রাজনৈতিক ইসলাম কীভাবে মরক্কোতে ধরাশায়ী হলো

মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ। আরব বসন্তের ধাক্কা আসার পরপরই তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের পথে গিয়েছিলন

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ। আরব বসন্তের ধাক্কা আসার পরপরই তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের পথে গিয়েছিলন
    • Author, মাগদি আব্দেলহাদি
    • Role, উত্তর আফ্রিকা বিশ্লেষক

মরক্কোতে এ মাসের নির্বাচনে অভাবনীয় পরাজয় হয়েছে ইসলামপন্থী দল ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (পিজেডি) যারা গত ১০ বছর ক্ষমতায় ছিল।

আর এই ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এক দশক আগে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের দাবিতে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয় হয় তার ধাক্কায় প্রথম যে ইসলামপন্থী দলটি ভোটে জিতে ক্ষমতা নিয়েছিল সেটি ছিল মুসলিম ব্রাদারহুড ভাবধারার দল পিজেডি।

বিপুল ভোটে ২০১১ সালে তাদের বিজয় দেখে জোর বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে মরক্কোর জন্য নতুন পথের সূচনা হলো।

তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া সরকার বিরোধী বিক্ষোভ সেসময় যেভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল তাতে আরব বিশ্বের অনেক শাসকের রাতারাতি পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়।

আরব বসন্ত নামে সেই গণ-আন্দোলনের ধাক্কায় তিউনিসিয়ার জিনে আল-আবিদিন বেন আলি, মিশরের হোসনি মুবারক এবং পরে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির মত শক্তিধর নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হন সে বছর। মিশর এবং তিউনিসিয়ায় ইসলামপন্থীদের নির্বাচনে জেতা অবধারিত হয়ে উঠেছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাচ্ছে।

মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ টের পেরেছিলেন হাওয়া কোন দিকে ঘুরছে। তিনি ভয় পেয়েছিলেন নিজের দেশে বিক্ষোভ জোরদার হলে তার সিংহাসন হুমকিতে পড়বে।

তাই আগেভাগেই ব্যবস্থা নেন তিনি। হঠাৎ একদিন মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেন বাদশাহ মোহাম্মদ। তারপর পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেন। সেই সাথে মরক্কোর জন্য নতুন একটি সংবিধান তৈরির ঘোষণা দিলেন।

আরও পড়ুন:

সুতো ছাড়েননি বাদশাহ

বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদের ভাবমূর্তি ইতিবাচক মোড় নেয়। মরক্কোর মানুষজন মনে করলো তাদের বাদশাহ নমনীয় একজন স্বৈরাচারী যিনি জনগণের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কারের যে সব প্রস্তাব বাদশাহ দিলেন তা নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করলো।

২০১১ সালে রাজনৈতিক সংস্কারের দািবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল মরক্কো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১১ সালে রাজনৈতিক সংস্কারের দািবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল মরক্কো

মধ্যপ্রাচ্যে তখনও আরব বসন্ত তুঙ্গে। তার মধ্যেই ফেব্রুয়ারি টুয়েন্টি মুভমেন্ট ফর চেঞ্জ ব্যানারে কিছুদিনের মধ্যেই মরক্কোতে শুরু হলো রাস্তায় বিক্ষোভ।

দাবি তোলা হলো মরক্কোকে “সাংবিধানিক রাজতন্ত্র“ করতে হবে যেখানে রাজা শুধু “রাজত্ব করবেন, কিন্তু শাসন করতে পারবেনা না“। ব্রিটেন সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন যেমন রাজতন্ত্র রয়েছে তারই আদলে মরক্কোকে বদলে ফেলার দাবি উঠলো।

নতুন সংবিধানে বাদশাহ মোহাম্মদ আগের সমস্ত ক্ষমতাই কার্যত তার হাতে রেখে দিয়েছিলেন। আগের মতই দেশের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা নীতি তৈরির ক্ষমতা তার হাতেই থেকে যায়।

