৭ সালে মাইলসকে একটি করপোরেট কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সে সময় এক সংবাদ সম্মেলন করে শাফিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, যে এই ব্যান্ডটিকে একটি কপোর্রেট কাঠামো দিতে তিনি মাইলস ব্যান্ড লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি গঠন করেছেন। ব্যান্ডের সব ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলবে কোম্পানির আওতায়।

কিন্তু এ বিষয়ে মতভেদ থাকায় পরে ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যে নোটারাইডজ স্ট্যাম্প পেপারে মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এমওইউ স্বাক্ষর হয়।

সেই এমওইউ এর কিছু শর্ত নিয়ে ফের বিরোধ দেখা দেয় ব্যান্ডের মধ্যে।

মঞ্চে পারফর্ম করছে মাইলস।

ছবির উৎস, Shafin Ahmed Facebook Page

ছবির ক্যাপশান, মঞ্চে পারফর্ম করছে মাইলস।

মাইলস নামে এই ব্যান্ডটি ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর ভোকাল হিসেবে আছেন শাফিন আহমেদ।

প্রথম ১২ বছর তারা শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার গান করতেন। এরপর ১৯৯১ সাল থেকে মাইলস বাংলা গান লিখে সুর করে দেশ ও দেশের বাইরে পারফর্ম শুরু করে। ওই বছরই তাদের প্রথম অ্যালবাম 'প্রতিশ্রুতি' বাজারে আসে। তার আগে তাদের দু'টি ইংরেজি গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। সেগুলো হল: 'মাইলস' ও 'এ স্টেপ ফারদার'।

এরপর থেকেই রাতারাতি জনপ্রিয়তা পায় এই ব্যান্ডটি।

এতো দীর্ঘ যাত্রার পরও শনিবারের ওই ভিডিও বার্তায় মি. আহমেদ বলেন, 'এ বছরের শুরুতে আমি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। মাইলসের বর্তমান লাইনআপের সঙ্গে কোনও কার্যক্রম করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আগামীতেও এই লাইনআপের সঙ্গে মিউজিক করা থেকে বিরত থাকব।'

ভিডিওটির ক্যাপশনে শাফিন আহমেদ লিখেছেন- 'দীর্ঘদিনের অন্যায় ও ভুল কার্যক্রমের জন্য আমি এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।'

শাফিন আহমেদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যান্ডের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এটি তাদের ব্যান্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এ নিয়ে তারা আনুষ্ঠানিক কোন মন্তব্য করবেন না।

শাফিন আহমেদ ছাড়া মাইলস ব্যান্ডের লাইন-আপে আছেন- হামিন আহমেদ (ভোকাল ও গিটার), মানাম আহমেদ (ভোকাল ও কি-বোর্ড), ইকবাল আসিফ জুয়েল (ভোকাল ও গিটার), সৈয়দ জিয়াউর রহমান তূর্য (ড্রামস)।

তাদের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- 'চাঁদ তারা সূর্য', 'প্রথম প্রেমের মতো', 'ফিরিয়ে দাও', 'ধিকি ধিকি', 'পাহাড়ি মেয়ে', 'নীলা', 'কি যাদু', 'হৃদয়হীনা', 'স্বপ্নভঙ্গ', 'জ্বালা জ্বালা', 'পিয়াসী মন' ইত্যাদি।

১৯৯৩ সালে প্রত্যাশা অ্যালবামের ফটোশ্যুটে মাইলস।

ছবির উৎস, Miles

ছবির ক্যাপশান, ১৯৯৩ সালে প্রত্যাশা অ্যালবামের ফটোশ্যুটে মাইলস।

মাইলস নাম 'অপব্যবহারে' আপত্তি

মাইলসের গৌরবময় অতীত যেন ক্ষুণ্ণ না হয় এ জন্য ব্যান্ডটির কার্যক্রম স্থগিতের আহ্বানও জানিয়েছেন শাফিন আহমেদ। দুই মিনিটের ওই ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, মাইলস নামে যেন অন্য কেউ কার্যক্রম না চালান এবং এই নামটি যেন অপব্যবহার না হয়।

তিনি বলেন, "আমরা যদি একসঙ্গে কাজ না করতে পারি তাহলে মাইলসের কার্যক্রম স্থগিত করা উচিত। এটাই আমি মনে করি, বেস্ট ডিসিশন। সুতরাং আমার প্রত্যাশা থাকবে, অন্য কেউ যেন মাইলস নামটা ব্যবহার না করেন।"

তার মতে, বাংলাদেশে আজ মাইলস যে অবস্থানে আছে, তারা যদি একসাথে কাজ করতে না পারে তাহলে ব্যান্ডটির কার্যক্রম এখানেই বন্ধ করে দেয়া উচিত, যেন এর সম্মানজনক অবস্থান বজায় থাকে।

তিনি বলেন, ২০১০ সালের কপিরাইট সার্টিফিকেট অনুযায়ী মাইলসের সব গান মাইলসের মালিকানাধীন এবং সেখানে শাফিন আহমেদ, হামিন আহমেদ এবং মানাম আহমেদ- এই তিনজনের স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। এর অর্থ, মাইলসের প্রতিটা গান পারফর্ম করা থেকে শুরু করে গানের রয়্যালটিতে এই তিনজনের সমান অধিকার আছে।

সেক্ষেত্রে মাইলসের নাম ব্যবহার প্রসঙ্গে মি. আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মানুষ মাইলস বলতে পুরো লাইনআপকে বোঝে, যেখানে আমি থাকবো, বাকিরাও থাকবে। মাইলসের এই "ব্র্যান্ডভ্যালু" তৈরির পেছনে আমার যথেষ্ট অবদান আছে। কিন্তু একটা পরিস্থিতি তৈরি করে আমাকে সরে যেতে বাধ্য করা হবে। আমি থাকবো না তাহলে এই ব্র্যান্ডভ্যালু অন্যেরা ব্যবহার করবে কেন? এটাই তো অপব্যবহার।"

তবে ব্যান্ডের কপিরাইটে স্বাক্ষরকারী অপর দুই সদস্য চাইলে নিজ নামে এই ব্যান্ডের গান পারফর্ম করতে পারবেন বলে তিনি জানান। তবে তাদের কারোই 'মাইলস' নামটি ব্যবহার করা উচিত হবে না বলে তিনি মনে করেন। কারণ এই নামটি মাইলস ব্যান্ড লিমিটেড কোম্পানির আওতায় আইনগতভাবে সুরক্ষিত আছে।

তিনি বলেন, "আমি তাদের কারও লাইভ পারফর্মেন্সে বাধা দিচ্ছি না। তারা নিজেদের নাম ব্যবহার করে পারফর্ম করতে পারে। মাইলস নাম যেন টানাহেচড়া না করা হয়।"