পাশাপাশি, দেশের ‘শীর্ষ ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক“ নেতার সাংবিধানিক মর্যাদাও তিনি ছাড়েননি। মরক্কোর রাজ পরিবার দাবি করে তারা নবী মোহাম্মদের বংশধর এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বাদশাহ “বিশ্বাসীদের সেনাপতি“ খেতাবের অধিকারী।

তবে ওজর আপত্তি স্বত্বেও নতুন সংবিধানকে মরক্কোর রাজনীতিকদের সিংহভাগ দেশের জন্য নতুন এক সূচনা হিসাবে মেনে নেন।

মেনে নেয় ইসলামপন্থী দল পিজিডিও। পুরনো রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের যে ক্ষোভ ছিল তাকে কাজে লাগাতে শুরু করে তারা।

গণতন্ত্রের একটি আবরণ যাতে থাকে তা নিশ্চিত করতে বাদশাহ মোহাম্মদ পিজিডির রাজনৈতিক উত্থানকে আটকানোর চেষ্টা করেননি। তবে ক্ষমতার সুতো সবসময় তার হাতেই রয়ে যায়।

২০১১ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে পিজেডি সরকার গঠন করে। এমনকি পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলটি তাদের ভোট সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়, এবং পার্লামেন্টে তাদের আসনসংখ্যা বেড়ে হয় ১২৫।

২০১১ সালে মরক্কোর নির্বাচনে জিতে ইসলামপন্থী দল পিজেডি ইতিহাস তৈরি করেছিল

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, ২০১১ সালে মরক্কোর নির্বাচনে জিতে ইসলামপন্থী দল পিজেডি ইতিহাস তৈরি করেছিল

বিষাক্ত পেয়ালা

সবারই ধারণা ছিল এবারের নির্বাচনে পিজেডির ভোট কমবে। কিন্তু এত বড় পরাজয় কেউই কল্পনা করেনি। এমনকি দলের নেতা এবং উপনেতা দুজনেই তাদের আসন হারিয়েছেন। দুজনেই সাথে সাথে নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন।

কেন এই হাল ইসলামপন্থী এই দলটির হলো তা পুরোপুরি বুঝতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু সিংহভাগ পর্যবেক্ষক মনে করছেন নির্বাচনী অঙ্গীকার রাখতে না পারার কারণেই মূলত তাদের এই হাল হয়েছে।

তারা বলছেন যে দলটির নামের সাথে ‘জাস্টিস‘ (সুবিচার) এবং ‘ডেভলপমেন্ট‘ (উন্নয়ন) শব্দ দুটো জোড়া তারা এই দুটো ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে।

যেমন, দলটি অঙ্গীকার করেছিল মরক্কোর আরো অনেক মানুষকে তারা দারিদ্র থেকে বের করে আনবে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি করবে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বাস্তবে তার কোনোটাই ঘটেনি।

বরঞ্চ এ সময়ে মরক্কোতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্টতই বেড়েছে।এরপর, শিক্ষক নিয়োগে দু-বছর মেয়াদি চুক্তির বিতর্কিত নিয়ম চালু করে দলটি তাদের তৃণমূলে সমর্থন অনেকটাই হারিয়েছে। এই নীতিকে অনেকেই দেখেছেন যে সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দিতে চায়।

বিবিসি বাংলার আরও খবর:

মরক্কোতে পিজেডি সরকারের নিয়োগ নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মরক্কোতে পিজেডি সরকারের নিয়োগ নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বিক্ষোভ

শিক্ষায় ফরাসি ভাষার ব্যবহার সাবেক এই ফরাসি উপনিবেশে একটি আবেগের ইস্যু। কিন্তু যে দলটি আরব এবং ইসলামী জাতীয়তাবাদের কথা বলে তারা শিক্ষায় ফরাসী ভাষার ওপর নির্ভরতা কমাতে কমাতে তেমন কিছুই করেনি। স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষায় ফরাসি ভাষা ব্যবহার নিয়ে যে আইন মরক্কোতে হয়েছে তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয় পিজেডি।

সমালোচকরা বলতে শুরু করেন - ক্ষমতায় গিয়ে পিজেডি রাজার চেয়েও বেশি রাজতন্ত্র পন্থী হয়ে গেছে। মানুষের অধিকার, শ্রমজীবীর অধিকারের পক্ষে কথা বলার চেয়ে তারা ‘মাখজেনদের‘ পক্ষ নিয়েছে। বাদশাহ এবং তার নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে বোঝাতে মরক্কোর মানুষজন “মাখজেন“ শব্দটি ব্যবহার করে।

অনেক বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতা বাদশাহর হাতে রয়ে গেছে জেনেও সরকারের দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল পিজেডির জন্য। পেয়ালায় বিষ আছে জেনেও তারা তারা তা পান করেছে।

এছাড়া, মার্চ মাসে বাদশাহ‘র উদ্যোগে নির্বাচনী আইনে কিছু পরিবর্তন আনায় বিপদে পড়ে যায় পিজেডি। তাদের সরকার এই সংশোধনী না চাইলেও পার্লামেন্টে তা ওঠানো হয় এবং পাশও হয়ে যায়।এই সংশোধনের ফলে অনেক ছোটখাটো দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

রাজনীতি এবং নির্বাচনকে আরো প্রতিনিধিত্বশীল করার যুক্তিতে নির্বাচনী আইনে পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে রাজনীতির মানচিত্রকে আরো খণ্ডিত করা হয়েছে যা রাজপ্রসাদের পক্ষে গেছে এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিপক্ষে গেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী মরক্কোর কোটিপতি ব্যবসায়ী আজিজ আখানাউচ

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, ২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী মরক্কোর কোটিপতি ব্যবসায়ী আজিজ আখানাউচ

রাজনৈতিক ইসলামের বিদায় ঘণ্টা?

মরক্কোর নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলের পরাজয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে স্বস্তি-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। মিশর এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোতে পিজেডিকে দেখা হয় রাজনৈতিক-ইসলামি আন্দোলন মুসলিম ব্রাদারহুডের ছায়া হিসাবে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে অনেক দেশে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় ঢোকানো হয়েছে।

অনেক বিশ্লেষক পিজেডির পরাজয়কে মরক্কোতে রাজনৈতিক ইসলামের বিদায় ঘণ্টা হিসাবে দেখছেন।সন্দেহ নেই যে পিজেডির এই করুণ দশা ইঙ্গিত করে যে মরক্কোর রাজতন্ত্র এবং তার সমর্থক শাসক গোষ্ঠী আরব বসন্তের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

তবে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব-শীল সরকার এবং রাজতন্ত্রের ক্ষমতা খর্বের যে আকাঙ্ক্ষা থেকে দশ বছর আগে যে বিক্ষোভ গিয়েছিল তা শেষ হয়ে গেছে তা বলা যাবেনা।

আজিজ আখানাউচ নামে যে কোটিপতি ব্যবসায়ীর দল ন্যাশনাল র‌্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস (আরএনআই) সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে এবং তাকেই বাদশাহ সরকার গঠন করতে বলেছেন। এক বিবৃতিতে মি আখানাউচ বলেছেন তার সরকার “বাদশাহ‘র নীতি-কৌশল বাস্তবায়নে কাজ করবে।“

তার এই বিবৃতি নিয়ে মরক্কোর বর্ষীয়ান সাংবাদিক হামিদ এলমাহদাওয়ি লিখেছেন আগের সব প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর একই ভাষায় কথা বলেছেন। ঐ সাংবাদিকের মন্তব্য - পক্ষ যদি একটি হয় তাহলে ‘নির্বাচন নির্বাচন খেলার‘ প্রয়োজন কি?

ভিডিওর ক্যাপশান, দশ বছর আগে তিউনিসিয়ায় শুরু হয়ে যে আরব বসন্ত ছড়িয়ে যায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তার দশটি মুহূর্ত